ঢাকা ১০:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ক্ষমা ও পরোপকার: মুমিনের অনন্য গুণ এবং সুন্দর সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি

ইসলামী ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৯:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৬ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
 মানুষের সামাজিক জীবন পারস্পরিক সম্পর্ক, লেনদেন ও চলাফেরার ওপর নির্ভরশীল। এই পথ চলায় কখনো কখনো একে অন্যকে মনে কষ্ট দিয়ে বসে, যা জমিয়ে রাখলে এক সময় রূপ নেয় বড় বিরোধে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষমা করে দেওয়া এবং নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথা ভাবা এক মহত্ চরিত্রের পরিচায়ক। ইসলাম মানুষের মধ্যে এই দুটি মানবিক ও আত্মিক গুণ বিকশিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ক্ষমাশীলতা এবং পরোপকারকে মুমিনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সফলতার মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরানো হয়েছে।
ক্ষমা মহত্ত্বের পরিচায়ক ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম
সাধারণ মানুষের স্বভাব হলো কেউ কষ্ট দিলে বা অন্যায় করলে তার প্রতিদান বা প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রকৃত মহত্ত্ব প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্যের মধ্যে নয়; বরং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্যে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সচ্ছলতায় ও অসচ্ছলতায় ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সত্কর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত:১৩৪)। এই আয়াতে ক্রোধ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করার বিনিময়ে আল্লাহর ভালোবাসার অনন্য সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। অন্য এক আয়াতে ক্ষমার মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি ও সংশোধনের প্রতি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে দেয় এবং সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে।’ (সুরা: আশ-শুরা, আয়াত : ৪০)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্ষমার সামাজিক ও আত্মিক মর্যাদা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহ ক্ষমা করার কারণে কোনো বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই করেন না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। সুতরাং পারিবারিক বিরোধ, বন্ধুত্বের টানাপোড়েন কিংবা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামান্য ভুলের জন্য প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে ক্ষমাশীল হওয়া প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
পরোপকার: মুমিনের আত্মপরিচয়
পরোপকার মানে কেবল অর্থসম্পদ দান করা নয়। কারও দুঃখ মনোযোগ দিয়ে শোনা, অসহায়কে পথ দেখানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া কিংবা বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোও পরোপকারের অন্তর্ভুক্ত। সাহাবিদের চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিক ছিল এটি। পবিত্র কোরআনে আনসার সাহাবিদের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও নিজেরা অভাবগ্রস্ত হয়।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ৯)।
প্রকৃত মুমিন হওয়ার শর্ত হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৩)। সমাজে এই মানসিকতা গড়ে উঠলে হিংসা, বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা অনেকাংশে কমে আসবে। তাছাড়া মানুষের উপকার করলে আল্লাহর সরাসরি সাহায্য পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ বান্দার সহযোগিতায় থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)।
ক্ষমা ও পরোপকারের সমন্বয়ে সুন্দর সমাজ
ক্ষমা মানুষের অন্তর থেকে ক্ষতিকর প্রতিহিংসা দূর করে, আর পরোপকার দূর করে মানুষের ভেতরের স্বার্থপরতা। একটি মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রকে সুন্দর করে, অন্যটি সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে।
পবিত্র কোরআনে শত্রুকে বন্ধু বানানোর কৌশল হিসেবে বলা হয়েছে, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো তা দিয়ে, যা উত্তম। ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো হয়ে যাবে।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি তোমার সঙ্গে মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করে, তার মূর্খতার মোকাবিলা তোমার সহনশীলতা দিয়ে করো।
সর্বোপরি, সৃষ্টিজগতের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শনই আল্লাহর দয়া পাওয়ার মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু دাউদ, হাদিস: ৪৯৪১)।
উপসংহার:
বর্তমান অশান্ত ও অস্থির পৃথিবীতে শান্তি ও সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনতে ক্ষমা ও পরোপকারের কোনো বিকল্প নেই। মুমিনের আচরণে কঠোরতা, অহংকার ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে যদি দয়া, ক্ষমা ও সর্বজনীন কল্যাণকামিতা প্রকাশ পায়, তবেই সমাজে এক স্বর্গীয় পরিবেশ গড়ে উঠবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দুটি মহান গুণে গুণান্বিত হওয়ার তৌফিক দান করুন।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ক্ষমা ও পরোপকার: মুমিনের অনন্য গুণ এবং সুন্দর সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি

আপডেট সময় : ০৬:৫৯:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
 মানুষের সামাজিক জীবন পারস্পরিক সম্পর্ক, লেনদেন ও চলাফেরার ওপর নির্ভরশীল। এই পথ চলায় কখনো কখনো একে অন্যকে মনে কষ্ট দিয়ে বসে, যা জমিয়ে রাখলে এক সময় রূপ নেয় বড় বিরোধে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষমা করে দেওয়া এবং নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথা ভাবা এক মহত্ চরিত্রের পরিচায়ক। ইসলাম মানুষের মধ্যে এই দুটি মানবিক ও আত্মিক গুণ বিকশিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ক্ষমাশীলতা এবং পরোপকারকে মুমিনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সফলতার মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরানো হয়েছে।
ক্ষমা মহত্ত্বের পরিচায়ক ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম
সাধারণ মানুষের স্বভাব হলো কেউ কষ্ট দিলে বা অন্যায় করলে তার প্রতিদান বা প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রকৃত মহত্ত্ব প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্যের মধ্যে নয়; বরং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্যে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সচ্ছলতায় ও অসচ্ছলতায় ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সত্কর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত:১৩৪)। এই আয়াতে ক্রোধ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করার বিনিময়ে আল্লাহর ভালোবাসার অনন্য সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। অন্য এক আয়াতে ক্ষমার মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি ও সংশোধনের প্রতি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে দেয় এবং সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে।’ (সুরা: আশ-শুরা, আয়াত : ৪০)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্ষমার সামাজিক ও আত্মিক মর্যাদা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহ ক্ষমা করার কারণে কোনো বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই করেন না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। সুতরাং পারিবারিক বিরোধ, বন্ধুত্বের টানাপোড়েন কিংবা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামান্য ভুলের জন্য প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে ক্ষমাশীল হওয়া প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
পরোপকার: মুমিনের আত্মপরিচয়
পরোপকার মানে কেবল অর্থসম্পদ দান করা নয়। কারও দুঃখ মনোযোগ দিয়ে শোনা, অসহায়কে পথ দেখানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া কিংবা বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোও পরোপকারের অন্তর্ভুক্ত। সাহাবিদের চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিক ছিল এটি। পবিত্র কোরআনে আনসার সাহাবিদের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও নিজেরা অভাবগ্রস্ত হয়।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ৯)।
প্রকৃত মুমিন হওয়ার শর্ত হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৩)। সমাজে এই মানসিকতা গড়ে উঠলে হিংসা, বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা অনেকাংশে কমে আসবে। তাছাড়া মানুষের উপকার করলে আল্লাহর সরাসরি সাহায্য পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ বান্দার সহযোগিতায় থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)।
ক্ষমা ও পরোপকারের সমন্বয়ে সুন্দর সমাজ
ক্ষমা মানুষের অন্তর থেকে ক্ষতিকর প্রতিহিংসা দূর করে, আর পরোপকার দূর করে মানুষের ভেতরের স্বার্থপরতা। একটি মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রকে সুন্দর করে, অন্যটি সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে।
পবিত্র কোরআনে শত্রুকে বন্ধু বানানোর কৌশল হিসেবে বলা হয়েছে, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো তা দিয়ে, যা উত্তম। ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো হয়ে যাবে।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি তোমার সঙ্গে মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করে, তার মূর্খতার মোকাবিলা তোমার সহনশীলতা দিয়ে করো।
সর্বোপরি, সৃষ্টিজগতের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শনই আল্লাহর দয়া পাওয়ার মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু دাউদ, হাদিস: ৪৯৪১)।
উপসংহার:
বর্তমান অশান্ত ও অস্থির পৃথিবীতে শান্তি ও সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনতে ক্ষমা ও পরোপকারের কোনো বিকল্প নেই। মুমিনের আচরণে কঠোরতা, অহংকার ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে যদি দয়া, ক্ষমা ও সর্বজনীন কল্যাণকামিতা প্রকাশ পায়, তবেই সমাজে এক স্বর্গীয় পরিবেশ গড়ে উঠবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দুটি মহান গুণে গুণান্বিত হওয়ার তৌফিক দান করুন।