সমুদ্রের ঢেউ থেকে তরল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেন তরুণ বিজ্ঞানী শরিফ
- আপডেট সময় : ০৭:৩০:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- / ১০০ বার পড়া হয়েছে
সমুদ্রের ঢেউ থেকে তরল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে হৈচৈ ফেলেদিয়েছেন বাংলাদেশের একজন তরুণ বিজ্ঞানী। যেখানে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ নিয়ে দেশজুড়ে অশান্তি বিরাজমান সেখানে নতুন এই উদ্ভাবন বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তির এক নতুন দিগন্ত স্থাপন করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প অনুসন্ধানে বিশ্বজুড়ে যখন প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ বাংলাদেশ থেকে বিকল্প শক্তি ও পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। গবেষক ও বিজ্ঞানী মো. শরীফ দুটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর চলমান গবেষণার কথা জানিয়েছেন; পানি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব তরল জ্বালানি উৎপাদন এবং বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের গতিশক্তি কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন।
পানি ও বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিকল্প তরল জ্বালানি
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে, বিজ্ঞানী মো. শরীফ দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি অনুযায়ী, পানি ও নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের সমন্বয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এমন একটি বিশেষ তরল পদার্থ তৈরি করা সম্ভব, যা জ্বালানি হিসেবে কাজ করতে পারে।
পরীক্ষামূলকভাবে এই তরল জ্বালানিটি গৃহস্থালির রান্নার চুলা, হোটেলের বাণিজ্যিক বার্নার, শিল্পকারখানার বয়লার এবং মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকের দাবি, এটি জ্বলার সময় কোনো ক্ষতিকর ব্ল্যাক কার্বন বা ধোঁয়া নির্গত করে না এবং জ্বলা অবস্থায় নীল শিখা তৈরি করে, যা এটিকে তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব করে তোলে। কেরোসিন, ডিজেল এবং এলপিজি (LPG)-র পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে এটিকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা চলছে।
তরুণ বিজ্ঞানী শরিফের বিশ্বাস- যদি বড় আকারের উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা যায়, তবে তুলনামূলক কম খরচে প্রতিদিন প্রায় একহাজার (১,০০০) মেট্রিক টন তরল জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুযায়ী এর রাসায়নিক গঠন, কার্যকারিতা এবং পরিবেশগত প্রভাব পুরোপুরি নিশ্চিত করার জন্য স্বীকৃত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিস্তারিত পরীক্ষাগার-ভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
সমুদ্রের ঢেউ থেকে যেভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন
তরল জ্বালানি বিষয়ক গবেষণার পাশাপাশি, মো. শরীফ সমুদ্রের ঢেউয়ের গতিশক্তিকে সরাসরি বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরের জন্য একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরিতেও কাজ করছেন। তিনি এমন একটি কৌশল উদ্ভাবন করেছেন যা সৌরশক্তি বা প্রচলিত কোনো জ্বালানির ওপর নির্ভর করে না; বরং সমুদ্রের ঢেউয়ের স্বাভাবিক গতিকে কাজে লাগিয়ে এটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে।
১ কিলোওয়াট ও ২ কিলোওয়াট ক্ষমতার ছোট পরীক্ষামূলক মডেলগুলোর মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের পর, বর্তমানে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ চলছে। পরবর্তী ধাপে ১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার আরও বড় একটি মডেল নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গবেষক শরীফের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা জুড়ে থাকা ঢেউয়ের বিপুল শক্তিকে যদি সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তা থেকে ১,৫০,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। এই ধরনের অবকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে তা দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ মেটানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
চ্যালেঞ্জসমূহ এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা৷
বাংলাদেশের মতো একটি দেশ—যা জ্বালানি রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল—তার জন্য এই উভয় প্রযুক্তিই যুগান্তকারী সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। তবে, এ ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রকৌশলগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামুদ্রিক পরিবেশের লবণাক্ততা, যন্ত্রপাতির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব, বিপুল প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং কঠোর জ্বালানি ভারসাম্য বিশ্লেষণের (energy balance analysis) মতো বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
গবেষক মো. শরীফ এই গবেষণায় সহযোগিতার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে যদি এগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়, তবে এই উদ্ভাবনগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় সবুজ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে৷















