ঢাকা ০৫:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ঢাকায় কোচিং করতে এসে বন্ধুর হাতে খুন শিক্ষার্থী, যেভাবে লাশ গেল নীলফামারীতে

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:২০:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৭ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
এইচএসসি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় এসে বন্ধুত্বের ফাঁদে পড়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন রাকিবুল ইসলাম (১৭) নামে এক তরুণ। রাজধানীর শুক্রাবাদের একটি বাসায় তাকে জিম্মি করে শ্বাসরোধ ও ঘাড় মটকে হত্যা করে তারই অনলাইন-পরিচিত বন্ধু আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪)। পরে হত্যার প্রমাণ লুকাতে মরদেহ একটি কার্টনে ভরে দূরপাল্লার বাসে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ২০ দিন পর রহস্য উদ্ঘাটন করে ঘাতক মামুনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিহত রাকিবুল ইসলামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানায়। তিনি ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তির পর ঢাকার পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বড় ভাই জহুরুল ইসলাম জীবনের সঙ্গে থাকতেন। ঢাকায় আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মার্কেটিং কোম্পানির কর্মী মামুনের সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। [

যেভাবে জিম্মি ও হত্যা করা হয়

পুলিশ জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকালে মামুন হোয়াটসঅ্যাপে কল করে রাকিবকে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে ডেকে নেন। সেখান থেকে ফুসলিয়ে তাকে শুক্রাবাদে মামুনের নিজের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাসায় আটকে রেখে রাকিবকে মারধর ও মুক্তিপণের জন্য চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মামুন তার ঘাড় মটকে দিলে ঘটনাস্থলেই রাকিবের মৃত্যু হয়।

মরদেহ কার্টনে ভরে বাসে করে গুম

হত্যাকাণ্ডের পর লাশ আড়াল করতে মামুন একটি সুপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর পদ্ধতি বেছে নেন। ভবনের দারোয়ানের সহায়তায় রাকিবের নিথর দেহটি একটি বড় কার্টনে ভরে সাধারণ মালামাল হিসেবে অটোরিকশায় করে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান মামুন। কার্টনটি এমনভাবে প্যাক করা হয়েছিল যে ভেতরে মরদেহ রয়েছে তা বোঝার উপায় ছিল না। গাবতলী থেকে দূরপাল্লার বাসে করে মামুন নীলফামারীর ডিমলায় নিজের গ্রামে পৌঁছান এবং ১৭ সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে বাড়ির পাশের একটি সুপারিবাগানে কার্টনসহ রাকিবের মরদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়৷

 তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান,”প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে আমরা মুক্তিপণ দাবিতে ব্যবহৃত দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের সূত্র ধরে ঘাতক মামুনকে শনাক্ত করি। গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় শেরেবাংলা নগরের শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ সেপ্টেম্বর ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তায় সুপারিবাগান থেকে মাটিচাপা দেওয়া কার্টনটি উদ্ধার করা হয়। আসামি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে।”

পুলিশের তদন্তে আরও একটি ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। রাকিবকে হত্যার পরও তার পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে ও জীবিত দেখাতে ঘাতক মামুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবের একটি ভুয়া ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠায়৷

 নিহতের পরিবারের প্রতিক্রিয়া

রাকিবের বড় ভাই ও মামলার বাদী জহুরুল ইসলাম জীবন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,

“আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর আমরা কাফরুল থানায় জিডি করি। এরপর অপহরণকারীরা ভাইকে জীবিত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দফায় দফায় টাকা দাবি করতে থাকে। ভাইকে ফিরে পাওয়ার আশায় আমরা চার দফায় বিকাশ ও তিন দফায় নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মোট ৪ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমার ভাইকে আগেই মেরে ফেলেছিল। আমরা ঘাতক মামুনের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।”

SHAPE  \* MERGEFORMAT

⚖️ মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর কাফরুল থানায় প্রথমে নিখোঁজ ডায়েরি হলেও পরবর্তীতে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে নিয়মিত মামলা করা হয়। পুলিশ ইতিমধ্যেই মামুনের কাছ থেকে মুক্তিপণের নগদ ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করেছে। ঘাতক মামুন আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় আজ ৭ অক্টোবর তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে অন্য কোনো সহযোগী জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ঢাকায় কোচিং করতে এসে বন্ধুর হাতে খুন শিক্ষার্থী, যেভাবে লাশ গেল নীলফামারীতে

আপডেট সময় : ১১:২০:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
এইচএসসি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় এসে বন্ধুত্বের ফাঁদে পড়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন রাকিবুল ইসলাম (১৭) নামে এক তরুণ। রাজধানীর শুক্রাবাদের একটি বাসায় তাকে জিম্মি করে শ্বাসরোধ ও ঘাড় মটকে হত্যা করে তারই অনলাইন-পরিচিত বন্ধু আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪)। পরে হত্যার প্রমাণ লুকাতে মরদেহ একটি কার্টনে ভরে দূরপাল্লার বাসে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ২০ দিন পর রহস্য উদ্ঘাটন করে ঘাতক মামুনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিহত রাকিবুল ইসলামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানায়। তিনি ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তির পর ঢাকার পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বড় ভাই জহুরুল ইসলাম জীবনের সঙ্গে থাকতেন। ঢাকায় আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মার্কেটিং কোম্পানির কর্মী মামুনের সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। [

যেভাবে জিম্মি ও হত্যা করা হয়

পুলিশ জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকালে মামুন হোয়াটসঅ্যাপে কল করে রাকিবকে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে ডেকে নেন। সেখান থেকে ফুসলিয়ে তাকে শুক্রাবাদে মামুনের নিজের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাসায় আটকে রেখে রাকিবকে মারধর ও মুক্তিপণের জন্য চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মামুন তার ঘাড় মটকে দিলে ঘটনাস্থলেই রাকিবের মৃত্যু হয়।

মরদেহ কার্টনে ভরে বাসে করে গুম

হত্যাকাণ্ডের পর লাশ আড়াল করতে মামুন একটি সুপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর পদ্ধতি বেছে নেন। ভবনের দারোয়ানের সহায়তায় রাকিবের নিথর দেহটি একটি বড় কার্টনে ভরে সাধারণ মালামাল হিসেবে অটোরিকশায় করে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান মামুন। কার্টনটি এমনভাবে প্যাক করা হয়েছিল যে ভেতরে মরদেহ রয়েছে তা বোঝার উপায় ছিল না। গাবতলী থেকে দূরপাল্লার বাসে করে মামুন নীলফামারীর ডিমলায় নিজের গ্রামে পৌঁছান এবং ১৭ সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে বাড়ির পাশের একটি সুপারিবাগানে কার্টনসহ রাকিবের মরদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়৷

 তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান,”প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে আমরা মুক্তিপণ দাবিতে ব্যবহৃত দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের সূত্র ধরে ঘাতক মামুনকে শনাক্ত করি। গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় শেরেবাংলা নগরের শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ সেপ্টেম্বর ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তায় সুপারিবাগান থেকে মাটিচাপা দেওয়া কার্টনটি উদ্ধার করা হয়। আসামি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে।”

পুলিশের তদন্তে আরও একটি ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। রাকিবকে হত্যার পরও তার পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে ও জীবিত দেখাতে ঘাতক মামুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবের একটি ভুয়া ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠায়৷

 নিহতের পরিবারের প্রতিক্রিয়া

রাকিবের বড় ভাই ও মামলার বাদী জহুরুল ইসলাম জীবন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,

“আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর আমরা কাফরুল থানায় জিডি করি। এরপর অপহরণকারীরা ভাইকে জীবিত ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দফায় দফায় টাকা দাবি করতে থাকে। ভাইকে ফিরে পাওয়ার আশায় আমরা চার দফায় বিকাশ ও তিন দফায় নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মোট ৪ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমার ভাইকে আগেই মেরে ফেলেছিল। আমরা ঘাতক মামুনের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।”

SHAPE  \* MERGEFORMAT

⚖️ মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর কাফরুল থানায় প্রথমে নিখোঁজ ডায়েরি হলেও পরবর্তীতে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে নিয়মিত মামলা করা হয়। পুলিশ ইতিমধ্যেই মামুনের কাছ থেকে মুক্তিপণের নগদ ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করেছে। ঘাতক মামুন আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় আজ ৭ অক্টোবর তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে অন্য কোনো সহযোগী জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ