ইন্দোনেশিয়ার গোল বন্যায় ভেসে গেলো বাংলাদেশ, ফিরে গেলো বড় হারের জামানায়
- আপডেট সময় : ১০:৫৯:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
- / ৯৪ বার পড়া হয়েছে
শেষ কবে এতোগুলো গোল হজম করছিল বাংলাদেশ? আজ আশিয়ান কাপে নিজেদের গ্রুপ শেষ ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে হারের পর বাংলাদেশের বড় পরাজয়ের পরিসংখ্যান নিয়ে শুরু হয়ে যায় ঘাটাঘাটি। ভাগ্যিস একটি গোল বেশি খেলে সেটি হয়ে যেতো বাংলাদেশের বড় পরাজয়ের সর্বোচ্চ রেকর্ড। সত্তর-আশির দশকের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ফুটবলের এমন চিত্র ছিলো অহরহ।
তবে ইন্দোনেশিয়ার কাছে এমন বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে আগে কখনোই দেখা যায়নি। চার বছর আগেও ২০২২ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার সাথে মর্যাদাপূর্ণ গোল শুন্য ড্র করেছিল লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা। অথচ হামজা জামানায় এসে এমন ভরাডুবি! হতবাক ফুটবল ভক্তরা। অসহায় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার হামজা চৌধুরী, হতভম্ব কোচ থমাস ডুলি দেখলেন বাংলাদেশ ফুটবলের বাস্তব চিত্র।
ফুটবলে বাংলাদেশ যখন এক ঝাক প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করছে, ঠিক তখনি এমন চপাটেঘাত যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে সব। নিখুত পাসিং, প্লেসিং রিসিভিং এবং বল লেন-দেনে তড়িৎ সিদ্ধান্তে একটু পিছিয়ে থাকলে যে বর্তমান গতিময় ফুটবলে কি দশা হয় সেটাও পরিস্কার হয়ে উঠলো আরেকবার। ইন্দোনেশিয়ার ঘরের মাঠে স্বাগতিকদের ফুটবল শক্তির বিপক্ষে পরাজয় নিশ্চিত ভেবেই নেয়া হয়েছিল। তাই বলে ব্যবধানটা এতো বড়? এর আগে ইন্দোনেশিয়ার কাছে জিতার রেকর্ড না থাকলেও এতো বড় পরাজয়ের রেকর্ড স্বাধীনতা উত্তর দেখা যায়নি। ইন্দোনেশিয়ার কাছে সবচে বড় পরাজয়টি ছিলো সেই মারদেকা টুর্নামেন্টে, ১৯৭৫ সালে। এরপর বাংলাদেশের সাথে ইন্দোনেশিয়ার ব্যবধানটা কখনো ২-১ কখনো ২-০ কখনো ১-১ আবার কখনো গোলশুন্য ড্র করতে দেখা যায়। ইতিহাসের সবচে বড় জয়টা মনে হয় তারা আজ বাংলাদেশের বিপক্ষেই আদায় করে নিলো। এমন জয়ের ফলে দলটি পৌছে গেলো আশিয়ান কাপের ফাইনালে।

আধুনিক ফুটবলের জামানায় বাংলাদেশের এমন পরাজয়ে স্যোসাল মিডিয়ায় সমালোচকরা নানা সমালোচনায় মেতে উঠেছেন। তারা বলতে শুরু করেছেন,তাহলে বাংলাদেশের ফুটবল এগুলো কোথায়। তবে বড় ব্যবধানে হারলেও বাংলাদেশের প্রাপ্তির জায়গাটা হচ্ছে এই টুর্নামেন্টে এই প্রথম প্রতিপক্ষের জালে দুই গোল করার কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছে। একটি করেছেন ইমন,যার কৃতিত্বে ছিলেন সুকি। অন্যটি করেছেন দ্বিতীয়ার্ধে সুকির স্থলে খেলতে নামা ফারহান ওয়াহিদ।
বাংলাদেশ সর্বশেষ নয় গোলের বড় পরাজয়ে বিদ্ধ হয়েছিল সেই ১৯৮২ সালে, ইরানের বিপক্ষে। এর আগে ১৯৭৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছেও ৯-০ গোলে এবং ১৯৭৫ সালে মারদেকা কাপে হংকংয়ের কাছে ৯-১ গোলে হেরেছিল। ৪৪ বছর ইন্দোনেশিয়ার কাছে বড় এই পরাজয়টি আজ ফের মনে করিয়ে দিয়েছে সেই সুদুর অতীতের কষ্টমাখা দিনগুলো।

ম্যাচের প্রথমার্ধেই ছয় গোল হজম করা বাংলাদেশ দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানের হার এড়াতে পারেনি। এই জয়ে আসিয়ান কাপের ফাইনালে উঠেছে ইন্দোনেশিয়া।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখলে এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরা। বাংলাদেশ গতির ওপর নির্ভর করে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও ১১ মিনিটেই প্রথম গোল হজম করে। ওলে রমনির ব্যাক পাস থেকে পাওয়া বল প্রথম স্পর্শেই জালে পাঠান মিচেল মাইকেল বাকার। হ্যাটট্রিকসহ একাই ৫ গোল করেন এই ইন্দোনেশিয়ান স্ট্রাইকার।
২০ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে ইন্দোনেশিয়া। এরপর বাংলাদেশের আক্রমণ থেকে বল বিপদমুক্ত করে পাল্টা আক্রমণে ওঠে তারা। একাধিকবার প্রতিহত হওয়ার পর জটলার মধ্য থেকে বল জালে পাঠান মাইকেল বাকার।
৩১ মিনিটে রিজকি রিদো করেন তৃতীয় গোল। তিন গোল হজমের পর অবশেষে ৩৬ মিনিটে ব্যবধান কমায় বাংলাদেশ। বাঁ দিক থেকে সুকির নিচু ক্রসে হেড করে বল জালে পাঠান শাহরিয়ার ইমন। এটি এবারের আসরে বাংলাদেশের প্রথম গোল।
তবে বাংলাদেশের গোলের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এক মিনিটের মধ্যেই আবার গোল করে ইন্দোনেশিয়া। রমনির কাটব্যাক থেকে পাওয়া বলে নিজের তৃতীয় গোল পূর্ণ করেন মাইকেল বাকার। ৪২ মিনিটে হেডে আরও একটি গোল করেন বেকার। যোগ করা সময়ে কর্নার থেকে হেডে গোল করে ইন্দোনেশিয়ার ব্যবধান ৬-১ করেন জাস্টিন হাবনার।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দুটি পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ। সুকির বদলে ফারহান আলী এবং ইমনের বদলে মিনহাজ মাঠে নামেন। চোটের কারণে প্রথমার্ধেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হওয়া শমিত সোমের জায়গায় নামেন সোহেল রানা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কিছুটা গুছিয়ে খেলে বাংলাদেশ। ৬০ মিনিট পর্যন্ত আর কোনো গোল হজম করেনি তারা; সেটিই ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ গোলবিহীন সময়।

তবে ৬০ মিনিটের পর আবার গোলের দেখা পায় ইন্দোনেশিয়া। মাইকেল বাকার করেন তাদের সপ্তম গোল। ৭৫ মিনিটে ইন্দোনেশিয়া আরও একটি গোলের সুযোগ তৈরি করলেও মেহেদী হাসানের দারুণ সেভে তা ঠেকিয়ে দেয় বাংলাদেশ। নহাজকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন ইন্দোনেশিয়ার এলকান ব্যাগোট। সম্ভাব্য লাল কার্ডের বিষয়টি ভিএআর পর্যালোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত হলুদ কার্ডের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। ৪ মিনিটে ইন্দোনেশিয়া আরও একটি গোল করলেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়।
৯০ মিনিট শেষে দুই মিনিট যোগ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচে আরও দীর্ঘ সময় খেলা হয়। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে রাকিব হোসেনের ক্রস থেকে দুর্দান্ত প্লেসমেন্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় গোল করেন ফারহান আলী।
এরপর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। যোগ করা সময়ের শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়া আবারও গোলের উৎসবে মাতে। কেভিন ডিকস ষষ্ঠ মিনিটে এবং লি বেকার সপ্তম মিনিটে গোল করলে ইন্দোনেশিয়ার জয় ৯-২ ব্যবধানে নিশ্চিত হয়।
শেষ বাঁশি বাজার পর ইন্দোনেশিয়ার খেলোয়াড়েরা উদ্যাপনে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা হতাশ হয়ে মাঠ ছাড়েন। ম্যাচ শেষে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় বাংলাদেশ অধিনায়ক হামজা চৌধুরীর মধ্যেও; কোচিং স্টাফের সদস্যরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এই জয়ের ফলে ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষে উঠে আসা ইন্দোনেশিয়া নিশ্চিত করেছে আসিয়ান কাপের ফাইনাল।









