এশিয়ান গেমস ও বাংলাদেশ; বড় বহর, ছোট অর্জন
- আপডেট সময় : ০২:২৫:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ৮৯ বার পড়া হয়েছে
এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ছে, বাড়ছে ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তার সংখ্যা; কিন্তু সেই তুলনায় সাফল্যের পাল্লা যেন ক্রমেই হালকা হচ্ছে। জাপানের আইচি-নাগোয়ায় শেষ হওয়া ২০তম এশিয়ান গেমসে ২২টি ডিসিপ্লিনে ২৬০ সদস্যের দল পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যে ছিলেন ১৮৭ জন অ্যাথলেট। এত বড় বহর অংশ নিয়েও বাংলাদেশের অর্জন শেষ পর্যন্ত থেমেছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদকে।
জনসংখ্যার হিসাবে প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশের জন্য ২০ কোটি টাকা ব্যায়ে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ—পরিসংখ্যানটি তাই শুধু একটি পদকের হিসাব নয়, বরং দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র পদকটি এনে দিয়েছেন উশু খেলোয়াড় জিন্নাত আক্তার। নারীদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে সেমিফাইনালে ওঠার পরই তাঁর ব্রোঞ্জ নিশ্চিত হয়।
২০১৪ সালের ইনচন এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ১৬৬ সদস্যের দল পাঠিয়ে একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জসহ মোট তিনটি পদক পেয়েছিল। এবার দল হয়েছে ২৬০ সদস্যের, অর্থাৎ বহরের আকার বেড়েছে ৫৬ শতাংশের বেশি। কিন্তু পদকের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে একটিতে—আগের আসরের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস।
এর মাঝের আসরগুলোর চিত্রও খুব উজ্জ্বল নয়। ২০১৮ সালের জাকার্তা-পালেমবাং এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট ও কাবাডি থেকে পদক এলেও সামগ্রিক সাফল্য ছিল সীমিত। ২০২২ সালের এশিয়ান গেমস, যা ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়, বাংলাদেশ পেয়েছিল দুটি ব্রোঞ্জ।
অর্থাৎ, এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের পদক-অর্জনের ধারাটি দীর্ঘদিন ধরেই মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিননির্ভর। এবারের আসরের আগে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনও জানিয়েছিল, ক্রিকেট, কাবাডি, শুটিং ও আর্চারির ওপরই মূলত পদকের আশা বেশি। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের আগের ১৪টি পদকের মধ্যে ছয়টি এসেছে ক্রিকেট থেকে, সাতটি কাবাডি থেকে এবং একটি বক্সিংয়ে। এবার প্রত্যাশার কোন ইভেন্ট থেকেই পদক জিততে পারেনি বাংলাদেশ।
তবে এবারের গেমসে বেশ কিছু নতুন ডিসিপ্লিন যুক্ত হয়ে প্রতিযোগিতার আকর্ষণ বাড়িয়েছে। চীন বরাবরের মতো পদক তালিকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখলেও ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো দুর্দান্ত লড়াই উপহার দিয়েছে৷ শ্যুটিং, আরচারি ও ম্যারাথনে তৈরি হয়েছে নতুন অনেক রেকর্ড।
বাংলাদেশের রেকর্ডটাই শুধু নিচের দিকে। ব্রুনাইয়ের মতো ধনী একটি দেশের ৬ অ্যাথলেট অংশ নিয়ে জিতেছে একটি পদক, সেখানে বাংলাদেশের ১৮৭ জনের বিপরীতে এসেছে একটি পদক। ভারত আর বাংলাদেশের ব্যবধানটতো আকাশ- পাতাল৷ পদক যুদ্ধে ৪৬টি দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে ভারত, ৮৫ টি পদক নিয়ে দেশে ফিরেছে৷ শ্রীলঙ্কাও স্বর্ণ পদকসহ তিনটি পদক নিয়ে ঘরে ফিরেছে।
আর বাংলাদেশের অর্জন, উশুতে একমাত্র ব্রোঞ্জপদক জয়। তাও প্রথম ম্যাচে বাই এবং পরের ম্যাচে প্রতিপক্ষ ওভার ওয়েট ডিস কয়ালিফাই হওয়ার সুবাদে সেমিফাইনালে পৌছে এই পদকের অর্জন।
বাকিটা শুধুই ব্যর্থতার সেই পুরানো গল্প। অজুহাতে থাকছে- গেমসে অংশ গ্রহনে অভিজ্ঞতা অর্জনই বড় কথা। স্বাধীনতাউত্তর পাওয়া সেই একই সূত্রেই চলছে বাংলাদেশ। অথচ এরই মাঝে কেটে গেছে স্বাধীনতার ৫৪টি বছর। প্রতিবারেই স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন ভঙ্গের মধ্যেই আটকে আছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন।
অথচ গেমসে যাবার আগে প্রত্যাশায় ছিলো ক্রিকেট,কাবাডি, শ্যূটিং, আরচ্যারিতে পদক জেতার৷ বাকি সব কয়টিতে ছিল অভিজ্ঞতার দোহাই নিয়ে গেমসে অংশগ্রহন৷ উশুতে কপালগুনে পেয়ে যাওয়া ব্রোঞ্জপদকটাই হয়ে উঠলো একমাত্র প্রাপ্তির একমাত্র সম্বল৷ ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই অর্জন!
এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রতিযোগীরা যখন পদক গলায় ঝুলিয়ে আনন্দ করছে তখন লাল সবুজ পতাকায় ভাসছে হতাশার এমন মেঘ৷ শ্যুটিং, আরচ্যারি আর কাবাডির পর শেষ ভরসা ক্রিকেটেও যাচ্ছে তাই৷ মহিলা ক্রিকেটের পর পুরুষ ক্রিকেটেও পদক শুন্য। ২০১০ সালে এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের শুরুতেই বাংলাদেশ স্বর্ণ পদক জিতেছিল। পরবর্তীতে কখনো রৌপ্য কখনো ব্রোঞ্জ পদক ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গী। এবারই প্রথম ক্রিকেটেও হারালো পদক।
অথচ গেমসে যাবার আগে যে ভাবে প্রত্যাশার গল্প শোনানো হয়েছিল তাতে মনে হতেই পারে বাংলাদেশ সম্ভবত এবার সেরা অর্জনটাই জাতিকে উপহার দিতে যাচ্ছে৷ গেমস অংশ নেয়ার পর বাংলাদেশর প্রতিযোগিরা দেখলো কঠিন বাস্তবতা৷ লড়াইয়ের আগে প্রতিপক্ষের অগ্রগতি সম্পর্কেই জানাই নেই বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের৷
জানবে বা কি করে! বাংলাদেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোতে যখন থেকে রাজনীতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তখন থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের পোয়া মারা শেষ৷ গত ত্রিশ বছরের ক্রীড়া সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা জানান দিচ্ছে এমন তথ্য৷ এখানে চেয়ার দখলবাজদের সংখ্যাই বেশি৷ পদ- পদবীটাি যেখানে মুখ্য৷ এরপর কোন আন্তর্জাতিক গেমস শুরু হলে সরকারি টাকায় সে গেমসে অংশ নেয়ার লম্বা লাইনের হিড়িক লেগে যায়৷ জাপান আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি৷ এমন কি জাপান সফরে ক্রীড়া অভিবাবক বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন ( বিওএ) এর ভূমিকাতেও দেখা গেছে নিরবতা৷ উল্টো বিওএ থেকেও এই বিলাস ভ্রমনে একটি বড় অংশ জাপান সফরে অংশ নিতে দেখা যায়৷
বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডির কথাই ধরুন, সেটিও চুরি হয়ে গেছে৷ বাংলাদেশ থেকে কোচ নিয়ে এখন বাংলাদেশকেই হারাচ্ছে প্রতিপক্ষ দলগুলো৷ চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে জিতে যে উল্লাসে মেতেছিলেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা, তাতে মনে হয়েছিল পদক তাদের কনফার্ম৷ কিন্তু পরের দিনেই স্বাগতিক জাপানের কাছে হেরে ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ৷ কাবাডির পদক জেতার কবর রচনা হয়ে গেল ওখানেই৷
এমন চরম ব্যর্থতার পোষ্টমোটেম নিয়ে আওয়াজ তুলেছেন স্বয়ং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক৷ তাই আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের বিষয়টি তদন্ত করার হুঙ্কার দিয়েছেন তিনি। কারণ, ক্রীড়া অভিবাবক হিসেবে এই ব্যর্থতার দায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর উপরও বর্তায়। যদিও এই তদন্ত শেষ অব্দি আলোর মুখ দেখবে কিনা অতীত অভিজ্ঞতায় সংশয় থাকছে।
তবে দলের ব্যর্থতা নিয়ে কোন আপত্তি নেই। না থাকারও যথেষ্ট কারণ আছে। এশিয়ান গেমসের জন্য অ্যাথলেটদের কতোটা প্রস্তুত করানো গেছে। জাপান সফরের আগে এক কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলনে উচ্চস্বরে আওয়াজ তুলেছিলেন, কমপক্ষে একটানা দুই বছর অনুশীলন/প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পর সমালোচনা করতে পারেন। এর আগে সমালোচনা করাটা অন্যায় হবে। আর যাই হোক গেমসে পদক জেতার জন্য দুই মাসের প্রস্ততি যথেষ্ট সময় নয়। স্বাধীনতাউত্তোর আন্তর্জাতিক গেমসের আগে বরাবরই ছিলো এমন অভিযোগ। টাকা নেই, প্রস্তুতি নেই। গেমসের জন্য পর্যাপ্ত অনুশীলন করানো যায়নি। এই অভিযোগ এবারও উঠেছিল। তবে একেবারেই মিথ্যা নয়। গেমসের মাত্র দুই মাস আগ থেকে শুরু হয় বাংলাদেশের ২২টি ডিসিপ্লিনের প্রস্তুতি পর্ব। তাও ছিল আর্থিক টানাটানি। বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন থেকেও উঠেছিল এমন অভিযোগ,ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তুতির জন্য টাকা চেয়েও পাওয়া যায়নি।
কিন্তু আপত্তিটা হচ্ছে- ওই যে ২৬০ প্লাস কন্টিনজেন্ট। নিজেদের অবস্থান জানার পরেও কেন এতো বড় বহর পাঠাতে হবে? বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন (বিওএ) থেকেও বা কেন এ ব্যাপারে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি। বিশাল বাজেটের এতো বড় বহর পাঠানোরও বা কি দরকার ছিলো? স্রেফ অর্থ অপচয়ের বিষয়টি উঠে আসছে। যেখানে অর্থের অভাবে অনুশীলন করানো যায়নি,সেখানে শুধু বিলাস ভ্রমনেই বিশকোটি টাকা শেষ!
অথচ বর্তমান তারেক রহমানের সরকার সবকিছুতে কৃচ্ছতা সাধনে মনোযোগি হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি নিজেই ১২০ টাকার খাবার খেয়ে, টিএডিএ বিল না নিয়ে দেশপ্রেমে উবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনে দেখা মিললো তার উল্টো চিত্র। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ঠিকাদারি থেকে শুরু করে ক্রীড়া ফেডারেশনের কর্মকর্তা হওয়ার দৌড়ে রয়েছে দেন-দরবার। চার্জ কমিটি গঠনেও মিলেনি কোন সুফল। কারণ যাদের নিয়ে ফেডারেশনগুলো সাময়িকভাবে দাড় করানো হয়েছিল,তারা তো এই দেশেরই মানুষ। একজন সংগঠককে মনের দুখ্যে একটি গানকে উল্টো করে গাইতে দেখা যায়- -‘ এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে না কো তুমি, যে দেশেতে চোর বাটপারে ভরে গেছে ভূমি।’ এই আগাছা পরিস্কার করা না গেলে সব কিছুই যাবে বিফলে।
পারফরম্যান্স পর্যালোচনা : প্রাপ্তি ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প
উশুতে ঐতিহাসিক সাফল্য ও একমাত্র পদক
এবারের আসরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র সাফল্য এসেছে উশু ডিসিপ্লিন থেকে মেয়েদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে সান্দা ইভেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করেন জিন্নাত আক্তার। কোয়ার্টার ফাইনালে ইন্দোনেশিয়ার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অতিরিক্ত ওজনের কারণে ডিসকোয়ালিফাইড হলে সেমিফাইনালে পা রাখেন জিন্নাত । এশিয়ান গেমসের উশু ইভেন্টে এটিই বাংলাদেশের প্রথম পদক এবং ১৯৮৬ সালের পর একক কোনো ইভেন্টে এটি বাংলাদেশের প্রথম পদক জয় ।
ক্রিকেট ও পদক শুন্য
পুরুষ ক্রিকেট দল লিটন দাসের নেতৃত্বে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে জাপানে গিয়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হলেও র্যাংকিং সুবিধায় বাংলাদেশ সেমিফাইনালে ওঠে। তবে ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হাই-ভোল্টেজ সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ৬ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। মাত্র ১১১ রানে আটকে যাওয়ার পর পাকিস্তান ১১.৩ ওভারেই লক্ষ্য পার করে ফেলে। ৩ অক্টোবর ব্রোঞ্জ পদক নির্ধারণী ম্যাচে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ দল ।নারী ক্রিকেট দল তো আরো আগেই বিদায় নিয়েছে।
কাবাডিতে চরম হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ
বাংলাদেশের অন্যতম পদক সম্ভাবনাময় ইভেন্ট ছিল কাবাডি । পুরুষ দল গ্রুপ পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনা তাইপেইকে হারিয়ে দারুণ সূচনা করেছিল । কিš‘ সেমিফাইনাল ও পদক নিশ্চিত করার মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্বাগতিক জাপানের কাছে ৪০-৩৭ ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ। প্রথমার্ধে ৩১-২০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। অন্যদিকে, নারী কাবাডি দলও ভারতের কাছে ৪২-২১ ব্যবধানে বড় ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
হকিতে সেরা ছয়ের স্বপ্নভঙ্গ
জার্মান কোচের অধীনে নিবিড় প্রশিক্ষণ নিয়ে সেরা ছয়ে থাকার লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ হকি দল । গ্রুপ পর্বে ৪টি পয়েন্ট নিয়ে ভালো অবস্থানে থাকলেও স্থান নির্ধারণী ম্যাচে চীনের কাছে ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে রাকিবুল হাসান একটি ফিল্ড গোল করলেও চীনের আক্রমণভাগের সামনে পুরো ম্যাচেই অসহায় ছিল রক্ষণভাগ। ফলে সপ্তম-অষ্টম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে থাইল্যান্ডের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।
আরচারি ও শ্যুটিংয়ে আশানুরূপ ফলাফল না করা
গেমসের অন্যতম প্রত্যাশিত ইভেন্ট আরচারি এবং শ্যুটিংয়ে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পদকের দেখা পাননি। এশিয়ার বিশ্বমানের প্রতিযোগীদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে কোয়ার্টার ফাইনাল বা চূড়ান্ত রাউন্ডের আগেই বিদায় নিতে হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের।
নারী ফুটবল :
এশিয়ান গেমসে নারী ফুটবলের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছিল চরম বিপর্যয় দিয়ে। গ্রুপ ‘বি’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার কাছে ০-১০ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশ দল। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধেও আশানুরূপ পারফরম্যান্স দেখাতে ব্যর্থ হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় তারা।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দাপট দেখালেও এশিয়ার শীর্ষ পরাশক্তিদের সামনে বাংলাদেশের মেয়েদের মাঠের পারফরম্যান্স ছিল একেবারেই ছন্নছাড়া এবং উন্নতির গ্রাফ ছিল খুবই সামান্য। দীর্ঘমেয়াদি ও উন্নত প্রস্তুতির অভাব এখানে স্পষ্ট ধরা পড়েছে।
বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশন এই আসরে পুরুষ ও নারী বিচ ভলিবল দল পাঠিয়েছিল আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে। তবে এশিয়ার শীর্ষ স্তরের দলগুলোর মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশ কোনো রাউন্ডেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি এবং প্রাথমিক পর্ব থেকেই ছিটকে যায়।
ইনডোর বা বিচ—কোনো ফরম্যাটেই বাংলাদেশ এশিয়ার মূল স্রোতের দলগুলোর শক্তির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। মূলত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে এখানে বড় কোনো চমক আসেনি।
ব্যাডমিন্টনে পুরুষ দলগত (Men’s Team) ইভেন্টে শক্তিশালী ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। ভারতের বিশ্বমানের শাটলারদের সামনে বাংলাদেশের শাটলাররা দাঁড়াতেই পারেননি। সিঙ্গেলস ম্যাচের কোনো শাটলারই বিশ্ব র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০০-র মধ্যে না থাকায় ভারত সহজেই ৩-০ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয় (এমনকি ভারতের শীর্ষ ডাবলস জুটিকে কোর্টেই নামতে হয়নি)।
একক ও দলগত কোনো বিভাগেই বাংলাদেশের শাটলাররা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেননি। আধুনিক স্পোর্টিং গিয়ার এবং উন্নত কোচের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের অভাব এই ডিসিপ্লিনটিকে পদকের দৌড় থেকে ছিটকে দিয়েছে।
গেমসে ৪ জন জুডোকা অংশ নিলেও ম্যাটের লড়াইয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না। এশিয়ার পরাশক্তি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জুডোকাদের টেকনিক ও শক্তির কাছে প্রথম রাউন্ডগুলোতেই বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা পরাস্ত হন।
দক্ষিণ এশীয় (SA Games) পর্যায়ে জুডোতে কিছুটা পদক পাওয়ার রেকর্ড থাকলেও এশিয়ান গেমসের মতো অলিম্পিক মানের আসরে বাংলাদেশের জুডোকাদের পারফরম্যান্স ছিল একেবারেই নখদন্তহীন।
গত আসরগুলোর ফ্ল্যাগ বেয়ারার এবং এসএ গেমসের স্বর্ণজয়ী ডিসিপ্লিন হওয়ায় কারাতে নিয়ে কিছুটা আশা থাকলেও ২০২৬ আসরে ৪ জন কারাতেকা অংশ নিয়ে কোনো পদক বা সাফল্য এনে দিতে পারেননি।
কারাতে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ব্যক্তিগত ইভেন্ট হওয়া সত্ত্বেও যথাযথ স্পনসরশিপ, বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক এক্সপোজার এবং আধুনিক ট্রেনিং সুবিধার অভাবে এই ইভেন্ট থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
অ্যাথলেটিক্স
২০২৬ এশিয়ান গেমসের অ্যাথলেটিক্সে পদক না পেলেও দেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর রহমান সেমিফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন করেছেন । অ্যাথলেটিক্সে মূল আলোটা কেড়ে নিয়েছিলেন মূলত দেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর রহমানই। তবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের সাথে কঠিন লড়াইয়ের পর সেমিফাইনাল থেকেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।এই লেবেলে পৌছানো বাংলাদেশের জন্য এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি। চূড়ান্ত লড়াইয়ে সেরা আটে সপ্তম হন তিনি।
প্রথম রাউন্ড (হিট): ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হিটে ১০.৪৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি নিজের গ্রুপে চতুর্থ হন এবং এশিয়ার সেরা ২৪ জন স্প্রিন্টারের মধ্যে থেকে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেন
সেমিফাইনাল: ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পুরুষদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের প্রথম সেমিফাইনাল হিটে ইমরানুর রহমান কিছুটা টাইমিং উন্নত করে ১০.৪৪ সেকেন্ডে রেস শেষ করেন তবে এই গ্রুপে থাকা ৮ জন রানারের মধ্যে ৭ম ¯’ান অর্জন করায় ফাইনালের টিকিট কাটা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং তিনি টুর্নামেন্ট।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া এখন বাংলাদেশের জন্য নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে যদি পদকের সংখ্যা না বাড়ে, তাহলে সেই অংশগ্রহণের কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ২৬০ সদস্যের বহর, ২২টি ডিসিপ্লিন এবং ১৮৭ অ্যাথলেট—এই বিশাল আয়োজনের বিপরীতে শেষ পর্যন্ত একটি ব্রোঞ্জের হিসাবটি তাই অস্বস্তিকর।
সমস্যা শুধু ক্রীড়াবিদদের নয়। প্রতিভা খোঁজা, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের কোচ, আধুনিক সরঞ্জাম, নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, স্পোর্টস সায়েন্স, পুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি—সবকিছুকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। কয়েক মাসের ক্যাম্প কিংবা বড় আসরের আগে প্রস্তুতি নিয়ে এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়।
চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত কিংবা ইরানের মতো দেশগুলো বছরের পর বছর ধরে ক্রীড়াবিদ তৈরির অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এবারের আইচি-নাগোয়া গেমসেও চীন ১৬৯টি স্বর্ণসহ ৩৪১টি পদক নিয়ে শীর্ষে থেকে আসর শেষ করেছে।
বাংলাদেশের জন্য তাই একটি ব্রোঞ্জ শুধু সাফল্যের স্মারক নয়, একই সঙ্গে সতর্কবার্তাও। বিশাল জনসংখ্যার দেশ হয়েও যদি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রীড়া শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বারবার পিছিয়ে পড়তে হয়, তাহলে শুধু অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই। দরকার পদক জয়ের মতো ক্রীড়াবিদ তৈরির পরিকল্পনা।
আইচি-নাগোয়া পেরিয়ে এশিয়ান গেমস এখন দোহায়। পরবর্তী চার বছর বাংলাদেশের সামনে সুযোগ—একটি ব্রোঞ্জকে সান্ত্বনার পদক হিসেবে রেখে দেওয়া, নাকি সেটিকে পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে ব্যবহার করা। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য আসল পরীক্ষা সেখানেই।
















