ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর বার্তা আইজিপির,সরকার অনুমোদন দিলে ক্রসফায়ার করবে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৬:৩০:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪২ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
  • পুলিশের কাজের পরিবেশ চান আইজিপি
  • মাদক কারবারে পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
  • মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, বিচারও গুরুত্বপূর্ণ
  • আইন প্রয়োগে সংবিধানের বাধ্যবাধকতা

মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার অনুমোদন দিলে পুলিশ প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করতেও পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, পুলিশকে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। একই সঙ্গে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর দাবি, মাদক কারবারের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগে গত দুই মাসে ২৭ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর চকবাজারে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেমের’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আইজিপি।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘কে আসবে, কী হবে—সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে, যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটিই আমরা করব। ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ (অনুমোদন) করে, আমরা সেটাই করব।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এবং জনগণকে স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দিতে দিন-রাত কাজ করছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নিরাপদ পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

পুলিশের দায়িত্ব পালন নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে আইজিপি বলেন, ‘লাঠিপেটা করলে বলবে ফ্যাসিস্ট পুলিশ, আর নীরবে থাকলে বলবে দুর্বল পুলিশ। কাজেই আমাদের কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকার পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার এবং মাদক কারবারের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা তুলে ধরেন আইজিপি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মাদক কারবারের সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের পাশাপাশি পুলিশের কিছু সদস্যেরও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

আইজিপি বলেন, ‘আগে নিজের ঘর পরিষ্কার রাখতে হবে।’ তবে কথায় কথায় পুলিশের ওপর দায় চাপানো ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, সামাজিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন পুলিশপ্রধান।

দেশে মাদক অপরাধের বিস্তার মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তদন্ত, বিচার ও অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও তা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অধিদপ্তর ১ লাখ ২২ হাজার ৪২২টি মাদক-সংশ্লিষ্ট মামলা করেছিল। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩৭৬টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল, যা মোট মামলার প্রায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর ৭ হাজার ৫৩৯টিতে আসামিরা খালাস পান।

এ পরিসংখ্যান মাদক অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় মামলার নিষ্পত্তি ও তদন্তের মানের গুরুত্ব তুলে ধরে। মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, অর্থের উৎস অনুসন্ধান এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া কার্যকর মাদক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’সংক্রান্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইন প্রয়োগের সাংবিধানিক সীমারেখাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

অর্থাৎ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশকে আইন ও সংবিধানের বিধান মেনে চলতে হয়। সরকারের অনুমোদনের কথা উল্লেখ করলেও কোনো পদক্ষেপের বৈধতা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য আইন ও সংবিধানের আলোকে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনসম্মত প্রক্রিয়া, জবাবদিহি ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা—এই তিন ক্ষেত্রের সমন্বয়ই পুলিশের কার্যকারিতা ও জনআস্থা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর বার্তা আইজিপির,সরকার অনুমোদন দিলে ক্রসফায়ার করবে পুলিশ

আপডেট সময় : ০৬:৩০:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • পুলিশের কাজের পরিবেশ চান আইজিপি
  • মাদক কারবারে পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
  • মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, বিচারও গুরুত্বপূর্ণ
  • আইন প্রয়োগে সংবিধানের বাধ্যবাধকতা

মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার অনুমোদন দিলে পুলিশ প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করতেও পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, পুলিশকে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। একই সঙ্গে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর দাবি, মাদক কারবারের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগে গত দুই মাসে ২৭ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর চকবাজারে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেমের’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আইজিপি।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘কে আসবে, কী হবে—সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে, যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটিই আমরা করব। ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ (অনুমোদন) করে, আমরা সেটাই করব।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এবং জনগণকে স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দিতে দিন-রাত কাজ করছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নিরাপদ পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

পুলিশের দায়িত্ব পালন নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে আইজিপি বলেন, ‘লাঠিপেটা করলে বলবে ফ্যাসিস্ট পুলিশ, আর নীরবে থাকলে বলবে দুর্বল পুলিশ। কাজেই আমাদের কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকার পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার এবং মাদক কারবারের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা তুলে ধরেন আইজিপি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মাদক কারবারের সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের পাশাপাশি পুলিশের কিছু সদস্যেরও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

আইজিপি বলেন, ‘আগে নিজের ঘর পরিষ্কার রাখতে হবে।’ তবে কথায় কথায় পুলিশের ওপর দায় চাপানো ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, সামাজিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন পুলিশপ্রধান।

দেশে মাদক অপরাধের বিস্তার মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তদন্ত, বিচার ও অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও তা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অধিদপ্তর ১ লাখ ২২ হাজার ৪২২টি মাদক-সংশ্লিষ্ট মামলা করেছিল। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩৭৬টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল, যা মোট মামলার প্রায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর ৭ হাজার ৫৩৯টিতে আসামিরা খালাস পান।

এ পরিসংখ্যান মাদক অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় মামলার নিষ্পত্তি ও তদন্তের মানের গুরুত্ব তুলে ধরে। মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, অর্থের উৎস অনুসন্ধান এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া কার্যকর মাদক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’সংক্রান্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইন প্রয়োগের সাংবিধানিক সীমারেখাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

অর্থাৎ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশকে আইন ও সংবিধানের বিধান মেনে চলতে হয়। সরকারের অনুমোদনের কথা উল্লেখ করলেও কোনো পদক্ষেপের বৈধতা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য আইন ও সংবিধানের আলোকে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনসম্মত প্রক্রিয়া, জবাবদিহি ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা—এই তিন ক্ষেত্রের সমন্বয়ই পুলিশের কার্যকারিতা ও জনআস্থা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।