লক্ষ্য টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে খেলা ,আলোচনায় ব্যাটিং কোচ পরিবর্তন, প্রশ্নের মুখে বিসিবির সিদ্ধান্ত
- আপডেট সময় : ০৭:০৩:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
- / ৪২ বার পড়া হয়েছে
- আশরাফুলকে সরানোর কারণ স্পষ্ট নয়, অন্তর্বর্তী দায়িত্বে সালাহউদ্দিন
এক সপ্তাহের ব্যবধানে একের পর এক নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। এর মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তাঁর জায়গায় অন্তর্বর্তীকালীন ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটের প্রধান কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট না করায় বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও জাতীয় দলের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আজ সোমবার মিরপুরে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল এমন বিশৃঙ্খলা নিয়ে। পরে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সিমন্স বলেন, ‘আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আছেন। আমার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বিশ্ব ক্রিকেট দেখছেন। কোনো ম্যাচের আগে কি এই প্রথম এমন বিশৃঙ্খলা দেখছেন?’
তবে সিমন্সের মনোযোগ এখন মাঠের ক্রিকেটে, ‘আসল বিষয় হলো, আমরা কীভাবে নিজেদের কাজটা করি, সিরিজের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিই। আমার মনে হয়, গত তিন চার দিনে এখানে যে দলটি ছিল, তারা দারুণ কাজ করেছে। তারা নিজেদের কাজ করেছে। এখন পুরো দল একসঙ্গে হচ্ছে। আগামী দুই দিনে আমরা কী করি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে কী ঘটছে, সেটা নয়। দল হিসেবে প্রস্তুতির জন্য আমরা কী করছি, সেটাই আসল।’
সবার মধ্যেই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলার লক্ষ্য আছে জানিয়ে বাংলাদেশ কোচ বলেন, ‘আমার মনে হয়, সবাই টেস্ট ম্যাচ নিয়েই খুব মনোযোগী। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে খেলার লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা সবার মধ্যে আছে। এবারই প্রথম আমাদের সেখানে খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই আমার মনে হয়, টেস্ট ম্যাচগুলোর জন্য সবাই পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবে।’
প্রধান কোচ সিমন্স খেলার দিকে মনোনিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করলেও ক্রিকেট পাড়ায় আলোচনায় হঠাৎ ব্যাটিং কোচ পরিবর্তনে।আগামী ২৮ অক্টোবর মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ শুরু হওয়ার কথা। সিরিজের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শনিবার সকালেও জাতীয় দলের ব্যাটারদের নিয়ে কাজ করেছেন আশরাফুল। অথচ সেদিন সন্ধ্যায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার খবর আসে। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের মাধ্যমে তাঁকে সিদ্ধান্তটি জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আশরাফুলকে বোর্ডের অন্য কোনো দায়িত্বে পুনর্বিন্যস্ত করা হতে পারে।
যদিও আশরাফুলকে সরানোর বিষয়ে বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ রব্বানী জানিয়েছিলেন, সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কোন কারণে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানো হলো, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। বোর্ডের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে বিদেশি ব্যাটিং কোচ নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলার কথা জানানো হয়েছে।

আশরাফুলের দায়িত্ব হারানোর পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ব্যাটারদের ব্যর্থতা বড় কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল হতাশাজনক। তবে বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পারফরম্যান্সকেই সিদ্ধান্তের একমাত্র কারণ হিসেবে উল্লেখ করেনি।
রোববার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আশরাফুল জানান, শনিবার সন্ধ্যায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বোর্ড চাইলে তাঁকে অন্য দায়িত্বে নিয়োজিত করতে পারে বলেও স্বীকার করেন সাবেক এই অধিনায়ক। জাতীয় দলের হয়ে কাজ করাকে তিনি গর্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
টেস্টে সাফল্য, ওয়ানডেতে হতাশা
আশরাফুলের দায়িত্বকালীন পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে মিশ্র চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর অধীনে বাংলাদেশ আটটি টেস্ট খেলে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে, একটি ড্র করেছে এবং দুটি ম্যাচে হেরেছে। এই সময়ে আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজে সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ডারউইনে ঐতিহাসিক জয়ও এসেছে এই সময়ের মধ্যে।
তবে সব সংস্করণে ব্যাটারদের পারফরম্যান্স সমান ছিল না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত ফল পায়নি। টুর্নামেন্টে ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। এর আগে জিম্বাবুয়ে সফরেও ব্যাটারদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এসব ব্যর্থতার দায় ব্যাটিং কোচের ওপর কতটা বর্তায়, তা নিয়ে অবশ্য আলাদা করে মূল্যায়ন প্রয়োজন।
দ্য ডেইলি স্টারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আশরাফুলের অধীনে ১৪ ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংসপ্রতি গড় সংগ্রহ ছিল ২০২.৮ রান। এর আগের ১৪ ম্যাচে সালাহউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে এই গড় ছিল ২১৭.৬। যদিও এমন পরিসংখ্যান ব্যাটিং কোচের কাজের মূল্যায়নে প্রাসঙ্গিক, তবু প্রতিপক্ষের শক্তি, উইকেটের ধরন, ম্যাচের পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সংস্করণে দলের পারফরম্যান্স বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সালাহউদ্দিনের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ
আশরাফুলের পরিবর্তে দায়িত্ব পাওয়া সালাহউদ্দিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের আগে ব্যাটারদের প্রস্তুত রাখা। তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে আগে সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছেন এবং ব্যাটিং বিভাগ দেখভালের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি নতুন করে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

তবে সিরিজের ঠিক আগে দায়িত্ব পরিবর্তনের কারণে প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের জন্য ধৈর্য, উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকা এবং জুটিতে রান তোলার সক্ষমতা অপরিহার্য। স্বল্প সময়ের মধ্যে এসব ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনা সহজ নয়।
বিসিবি জানিয়েছে, স্থায়ী ব্যাটিং কোচ নিয়োগের আগপর্যন্ত সালাহউদ্দিন দায়িত্ব পালন করবেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পর বিদেশি ব্যাটিং কোচ নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বারবার পরিবর্তনেই কি সমাধান?
বাংলাদেশ ক্রিকেটে ব্যাটিং কোচের পদে পরিবর্তন নতুন ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে বিদেশি ও দেশি কোচ দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁদের কারও মেয়াদ দীর্ঘ হয়েছে, কারও দায়িত্ব শেষ হয়েছে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার অভিযোগে, আবার কেউ ব্যক্তিগত কারণে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফলে ব্যাটিং সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে গিয়ে কোচ পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একজন ব্যাটিং কোচের কাজ কেবল খেলোয়াড়দের টেকনিক সংশোধন করা নয়; দলের ব্যাটিং পরিকল্পনা তৈরি, প্রতিপক্ষের বোলিং বিশ্লেষণ, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রূপরেখা তৈরিও তাঁর দায়িত্বের অংশ। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, নির্বাচকদের পরিকল্পনা এবং দলের সামগ্রিক কৌশলও পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।
আশরাফুলকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিসিবির মূল্যায়নপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা নিয়ে আলোচনা থাকতেই পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনের যৌক্তিকতা বিচার হবে মাঠের পারফরম্যান্সে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আসন্ন দুই টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটাররা কতটা ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেন, সেটিই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
কোচ পরিবর্তন তাই শুধু একটি পদে রদবদল নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাটিং পরিকল্পনা, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি এবং বোর্ডের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সম্পর্কেও প্রশ্ন সামনে এনেছে। উত্তর মিলবে সিরিজের মাঠের লড়াইয়ে, আর দীর্ঘমেয়াদে মিলবে ব্যাটিং উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়।























