ঢাকা ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ডাকবিভাগে ব্যাপক পরিবর্তন, যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৬:২০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৫ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চিঠি, ডাকটিকিট আর মানি অর্ডারের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। একসময় ধীরগতির সেবার জন্য যে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে মানুষের নানা অভিযোগ ছিল, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন সেবা চালুর মধ্য দিয়ে সেই চিত্র পাল্টানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন চিঠিপত্রের পাশাপাশি পণ্য, নথি ও পার্সেল দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চালু হয়েছে বিশেষায়িত সেবা। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই নিজেদের সেবার পরিধি বাড়াচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান।

ই-কমার্স ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে দ্রুত পার্সেল পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে। সেই চাহিদা বিবেচনায় ডাক বিভাগের অন্যতম নতুন সংযোজন ‘স্পিড পোস্ট’। ‘আজ বুকিং, আগামীকাল ঢাকা এবং ৪৮ ঘণ্টায় সারা বাংলাদেশ’—এই লক্ষ্য সামনে রেখে সেবাটি পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্তমানে স্পিড পোস্টে প্রথম ১ কেজি পার্সেলের মাশুল ১০ টাকা এবং অতিরিক্ত প্রতি কেজির জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ৩০ কেজি পর্যন্ত পার্সেল পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

শুধু কম মাশুল নয়, পার্সেল কোথায় রয়েছে তা জানার জন্য যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা। বুকিংয়ের পর পাওয়া ট্র্যাকিং নম্বর ব্যবহার করে গ্রাহক অনলাইনে পার্সেলের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানতে পারছেন। পার্সেলের সম্ভাব্য খরচ হিসাব করার জন্য রয়েছে অনলাইন ডাক মাশুল ক্যালকুলেটরও। ফলে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বেড়েছে।

ডাক বিভাগের বড় শক্তি তার দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। দেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যন্ত ডাকঘরের উপস্থিতি রয়েছে। এই অবকাঠামোকেই কাজে লাগিয়ে পার্সেল পরিবহনের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বর্তমানে জিপিও, প্রধান ডাকঘর, উপজেলা ডাকঘর, টাউন সাব-পোস্ট অফিস, সাব-পোস্ট অফিস, আরএমএস বুকিং কাউন্টার ও ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস থেকে স্পিড পোস্টে পার্সেল বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকায় ঢাকা জিপিওসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট অফিস থেকেও পার্সেল গ্রহণ ও বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ডাক বিভাগের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সময়ের সঙ্গে সেবাকে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে সাধারণ চিঠিপত্রের ব্যবহার কমেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সংগ্রহ, পরিবহন ও বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা চালু করায় ডাক বিভাগকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ অবস্থায় পার্সেল ও লজিস্টিকস সেবাকে গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

ই-কমার্স খাতের জন্যও ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক বিক্রেতাদের জন্য পণ্য দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে পাঠানোর সুযোগ ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারে। ডাক বিভাগ ইতোমধ্যে দেশজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল পোস্ট অফিস ও ই-কমার্সের লজিস্টিকস সহায়তায় ফুলফিলমেন্ট সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

এদিকে ডাক বিভাগকে আরও আধুনিক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং কেন্দ্রীয় লজিস্টিকস ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। ভূমি, পাসপোর্ট, স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ নাগরিক সেবাও ডাকঘরের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে ডাকঘরকে শুধু চিঠি বা পার্সেল পাঠানোর জায়গা না রেখে বহুমুখী জনসেবা কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে আধুনিকায়নের এই উদ্যোগের পাশাপাশি কিছু পুরোনো সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দেশের সব ডাকঘরে একই ধরনের ডিজিটাল ও পার্সেল সেবা এখনো সমানভাবে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার সক্ষমতা বাড়ানো, দ্রুত সংগ্রহ ও ডেলিভারি নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকের দরজায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু কম মাশুল যথেষ্ট নয়; সময়নিষ্ঠ ডেলিভারি, নিরাপদ পরিবহন, অনলাইন ট্র্যাকিং, গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিনের অবকাঠামো ও দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে ডাক বিভাগ আবারও দেশের পার্সেল ও লজিস্টিকস খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে।

ফলে ‘চিঠির ডাকঘর’ হিসেবে পরিচিত পুরোনো ভাবমূর্তি বদলে এখন ‘ডিজিটাল সেবা ও লজিস্টিকস কেন্দ্র’ হিসেবে নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। প্রতিযোগিতার বাজারে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ডাকবিভাগে ব্যাপক পরিবর্তন, যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি

আপডেট সময় : ০৬:২০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

চিঠি, ডাকটিকিট আর মানি অর্ডারের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। একসময় ধীরগতির সেবার জন্য যে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে মানুষের নানা অভিযোগ ছিল, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন সেবা চালুর মধ্য দিয়ে সেই চিত্র পাল্টানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন চিঠিপত্রের পাশাপাশি পণ্য, নথি ও পার্সেল দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চালু হয়েছে বিশেষায়িত সেবা। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই নিজেদের সেবার পরিধি বাড়াচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান।

ই-কমার্স ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে দ্রুত পার্সেল পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে। সেই চাহিদা বিবেচনায় ডাক বিভাগের অন্যতম নতুন সংযোজন ‘স্পিড পোস্ট’। ‘আজ বুকিং, আগামীকাল ঢাকা এবং ৪৮ ঘণ্টায় সারা বাংলাদেশ’—এই লক্ষ্য সামনে রেখে সেবাটি পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্তমানে স্পিড পোস্টে প্রথম ১ কেজি পার্সেলের মাশুল ১০ টাকা এবং অতিরিক্ত প্রতি কেজির জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ৩০ কেজি পর্যন্ত পার্সেল পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

শুধু কম মাশুল নয়, পার্সেল কোথায় রয়েছে তা জানার জন্য যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা। বুকিংয়ের পর পাওয়া ট্র্যাকিং নম্বর ব্যবহার করে গ্রাহক অনলাইনে পার্সেলের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানতে পারছেন। পার্সেলের সম্ভাব্য খরচ হিসাব করার জন্য রয়েছে অনলাইন ডাক মাশুল ক্যালকুলেটরও। ফলে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বেড়েছে।

ডাক বিভাগের বড় শক্তি তার দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। দেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যন্ত ডাকঘরের উপস্থিতি রয়েছে। এই অবকাঠামোকেই কাজে লাগিয়ে পার্সেল পরিবহনের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বর্তমানে জিপিও, প্রধান ডাকঘর, উপজেলা ডাকঘর, টাউন সাব-পোস্ট অফিস, সাব-পোস্ট অফিস, আরএমএস বুকিং কাউন্টার ও ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস থেকে স্পিড পোস্টে পার্সেল বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকায় ঢাকা জিপিওসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট অফিস থেকেও পার্সেল গ্রহণ ও বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ডাক বিভাগের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সময়ের সঙ্গে সেবাকে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে সাধারণ চিঠিপত্রের ব্যবহার কমেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সংগ্রহ, পরিবহন ও বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা চালু করায় ডাক বিভাগকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ অবস্থায় পার্সেল ও লজিস্টিকস সেবাকে গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

ই-কমার্স খাতের জন্যও ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক বিক্রেতাদের জন্য পণ্য দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে পাঠানোর সুযোগ ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারে। ডাক বিভাগ ইতোমধ্যে দেশজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল পোস্ট অফিস ও ই-কমার্সের লজিস্টিকস সহায়তায় ফুলফিলমেন্ট সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

এদিকে ডাক বিভাগকে আরও আধুনিক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং কেন্দ্রীয় লজিস্টিকস ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। ভূমি, পাসপোর্ট, স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ নাগরিক সেবাও ডাকঘরের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে ডাকঘরকে শুধু চিঠি বা পার্সেল পাঠানোর জায়গা না রেখে বহুমুখী জনসেবা কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে আধুনিকায়নের এই উদ্যোগের পাশাপাশি কিছু পুরোনো সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দেশের সব ডাকঘরে একই ধরনের ডিজিটাল ও পার্সেল সেবা এখনো সমানভাবে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার সক্ষমতা বাড়ানো, দ্রুত সংগ্রহ ও ডেলিভারি নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকের দরজায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু কম মাশুল যথেষ্ট নয়; সময়নিষ্ঠ ডেলিভারি, নিরাপদ পরিবহন, অনলাইন ট্র্যাকিং, গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিনের অবকাঠামো ও দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে ডাক বিভাগ আবারও দেশের পার্সেল ও লজিস্টিকস খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে।

ফলে ‘চিঠির ডাকঘর’ হিসেবে পরিচিত পুরোনো ভাবমূর্তি বদলে এখন ‘ডিজিটাল সেবা ও লজিস্টিকস কেন্দ্র’ হিসেবে নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। প্রতিযোগিতার বাজারে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।