স্টেডিয়াম থেকে কারাগার, ফুটবলের সেই কালো ঐতিহাসিক দিবস
- আপডেট সময় : ০৩:২৭:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
- / ৪৮ বার পড়া হয়েছে
আবারো ফিরে এলো সেই ২১ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ ফুটবলের একটি কালো ঐতিহাসিক দিবস। দেশের ফুটবলাঙ্গনে যা কিনা ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর হিসেবে খ্যাত। এ প্রজন্মের ফুটবলারদের কাছে মানতে কষ্ট হবেই এই বলে যে, সবুজ মাঠের চৌহদ্দিতে যারা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটিয়েছেন তাদের আবার জ্বেলেও যেতে হয়েছিল! সবচে বেশি বিষয় বিস্ময়কর, খেলার জগতের মানুষ এরা নাকি মাঠের বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সামরিক শাসন উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিল।
৪৪ বছর আগের কথা। কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রাব্বানী হেলাল আর কাজী আনোয়ার আশির দশকের চার সেরা ফুটবলারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়েছিল। সামরিক শাসক এরশাদের সময় সামরিক আইনে বিচার করা হলো তাদের। মাঠের তারকাদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি পরে যেতে হয়েছিল জেল খানায়। তাও ঢাকার জেল খানায় নয়, তাদের নিয়ে যাওয়া হলো উত্তরবঙ্গের হাজতে। বিশ্ব মিডিয়ায় পর্যন্ত এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। বিশ্বনন্দিত এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইশ্বর খ্যাত ম্যারাডোনাও বাংলাদেশেদের ফুটবলারদের এভাবে কোমরে দড়ি বেধে নিয়ে যাওয়াকে পাগল বলে সম্মোধন করেছিলেন।
২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ সালটি বাংলাদেশের ফুটবল তো বটেই, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরিয়ে আটকের সেই ঘটনাটি বিশ্ব ফুটবলেও এক ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে অভিহিত হয়ে আছে। আবাহনীও মোহামেডানের মধ্যকার ম্যাচকে ঘিরে সেদিন এ ঘটনা ঘটেছিলো। মাঠের উত্তেজনা,পুলিশের লাঠি চার্জ,জেল-হাজত অতপর কতো না নাটক। ঠিক যেন কোন এক ছোট গল্পের কাহিনী।
তাই বছরের এই দিনটি এলেই আশির দশকের ফুটবল তারকারা মনে অজান্তে ডুবে যান স্মৃতির পাতায়। দূর অতীত কাছে এসে ভীড়ে। নাড়া দেয় নানা ঘটনা প্রবাহ। তবে খেলার মাঠ থেকে কারাগারে যাওয়া এই চার ফুটবলারের একজন গোলাম রাব্বানী হেলাল ২০২০ সালের ৩০ মে মারা যান। বাকিদের মধ্যে কাজী সালাউদ্দিন আছেন সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদে, তৃনমূলে ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কাজী আনোয়ার আর আশরাফ উদ্দিন আহমদে চুন্নু ঢাকায় বিভিন্ন টিভিতে ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ হিসেবে টক শো করে বেড়াচ্ছেন।
মাঠের সেইদিনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে তখনকার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক (বর্তমান বিএনপি’র নেতা ও স্পিকার ) অব. মেজর মোহাম্মদ হাফিজ পুলিশ সহায়তায় (পুলিশের ভ্যানে) আবাহনীর খেলোয়াড়দের ধানমন্ডির ক্লাব টেন্টে পাঠায়। কিন্তু রাত পোহাতেই পুলিশ ক্লাব রেট দিয়ে বারো ফুটবলারের (দু’জন বিদেশী প্রেমলালও অশোকা) কোমর বেধে নিয়ে যায় রমনা থানায়। আর তখনি দেশ জুড়ে তখনকার সরকারের এমন আচরনের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়।
কিন্তু গোলাম রাব্বিনী হেলাল ওই নিন্দনীয় সময়টাতেও খুজে পেয়েছিলেন ভিন্ন আনন্দ। মৃত্যুর আগে সেপ্টেম্বরের কোন একদিন সোনার গাঁ হোটেলের লবিতে বসে তার সঙ্গে কথোপকথনের কিছু স্মৃতি তুলে ধরা হলো পাঠকদের সামনে। এই লেখকের লেখা তার কিছু অংশ সপ্তাহিক ক্রীড়ালোকেও প্রকাশিত হয়েছিল। আজ সেই ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর নিয়ে প্রয়াত গোলাম রাব্বানি হেলালের কথাগুলো মনে পড়তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার সঙ্গে কথপোকথনের অতীত স্মৃতিগুলো। তাকেই এই লেখাটি উৎস্বর্গ করা হলো।
ঘটনার সূত্রপাত
আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানেই আশির দশকে স্টেডিয়াম থাকতো কানায় কানায় পূর্ণ। চারিদিকে ছিল টান টান উত্তেজনা। এরই মধ্যে মোহামেডান এক গোলে এগিয়ে যায়। আবাহনী খেলোয়াড়রা তখন গোল পরিশোধে মরিয়া। এমনই একটি পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টেডিয়ামে ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা। আবাহনীর অধিনায়ক কাজী আনোয়ারের একটি ক্রস বাঁক খেয়ে গোলে প্রবেশের মুখে তা রুখে দেন মোহামেডানের তরুণ গোলরক্ষক মোহাম্মদ মহসীন। মহসীন ওই ম্যাচে দেশের ফুটবলের মহাতারকা কাজী সালাউদ্দিনের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দারুণ উজ্জীবিত। মহসীন আনোয়ারের ক্রসটি ফিরিয়ে দিলেও তা মুহূর্তের জন্য গোললাইন স্পর্শ করেছিল। আবাহনীর খেলোয়াড়েরা মরিয়া হয়ে দাবি জানাতে থাকেন গোলের। কিন্তু রেফারি মুনীর হোসেন আর লাইন্সম্যান অনড় থাকেন তাঁদের সিদ্ধান্তে। খেলায় সৃষ্টি হয় নিদারুণ অচলাবস্থার। মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। কাঁদানে গ্যাস ছোড়া শুরু করে পুলিশ সংঘর্ষরত সাপে-নেউলে আবাহনী আর মোহামেডান-সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে। উত্তেজিত সমর্থকেরা স্টেডিয়ামের বাইরে পল্টন-জিপিও, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, বিজয়নগর প্রভৃতি এলাকায়ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অগ্নস্ফুিলিঙ্গের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সেই সন্ধ্যার ঢাকা। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধে ঢেকে যায় ঢাকার আকাশ-বাতাস। বলাবাহুল্য, খেলাটি আর সমাপ্তির মুখ দেখেনি। লিগের আইন অনুযায়ী মোহামেডানকে ওই ম্যাচে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় ২-০ গোলে।

পুলিশের মারের ভয়ে মোটা পেন্ট পরেছিলাম
সত্যি আমার কাছে প্রাকটিক্যাল স্মৃতিগুলো বেশ ভালোই লাগছে। অন্য রকম মজা। বলতে পার সব মিলে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা বটেও। আমি সব সময় মাঠে ফুটবল অনুরাগীদের ভালো বাসা দেখেছিলাম। কিন্তু মাঠের বাহিরেও যে তারা আমাদের জন্য এতোটা আন্তরিক সেটাও দেখলাম। সেদিন ফুটবলের ঘটনার পর নিরাপত্তার কারনে পুলিশ ভ্যানে করে ক্লাবে নেয়া হয় আমাদের। কিন্তু অবাক লাগলো যখন ঘুম থেকে উঠে দেখি চারি দিক দিয়ে পুলিশ রাইফেল তাক করে আমাদের ঘিরে রেখেছিলো। এরপর আমাদের ক্লাবের বারো ফুটবলারকে কোমর বেধে নিয়ে যাওয়া হলো জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে, অতপর রমনা থানায়। তাদের (পুলিশের) নিয়ে যাওয়ার স্টাইলটা দেখে মনে হয়েছিলো যেন আমরা মোস্ট ক্রিমিনাল। এখানেই লেগেছিলো যা কিছুটা ভয়, আতঙ্ক। পুলিশের মারের ভয়ে আমি তাড়াহুড়ো করে মোটা কাপড়ের পেন্ট (বেলবোটম) পরে নিলাম। ভেবেছিলাম মার খেলে সব এই মোটা কাপড়ের উপর দিয়েই যাবে।
থানায় পুলিশ অফিসার যাওয়ার আগেই আমাদের হাজির করা হয় ওসির রুমে। মজার ব্যাপার হলো কাজী সালাউদ্দিন ভাই এক লাফে গিয়ে ওসির সিটে বসে পড়েছেন। আর আমরা বাকি চেয়ারগুলো দখল করে বসে পড়লাম। ওসি এসেই তার সিটে সালাউদ্দিনকে দেখে হেসে উঠলেন।
এরপর সেখান থেকে আমাদের শাহবাগস্থ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটা সেলে আমাদের বারোজনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। যেখানে দু’জন থাকতেই কষ্ট হয়। ক্লান্ত হয়ে আসে শরীর। খোরশেদ বাবুল এমন গাদাগাদির মধ্যেও জায়াগা করে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করলো। সত্যি সত্যি বাবুল ভাই শুইয়ে পড়েছে।

জীবনের প্রথম জেল, আসামী নাম্বার ২৬২
বিকালে মিন্টু রোডে নিয়ে যাওয়া হলো, আমাদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো হলো। আমাদের পক্ষে আইনজীবি ছিলেন ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব। সেখানে সালাউদ্দিন ভাই ইংরেজিতে যে বক্তব্য রেখেছিলেন তা শুনে সবাই স্তব্ধ, আমাদের আইন জীবি মুগ্ধ হয়ে বললেন, ওরা তো আমার চেয়েও বড় আইন জীবি।
মিন্টুরোডের আদালতের বিচারে আমাদের বিপক্ষে যে রায় হয়েছে তাতে আটজন বেখসুর খালাস পেয়ে যান। আমাদের চারজনের জেল হয়। আমার (গোলাম রাব্বানি হেলাল) ৬ মাস, কাজী সালাউদ্দিনের ৩ মাস, আশরাফ হোসেন চুন্নুর ১ বছরও মোহাম্মদ আনোয়ারের ৩ মাস জেল হয়।
আমাদের আপাতত সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। প্রত্যেকের আসামী নম্বর হয়ে যায়। আমার নম্বর ছিলো ২৬২। জেলে কয়েদীদের নাম ধরে ডাকা হয় না। জীবনে ওই প্রথম জেলে প্রবেশ করলাম, প্রথম রাতেই ফ্লোরে শুয়ে রাত কাটাতে হলো। সকালে ঘুম ভাঙলো, নাস্তার জন্য আমার নম্বর ধরে ডাক দেয়া হলো। যেই ডাক দেওয়া লোকটি আমাদের দেখতে পেলো নিজ থেকেই লজ্জায় ভেঙ্গে পড়লো। এরপর তো আমাদের জন্য স্পেশাল নাস্তা।
মাঠের বাহিরে দেখলাম ভক্তদের ভালো বাসা
আমাদের যখন হ্যান্ডক্যাপ এবং কোমরে দড়ি বেধে ঢাকার বাহিরের জেল হাজতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, ঠিক তখনি মহা বিপত্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। আমি আর আনোয়ার রাজশাহী জেলে এবং সালাউদ্দিন ভাইও চুন্নুকে রাজশাহীর জেলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো।
কিন্ত পরিস্থিতি এমন যে তারা আমাদের কি করে জেলে নিবে, চারিদিকে ফুটবল ভক্তদের ভিড়ে পুলিশ দিশেহারা। ভক্তদের ভিড়ে কমলাপুর স্টেশানের ট্রেনেই ওঠাতে পারেনি। সেখান থেকে পুনরায় রমনা থানায় ফেরত আনতে বাধ্য হয় পুলিশ। ওখানে দেখেছি ফুটবল ভক্তদের সে কি কান্নার রোল। ওই দৃশ্যটা সত্যি আমার কাছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। বুজতে পারলাম সত্যিকার অর্থে নিজের মূল্যায়ন। এতোদিন ফুটবল মাঠের ভালো বাসা দেখেছিলাম। সেটা খেলেছিলাম বলেই। কিন্তু মাঠের বাহিরে দেখলাম ওই প্রথম। নিজেকে অন্যরকম ভাবে চিনতে পারলাম, বুজতে শিখলাম। আমদের ওই দিনকার ছবিগুলো ধরা পড়ে প্রয়াত ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক আলম ভাইয়ের ক্যামেরায়। তার সুবাদেই পরের দিন পত্রিকাগুলোতে আমাদের হ্যান্ডক্যাপও কোমরবাধা ছবিগুলো ছাপানো হয়। যা কিনা সারা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছিলো। ম্যারাডোনা তো এক ইন্টারভিউতে তখনকার সরকারকে পাগল সরকার বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

রাতের বেলায় ট্রেনে চড়ে হাজতে পথে
পুলিশ দিনের আলোতে ট্রেনে ওঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদের রাতের বেলায় ট্রেনে করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। নিরাপত্তার কারনে আসামী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের জন্য কেবিন বরাদ্দ করা হয়। এরপর তো প্রতিটি স্টেশানে রাখা হয়েছিলো পুলিশ।
পথে পথে নতুন অভিজ্ঞতা। মনের ভিতর নানা আতঙ্ক ঘুরপাক। এরই মধ্যে দুষ্টমিটাও মিস ছিলো না। কখনো পুলিশের সঙ্গে কখনো নিজেদের মধ্যে। বাহাদুরাবাদ ঘাটে কৌশল করে পুলিশের কাছ থেকে হ্যান্ডক্যাপটা খোলার ব্যবস্থা করি। ওখানে সাধারন মানুষ আমাদের কাছে পেয়ে বেশ আনন্দ পেয়েছিলো। ওরা সবাই আমাদের ভক্ত ছিলেন। মজার ব্যাপার আমরা যখন ঘাটে পৌছালাম ওই পাড়ে বিশ থেকে ত্রিশ পুলিশ আমাদের রিসিভ করেছিলো। কিন্তু রিসিভ করতে এসে তারা আসামী খুজে পাচ্ছিলো না। হ্যান্ডক্যাপ পরা না দেখে তারা অবাক। এ জন্য সেখানকার পুলিশ অফিসারের কতোগুলো কড়া কথাও শুনতে হয়েছিলো সঙ্গে থাকা পুলিশদের।
সেখান থেকে আবারো ট্রেনে। কিন্তু এখানের পুলিশ অফিসারটি ছিলো কিছু খিটখিটে। পুলিশদের কড়া চার্জ, আসামীদের আবার কিসের কেবিন। বিরক্ত এবং খারাপ লেগেছিলো ওই পুলিশ অফিসারের আজে-বাজে কথা শুনে। কিন্তু ট্রেনে আমাদের এই খারাপ সময়টা বেশিক্ষন থাকেনি। একটা ছোট মেয়ে আমাদের দেখেই অটোগ্রাফ নিতে হাত বাড়িয়ে দিলো কলম আর প্যাড নিয়ে। তারা পত্রিকা দেখে আমদের চিনতে পেরেছিলো। এছাড়া ওই মেয়েটিও ফুটবল সম্পর্কে ভালো খোঁজখবর রাখতো। পরে ওর সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারলাম ডিআইজি’র মেয়ে। আমি তাৎক্ষনিক সুযোগটা কাজে লাগিয়ে খিটখিটে পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগটা তার কাছে দিলাম। শুনেই সে ক্ষুদ্ধ মেয়েটি তার মায়ের কাছে কি যেন বলতেই পরক্ষনে একটি বারের জন্যও পুলিশ অফিসারটিকে দেখিনি।
সন্ধ্যায় জেলে, অতপর কঠিন সময়ের অপেক্ষা এবং কিছু স্মৃতি
ঈশ্বরদি স্টেশান থেকে আমরা চারজন বিভক্ত হয়ে পড়ি। সেখানে নেমে এসেছিলো কিছুটা বিষাদের ছায়া। একটা জার্নিতে আমরা এক সঙ্গে ছিলাম এখন আলাদা হয়ে গেলাম। সত্যিই খারাপ লেগে উঠেছিলো। ঠিক সন্ধ্যায় জেলে পৌছালাম আমরা। সেখানে যেন আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করেছিলো আমাদের জন্য। প্রথমে আমাদের সেলে রাখা হয় (যেখানে ক্রিমিনাল আসামীদের রাখা হয়)। লোহার দরজা,সব দিক খোলা। এক কোনায় পটের মতো বাথরুম। উল্টো দিক থেকে একজন কয়েদি বলে ওঠলো ভাই বিবিসি থেকে তো আপনাদের কথা বলা হচ্ছে। এভাবে সাতদিন কেটে যায়। এর কিছুদিন পর জেলে আমাদের ডিভিশান দেয়া হয়। যারা ডিভিশানে থাকেন তাদের সেবার জন্য ফালতু (সেবক) নিয়োগ থাকে। আমার আবার দাতের ব্যথা ছিলো। বাহিরে থেকে ডাক্তার আনা হয়। ডাক্তার বললো দাঁত উঠিয়ে ফেলতে হবে। আমি তাতে রাজি হইনি। পরের দিন আবারো ডাক্তার এলো। কিন্তু পরক্ষনে দেখলাম কি সে ডাক্তার না, আবাহনীর পেডী ভাই। কম্পাউন্ডার সেজে সে জেলের ভিতর প্রবেশ করেছিলো।

এরশাদের হস্তক্ষেপে ৭দিন পর মুক্তি ও কারাগারে ঈদ উদযাপন
যাক রাজশাহীর জেলে সেকি জামাই আদর। কখনো ওমুক কখনো তমুক আমাদের খাবার নিয়ে হাজির। প্রয়াত সংগঠকও বিওএ’র মহাসচিব জাফর ইমাম প্রতিদিন আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। এরই মধ্যে এরশাদের হস্তক্ষেপে সতের দিন পর আমাদের জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। একটি ঈদও ইতিমধ্যে জেলে উযদযাপন করেছি আমরা। জেলের ঈদ, কোরবানীর ঈদ। ভিন্ন এক ঈদ।
জেল থেকে মুক্তির পর আমাদের ফুলদিয়ে বরণ করা হলো। ঠিক একই সময় সালাউদ্দিনও চুন্নু ভাইকেও ফুলদিয়ে বরন করা হয়েছে। এখানেও পেয়েছিলাম ভিন্ন আমেজ। শেষের দিকের ঘটনাটা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়।
লাল বাতি দেখেছি, গাড়ি থেমে গেছে, আমিও থেমে গেছি
জেলে সাজা প্রাপ্ত আসামীদের অন্য আসামী দিয়ে কাজ করার নিয়ম রয়েছে। এটা হাজত থেকেই দেয়া হয়। যারা সেবা দেন তাদের জেলের ভাষায় ‘ফালতু’ বলা হয়। একদিন ফালতুর সঙ্গে বেশ ভাব হলো। কিছুটা দূর্বলও হয়ে পড়েছিলাম তাদের গল্প শুনে। তার কি ভাবে জেলে আসা হলো। শুনে অবাক লাগলো, যে দোষ করেছে সে জেল খাটছে না, উল্টো যার দোষ করা হয়েছে সেই কিনা জেলে। শুনে খুব খারাপ লেগেছিলো। সে আরেক কাহিনী। তবে তার অসহায়ত্বের কথা শুনে তাকে কিছু আর্থিক ভাবে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিই। তাকে বলেছি তুমি জেল থেকে মুক্তি পেলে ঢাকায় আবাহনী ক্লাবে গিয়ে দেখা করবা।
যে ফালতুকে সাহায্য করবো বলে কথা দিয়ে ছিলাম। সে একদিন সন্ধ্যায় ক্লাবে এসে হাজির। তাকে জিজ্ঞেস করলাম কখন ঢাকায় এসেছিলে। সে উত্তরে বললো সকালে। আমি তো অবাক! তাহলে এতো দেরি কেন? উত্তরে সে বললো কমলাপুর থেকে জিজ্ঞেস করতে করতেই হেটে এসে পড়লাম। পরের কথা শুনেই তো সে কি হাসি- রাজাশাহীর ভাষায় ‘ লাল বাতি দেখেছি, গাড়ি থেমে গেছে, আমিও থেমে গেছি।’























