ঢাকা ০৫:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাত ও কর্মসংস্থানই অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ: অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৯:২০:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৮ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
 দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, জিডিপির অনুপাতে কম কর আদায়, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোকে তিনি বর্তমান অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শনিবার (৩ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) আয়োজিত জাতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিযোগিতা ‘ইকোনথন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নিচে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বিষয় ও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তথ্যের আলোকে তুলে ধরা হলো:
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ
অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের ভেতরের ৪টি বড় সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “সমস্যা লুকিয়ে লাভ নেই; স্বীকার করলেই সমাধান শুরু হয়।”
ক্রয়ক্ষমতার সংকট: ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও পণ্য কেনার ক্ষমতা কমে গেছে।
রাজস্ব ঘাটতি: দেশের জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে কর আদায়ের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
ব্যাংক খাতের অস্থিতিশীলতা: ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটানো এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা
এই সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকার বেশ কিছু খাতে জোর দিচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এক দিনে সব ঠিক হবে না, কিন্তু সরকার লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকবে।
সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো:
© সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্থিতি ফিরিয়ে আনা।
© কর ব্যবস্থাকে ন্যায্য, সহজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা।
© ব্যাংক খাতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
© বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা।
© শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় জনগণের করের অর্থের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

বৈশ্বিক ধাক্কা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, বর্তমানে “অনিশ্চয়তাই এখন স্বাভাবিক অবস্থা।” বৈশ্বিক যে বিষয়গুলো দেশের বাজারে পণ্যের দাম, টাকার বিনিময় হার এবং কারখানার রপ্তানি আদেশকে প্রভাবিত করছে:
১. মন্থর প্রবৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে এবং গত দশকের তুলনায় অর্থায়নের (ঋণ বা বিনিয়োগের) খরচ বেড়েছে।
২. বাণিজ্যিক বাধা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ ও শুল্ক-বাধা দিন দিন বাড়ছে।
৩. ভূরাজনৈতিক সংঘাত: চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় চরম অস্থির অবস্থায় রয়েছে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন: প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অর্থনীতিতে ক্ষতির নতুন নতুন হিসাব যোগ হচ্ছে।
এলডিসি উত্তরণ ও নীতিনির্ধারণী বাস্তবতা
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সময়সূচি যা-ই হোক না কেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের অর্থনীতিকে প্রস্তুত করতে হবে। এই উত্তরণ দেশের রপ্তানি খাতকে শুধু বিশেষ ‘বাণিজ্য-সুবিধা’র ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার শক্তিতে টিকে থাকতে শেখাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিটি দিনই সারপ্রাইজ এলিমেন্টের দিন। বাজেট তৈরি হয় এক অনুমানের ওপর—তারপর আসে জ্বালানির দামের ধাক্কা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বন্যা, কিংবা বিশ্ববাজারের uncertainty।” তিনি আরও যোগ করেন, অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য ও সীমিত সময়ের মধ্যেই জনগণের কাছে জবাবদিহি বজায় রেখে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
অনুষ্ঠানে ইকোনথনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, চাপের মধ্যে ভাবা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান রক্ষা করার সক্ষমতাই নীতিনির্ধারণের মূল দক্ষতা। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে তরুণদের এই দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাত ও কর্মসংস্থানই অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ: অর্থমন্ত্রী

আপডেট সময় : ০৯:২০:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
 দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, জিডিপির অনুপাতে কম কর আদায়, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোকে তিনি বর্তমান অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শনিবার (৩ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) আয়োজিত জাতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিযোগিতা ‘ইকোনথন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নিচে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বিষয় ও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তথ্যের আলোকে তুলে ধরা হলো:
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ
অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের ভেতরের ৪টি বড় সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “সমস্যা লুকিয়ে লাভ নেই; স্বীকার করলেই সমাধান শুরু হয়।”
ক্রয়ক্ষমতার সংকট: ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও পণ্য কেনার ক্ষমতা কমে গেছে।
রাজস্ব ঘাটতি: দেশের জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে কর আদায়ের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
ব্যাংক খাতের অস্থিতিশীলতা: ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটানো এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা
এই সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকার বেশ কিছু খাতে জোর দিচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এক দিনে সব ঠিক হবে না, কিন্তু সরকার লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকবে।
সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো:
© সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্থিতি ফিরিয়ে আনা।
© কর ব্যবস্থাকে ন্যায্য, সহজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা।
© ব্যাংক খাতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
© বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা।
© শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় জনগণের করের অর্থের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

বৈশ্বিক ধাক্কা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, বর্তমানে “অনিশ্চয়তাই এখন স্বাভাবিক অবস্থা।” বৈশ্বিক যে বিষয়গুলো দেশের বাজারে পণ্যের দাম, টাকার বিনিময় হার এবং কারখানার রপ্তানি আদেশকে প্রভাবিত করছে:
১. মন্থর প্রবৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে এবং গত দশকের তুলনায় অর্থায়নের (ঋণ বা বিনিয়োগের) খরচ বেড়েছে।
২. বাণিজ্যিক বাধা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ ও শুল্ক-বাধা দিন দিন বাড়ছে।
৩. ভূরাজনৈতিক সংঘাত: চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় চরম অস্থির অবস্থায় রয়েছে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন: প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অর্থনীতিতে ক্ষতির নতুন নতুন হিসাব যোগ হচ্ছে।
এলডিসি উত্তরণ ও নীতিনির্ধারণী বাস্তবতা
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সময়সূচি যা-ই হোক না কেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের অর্থনীতিকে প্রস্তুত করতে হবে। এই উত্তরণ দেশের রপ্তানি খাতকে শুধু বিশেষ ‘বাণিজ্য-সুবিধা’র ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার শক্তিতে টিকে থাকতে শেখাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিটি দিনই সারপ্রাইজ এলিমেন্টের দিন। বাজেট তৈরি হয় এক অনুমানের ওপর—তারপর আসে জ্বালানির দামের ধাক্কা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বন্যা, কিংবা বিশ্ববাজারের uncertainty।” তিনি আরও যোগ করেন, অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য ও সীমিত সময়ের মধ্যেই জনগণের কাছে জবাবদিহি বজায় রেখে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
অনুষ্ঠানে ইকোনথনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, চাপের মধ্যে ভাবা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান রক্ষা করার সক্ষমতাই নীতিনির্ধারণের মূল দক্ষতা। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে তরুণদের এই দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।