ঢাকা ০৫:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিদ্যুৎগতি: কালো ধোঁয়া পেরিয়ে ইলেকট্রিক ট্রেনের যুগে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১২:৫০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৮ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
কালো ধোঁয়ার যুগ পেরিয়ে অবশেষে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক রেলের (ইলেকট্রিক ট্রেন) যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোরে ট্রেনের গতি বাড়াতে এবং যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনতে নেওয়া হয়েছে মেগা পরিকল্পনা। এই মহাপরিকল্পনার প্রথম কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়েছে পৌনে চার হাজার কোটি টাকার৷
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রকল্প। 
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২০২৮ সালের মধ্যে এই রুটে ওভারহেড ক্যাটেনারি তার ঝুলবে এবং প্রয়োজনীয় পাওয়ার সাব-স্টেশন গড়ে তোলা হবে। এই বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্কটি ক্রমান্বয়ে পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর হয়ে পর্যটন শহর কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। 
আসছে ১৬ সেট রোলিং স্টক, বাড়বে রাজস্ব
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফকির মো. মহিউদ্দীন এই প্রকল্পের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা এই রুটের জন্য ১৬ সেট রোলিং স্টক (ইলেকট্রিক ট্রেন) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রতিটি সেটের সঙ্গে ন্যূনতম ৬টি করে কোচ সংযুক্ত থাকবে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হলে রেলের পরিচালন ব্যয় কমবে এবং প্রচুর রেভিনিউ বা রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার পর্যন্ত ছড়াবে নেটওয়ার্ক, বিনিয়োগ ৩২ হাজার কোটি
রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর অংশটি চালুর পর পর্যায়ক্রমে এই নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়বে গোটা দেশে। এই লক্ষ্যে টঙ্গী-আখাউড়ার ৯৭ কিলোমিটার লাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার জন্য একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রস্তুত করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা এবং লক্ষ্যমাত্রা ২০৩২ সাল পর্যন্ত। [
অন্যদিকে, লাকসাম-চট্টগ্রামের ১৩১ কিলোমিটার পথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের জন্য আরও প্রায় ১৬ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার একটি ডিপিপি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন এই লাইনটি নির্মাণের সময়ই সেখানে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং বসানো হবে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা। এই কাজটিরও সম্ভাব্য শেষ সময় ২০৩২ সাল।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আরও জানান, “আমরা আশা করছি ২০৩২-৩৩ সালের মধ্যে এই করিডোরে ব্রডগেজ রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন হবে। ব্রডগেজ প্রকল্পের সমান্তরালেই ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের কাজ শুরু করা হবে, যাতে ২০৩৩-৩৪ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে সরাসরি ইলেকট্রিক ট্রেনে চেপে পর্যটকরা কক্সবাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন।” ইতিমধ্যে আখাউড়া-লাকসাম অংশে নতুন ডাবল লাইন চালু হওয়ায় এবং ঢাকা-টঙ্গী লাইনে অতিরিক্ত ট্র্যাক নির্মাণের ফলে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হয়েছে।
বাস্তবায়নে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে উচ্চগতির এই ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরাপদে সচল রাখা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান এই প্রকল্পের রোলিং স্টক নির্বাচন নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুরের ৫২ কিলোমিটারের যে অংশে আমরা ট্রেনটি প্রাথমিকভাবে রান করার কথা ভাবছি, সেই রোলিং স্টক কিন্তু দূরপাল্লার (লং-রুট) ট্রেনের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই দূরপাল্লা ও স্বল্প দূরত্বের রুটের জন্য রোলিং স্টকের রিকোয়ারমেন্ট বা স্পেসিফিকেশন কী হবে, তা নিয়ে এখনই একটি স্বচ্ছ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকা জরুরি।”
এছাড়াও, দ্রুতগতির ট্রেন নিরাপদ রাখতে ঝুলন্ত ক্যাটেনারি তারের সুরক্ষাসহ প্রতিটি লেভেল ক্রসিংয়ে অটোমেটিক সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করাও রেলওয়ের জন্য একটি অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশের ডুয়েলগেজ রূপান্তরের কাজ শেষ হলে এবং এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে, যা দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিদ্যুৎগতি: কালো ধোঁয়া পেরিয়ে ইলেকট্রিক ট্রেনের যুগে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১২:৫০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
কালো ধোঁয়ার যুগ পেরিয়ে অবশেষে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক রেলের (ইলেকট্রিক ট্রেন) যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোরে ট্রেনের গতি বাড়াতে এবং যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনতে নেওয়া হয়েছে মেগা পরিকল্পনা। এই মহাপরিকল্পনার প্রথম কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়েছে পৌনে চার হাজার কোটি টাকার৷
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রকল্প। 
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২০২৮ সালের মধ্যে এই রুটে ওভারহেড ক্যাটেনারি তার ঝুলবে এবং প্রয়োজনীয় পাওয়ার সাব-স্টেশন গড়ে তোলা হবে। এই বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্কটি ক্রমান্বয়ে পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর হয়ে পর্যটন শহর কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। 
আসছে ১৬ সেট রোলিং স্টক, বাড়বে রাজস্ব
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফকির মো. মহিউদ্দীন এই প্রকল্পের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা এই রুটের জন্য ১৬ সেট রোলিং স্টক (ইলেকট্রিক ট্রেন) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রতিটি সেটের সঙ্গে ন্যূনতম ৬টি করে কোচ সংযুক্ত থাকবে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হলে রেলের পরিচালন ব্যয় কমবে এবং প্রচুর রেভিনিউ বা রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার পর্যন্ত ছড়াবে নেটওয়ার্ক, বিনিয়োগ ৩২ হাজার কোটি
রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর অংশটি চালুর পর পর্যায়ক্রমে এই নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়বে গোটা দেশে। এই লক্ষ্যে টঙ্গী-আখাউড়ার ৯৭ কিলোমিটার লাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার জন্য একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রস্তুত করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা এবং লক্ষ্যমাত্রা ২০৩২ সাল পর্যন্ত। [
অন্যদিকে, লাকসাম-চট্টগ্রামের ১৩১ কিলোমিটার পথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের জন্য আরও প্রায় ১৬ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার একটি ডিপিপি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন এই লাইনটি নির্মাণের সময়ই সেখানে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং বসানো হবে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা। এই কাজটিরও সম্ভাব্য শেষ সময় ২০৩২ সাল।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আরও জানান, “আমরা আশা করছি ২০৩২-৩৩ সালের মধ্যে এই করিডোরে ব্রডগেজ রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন হবে। ব্রডগেজ প্রকল্পের সমান্তরালেই ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের কাজ শুরু করা হবে, যাতে ২০৩৩-৩৪ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে সরাসরি ইলেকট্রিক ট্রেনে চেপে পর্যটকরা কক্সবাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন।” ইতিমধ্যে আখাউড়া-লাকসাম অংশে নতুন ডাবল লাইন চালু হওয়ায় এবং ঢাকা-টঙ্গী লাইনে অতিরিক্ত ট্র্যাক নির্মাণের ফলে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হয়েছে।
বাস্তবায়নে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে উচ্চগতির এই ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরাপদে সচল রাখা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান এই প্রকল্পের রোলিং স্টক নির্বাচন নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুরের ৫২ কিলোমিটারের যে অংশে আমরা ট্রেনটি প্রাথমিকভাবে রান করার কথা ভাবছি, সেই রোলিং স্টক কিন্তু দূরপাল্লার (লং-রুট) ট্রেনের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই দূরপাল্লা ও স্বল্প দূরত্বের রুটের জন্য রোলিং স্টকের রিকোয়ারমেন্ট বা স্পেসিফিকেশন কী হবে, তা নিয়ে এখনই একটি স্বচ্ছ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকা জরুরি।”
এছাড়াও, দ্রুতগতির ট্রেন নিরাপদ রাখতে ঝুলন্ত ক্যাটেনারি তারের সুরক্ষাসহ প্রতিটি লেভেল ক্রসিংয়ে অটোমেটিক সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করাও রেলওয়ের জন্য একটি অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশের ডুয়েলগেজ রূপান্তরের কাজ শেষ হলে এবং এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে, যা দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।