সাত মাসে গ্যাসের দাম বাড়লো চার বার, এবার এক লাফে ২৫২, অস্বস্তিতে নিন্ম আয়ের মানুষ
- আপডেট সময় : ০৯:৪২:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
গ্যাসের দাম আবারো বাড়ালো। রান্নার চুলায় আগুন জ্বালাতে আবারো বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এক মাসের ব্যবধানেই ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ফলে ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডারের নতুন নির্ধারিত দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। নতুন দর রোববার ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রতি কেজি এলপিজির দামও ২১ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা।
একদিকে নিত্যপণ্যের বাড়তি খরচ, অন্যদিকে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ—সব মিলিয়ে সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। বিশেষ করে যেসব পরিবারে রান্নার প্রধান জ্বালানি এলপিজি, তাদের মাসিক বাজেটে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। শুধু বাসাবাড়ি নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ছোট ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ রান্নার জ্বালানির খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে খাবার ও অন্যান্য সেবার দামে।
ষাটোর্ধ সংবাদ কর্মী মোহাম্মদ আরীফ। গত চল্লিশ বছর ধরে রাজধানী ঢাকায় বসবাস করছেন। জীবন সংসারের ঠিক এ সময় এসে নাভিশ্বাস বেরিয়ে যাচ্ছে তার। এই প্রতিবেদককে বলেন, আর যেন চলতে পারছি না। জীবন মনে হয় থেমে যাচ্ছে। যেভাবে প্রতিটি জিনিষের ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে টিকে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জানিনা কখন কোন দূর্ঘনা ঘটে যায়। মাস শেষে বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের বেতন, দৈনন্দিন আহারের চাহিদা মেটানো টা যেন অসম্ভব হয়ে পড়ছি। মানসিক চাপে প্রায়শ প্রেসার ফল্ট করছে। নতুন করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে আবারো বাড়তে থাকবে সব কিছুর দাম। খুব কষ্টে তিনি বলেন, ভালো কিছুর প্রত্যাশা আমরা সরকার বদল করেছি। কিন্তু সাধারণের মানুষের ভা্গ্যের চাকা তো আর বদলায়নি। বরং প্রতিযোগিতা দিয়ে বাড়ছে সব কিছু। তাহলে কি আমরা না খেয়ে মরবো। সরকারী কর্মচারিদের বেতন,বোনাস বাড়িয়েছে সরকার। তাদের ভাগ্যের চাকা বদলাতে পারে,কিন্তু আমরা যারা বেসরকারিতে আছি তাদের খবর কে রাখে? এরপর তো বেতন নিয়ে থাকছে অনিশ্চয়তা।

তিনি আরো বলেন, গ্যাসের জন্য আমাদের দুই ভাবে টাকা খরচ করতে হচ্ছে করছি। বাসায় গ্যাস থাকুক বা না থাকুন দুই চুলা গ্যাসের লাইনের জন্য প্রতিমাসে ১১৫০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এরপর গ্যাস সঙ্কটের কারণে অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস। দেখুন, একজন ভোক্তার পকেট থেকে কতোভাবে টাকা তুলে নেয়া হচ্ছে। এরপর আসুন বিদ্যুতের কথা। আগে যেখানে হাজার বারোশত টাকার বিদ্যুত খরচ হতো এখন সেখানে প্রায় তিনহাজার টাকা মতো বিদ্যুত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। সবই আমাদের কপাল। তা না হয় আমার কেনা মিটারে প্রতিমাসে কেন দিতে হবে সার্ভিস চার্জ। এর কোন উত্তর নেই। ভাববার সময়ও যেন কারো নেই। মনে হচ্ছে, আপনি যেহেতু এ দেশের জনগন হয়েছেন, সেজন্য দিতেই হবে। সবই আমাদের কপাল।’
বিইআরসির তথ্য ও চলতি বছরের মূল্যসমন্বয়ের হিসাব বলছে, গত সাত মাসে এলপিজির দাম চার দফা বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে এপ্রিলে। ওই মাসে মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়।
এপ্রিলের শুরুতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়। এরপর ১৯ এপ্রিল আবার ২১২ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই সিলিন্ডারের দামে প্রায় ৪৫ শতাংশের মতো উল্লম্ফন ঘটে।
এরপর জুন ও জুলাইয়ে অবশ্য দাম কমে। জুনে ৫৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা এবং জুলাইয়ে আরও ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা করা হয়। কিন্তু স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমে তা নেমে আসে ১ হাজার ৫৮৫ টাকায়। আর অক্টোবরেই ফের এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হলো।
অর্থাৎ এপ্রিলের শুরুতে যে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা, অক্টোবরের নতুন দর সেখানে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। সাত মাসের ব্যবধানে বর্তমান নির্ধারিত দাম ৪৯৬ টাকা বেশি। তবে এ সময়ের মধ্যে দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি কয়েক দফায় কমেছেও। ফলে ভোক্তার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজারের অনিশ্চয়তা।
কাগজে-কলমে এক দাম, বাজারে আরেক
তবে প্রশ্ন উঠেছে, দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া নিয়ে। বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে এলপিজির দাম সমন্বয় করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার কোথাও কোথাও ২ হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় ভোক্তাকে সর্বোচ্চ ৫৬৫ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হয়েছে।
অক্টোবরের নতুন দাম ঘোষণার আগেও বাজারে সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ ছিল। ১২ কেজির সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরবরাহ কমে যাওয়া, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম বৃদ্ধির মতো কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এটা ঠিক যে, দেশে বেসরকারি এলপিজির মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এলপিজির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। সৌদি আরামকোর ঘোষিত মাসিক কনট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপিকে ভিত্তি ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। এর সঙ্গে আমদানিকারকের চালানমূল্য, ডলারের বিনিময় হার ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
চলতি বছরের এপ্রিলের বড় মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব ছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারে দাম কমায় জুন ও জুলাইয়ে দেশের বাজারেও দাম কমানো হয়। কিন্তু আগস্ট থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
এক নজরে এলপিজির দামের ওঠানামা
- এপ্রিল: দুই দফায় ৫৯৯ টাকা বৃদ্ধি — ১,৩৪১ → ১,৯৪০ টাকা
- জুন: ৫৫ টাকা কমে — ১,৮৮৫ টাকা
- জুলাই: ৩৫৭ টাকা কমে — ১,৫২৮ টাকা
- আগস্ট: ৭০ টাকা বাড়ে — ১,৫৯৮ টাকা
- সেপ্টেম্বর: ১৩ টাকা কমে — ১,৫৮৫ টাকা
- অক্টোবর: ২৫২ টাকা বাড়ে — ১,৮৩৭ টাকা
- এপ্রিল–অক্টোবর পর্যন্ত মোট চার দফা দাম বৃদ্ধি
- বর্তমান ১২ কেজি সিলিন্ডার : ১,৮৩৭ টাকা
- অক্টোবরে প্রতি কেজি : ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা
- অটোগ্যাস : ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা/লিটার
বাড়ছে অটোগ্যাসের দামও
শুধু রান্নার গ্যাস নয়, নতুন মূল্যসমন্বয়ের প্রভাব পড়েছে গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামেও। অক্টোবর মাসে অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ লিটারপ্রতি বেড়েছে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা।
ফলে পরিবহন খাতেও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। অটোগ্যাসের দাম বাড়লে যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে, যার পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচে।
এলপিজির দাম মাসে মাসে সমন্বয় করার যুক্তি হলো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারকে সামঞ্জস্য রাখা। কিন্তু সাধারণ ভোক্তার কাছে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—নির্ধারিত দাম বাড়ার পর যদি বাজারে তার চেয়েও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয়, তাহলে মাসিক মূল্যসমন্বয়ের সুফল কোথায়?
একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, অন্যদিকে সরবরাহ সংকট ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামের অভিযোগ—দুইয়ের চাপে ভোক্তার দুর্ভোগ বাড়ছে। রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির দাম যখন এক মাসে ২৫২ টাকা বেড়ে যায়, তখন তা আর কেবল একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ব্যয়ের হিসাবেই।
সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজির এলপিজির দাম অবশ্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক পরিবারের জন্য নতুন দাম নিঃসন্দেহে বাড়তি বোঝা।
এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—শুধু নতুন দাম ঘোষণা নয়, নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি পাওয়া নিশ্চিত করা। কারণ কাগজে দাম কমলেও যদি দোকানে বেশি দামে কিনতে হয়, আবার দাম বাড়লে সেই বাড়তি মূল্যও দিতে হয়, তাহলে ভোক্তার স্বস্তির জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। রান্নার জ্বালানির এই অনিশ্চিত বাজারে স্থিতিশীলতা ও কার্যকর নজরদারিই এখন সবচেয়ে জরুরি।


















