তিন মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন দেওয়ার প্রস্তুতি সরকারের, আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন পাবেন অনেকে
- আপডেট সময় : ০৩:৫১:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
- বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বেতন নির্ধারণে অসংগতি
- প্রজ্ঞাপন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ঘাটতির অভিযোগ
- বকেয়া পেলেও আর্থিক সুবিধায় সমন্বয়
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর তিন মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। তবে বেতন নির্ধারণে নানা জটিলতা ও অসংগতি দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন কাঠামোর বেতন পাচ্ছেন না। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আপাতত আগের বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া পরিশোধের কথা থাকলেও সমস্যাগুলোর সমাধান কবে হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের আওতায় থাকা সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সবার বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট হিসাবে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড, বাড়িভাড়া ভাতা এবং পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++-এর কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা।
ফলে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করার প্রস্তুতি থাকলেও সব দপ্তরে একই সময়ে বেতন নির্ধারণ ও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যেসব দপ্তরের হিসাব নির্ধারণের কাজ শেষ হয়নি, সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপাতত পুরোনো কাঠামোতেই বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত এসব আবেদনের সুরাহা হয়নি।
অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমস্যার সমাধান ১ নভেম্বরের আগে করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রেডের ক্রম ও উচ্চতর গ্রেডের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বাড়িভাড়া ভাতা এবং পদোন্নতির পর প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা নির্ধারণেও অসংগতি দেখা দিয়েছে। এসব বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে।
অর্থ বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন তৈরি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও জানাশোনার ঘাটতির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেতন নির্ধারণের অসংগতিগুলো দূর করতে না পারলে সব দপ্তরে একই সময়ে নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে গ্রেড, ভাতা কিংবা পদোন্নতিসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বাড়তি সময় লাগতে পারে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী তিন মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা রয়েছে। তবে বকেয়া পরিশোধের সময় বিশেষ সুবিধার অর্থ সমন্বয় করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, যাঁরা তিন মাসের বকেয়াসহ বাড়তি বেতন পাবেন, তাঁদের বিশেষ সুবিধা বাতিল হবে। ফলে আগে বিশেষ সুবিধা হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, তা হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হবে। এ কারণে বকেয়া বাবদ একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে খুব বেশি অর্থ নাও আসতে পারে।
অর্থাৎ নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বেতন ও বকেয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে যাঁদের বেতন নির্ধারণের কাজ সময়মতো শেষ হবে না, তাঁদের বর্ধিত বেতন ও বকেয়া কবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।
সব মিলিয়ে ১ নভেম্বর থেকে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও বাস্তবায়নের বিভিন্ন জটিলতা সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেতন নির্ধারণের অসংগতি ও আইবাস++-এর সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নতুন কাঠামোর বেতন পেতে আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।
বেতন নির্ধারণে উল্টে যাচ্ছে গ্রেডের ক্রম
জাতীয় বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১২তম গ্রেডের কর্মচারীদের চেয়ে ৭০০ টাকা এগিয়ে। কিন্তু নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের পর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের বেতনকাঠামোয় প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ আগের কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতন ২৫ হাজার টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের বেতনধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। অর্থাৎ আগের কাঠামোয় তার মূল বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতন ২৪ হাজার ৩০০ টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী বেতনধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।
ফলে প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর নতুন মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা। বিপরীতে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী পাচ্ছেন ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ গ্রেডের ক্রম অনুযায়ী এগিয়ে থেকেও ১১তম গ্রেডের কর্মচারী ৭০০ টাকা কম মূল বেতন পাচ্ছেন।
কর্মচারীদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হলেও দুই গ্রেডের এই ব্যবধান থাকছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। তখন ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন।
একইভাবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তখন ব্যবধান দাঁড়াবে ৫৮০ টাকা। আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। তখন ব্যবধান বেড়ে হবে ৮০০ টাকা।
পদোন্নতির পরও কমতে পারে আয়
নতুন বেতনকাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়েও অসংগতি দেখা দিয়েছে। কর্মচারীদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তার মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
কিন্তু গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যাওয়ায় তার মোট আয় কমতে পারে। দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হবে ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। অন্যদিকে নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। ফলে বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা।
এতে মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। সব মিলিয়ে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতার যোগফল মাসে ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে। কর্মচারীদের আশঙ্কা, একই ধরনের সমস্যা অন্য গ্রেডেও দেখা দিতে পারে।
উচ্চতর গ্রেডে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাদের চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।
এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তার বেতন সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তার মূল বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়ের ব্যবধান থেকেও পরবর্তী সময়ে বেতনবৈষম্য তৈরি হতে পারে। দুবার উচ্চতর গ্রেড পেতে জুনিয়র কর্মকর্তার ১৪ বছর লাগলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার লাগতে পারে ১৬ বছর।
তাদের মতে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট না হলে এসব অসংগতি দূর করা কঠিন হবে।
আইবাস++ জটিলতায় শেষ হয়নি বেতন নির্ধারণ
বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতার কথাও জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, এ কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি এবং নতুন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে বেতন নির্ধারণের কাজ জটিল হয়ে পড়েছে।
আইবাস++ সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে এ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়।





















