ঢাকা ১১:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

“বাংলাদেশি পাসপোর্ট বলে ওরা আমাদের হোটলে নেয়নি’

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:২৬:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৪৭ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশী পার্সপোর্ট বলে ওরা আমাদের হোটেলে নেয়নি৷ সারারাত রোম বিমান বন্দরেই কাটিয়ে দিতে হলো ৷ ঢাকা বিমান বন্দরে পৌঁছেই মিডিয়াকর্মীদের সামনে এমন অভিযোগ তোলেন বাংলাদেশ বিমানের এয়ারলাইনসের যাত্রীরা৷ বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় ৪০ ঘন্টা বিমান এবং বিমানবন্দরের লাউঞ্জে কাটাতে হলো ২৫৬ জন বিমান যাত্রীর৷ এর মধ্যে ৮ ঘন্টাই কাটাতে হয়েছে এসি বিহীন বিমানের ভিতরে৷ সীমাহীন সে কষ্টের পর বাকি কষ্টটা কাটতে হয়েছে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে৷

অবশ্য কানাডা আর আমেরিকার পাসপোর্ট হোল্ডারদের বাকি সময়টা কষ্টের যায়নি৷ বিমান কতৃপক্ষ তাদের আয়েসি হোটেলে নিয়ে যায়৷ ইমিগ্রেশন জটিলতায় অবশিষ্ট যাত্রীরা বিমানবন্দর লাউঞ্জে বাকিটা সময় কাটিয়েছে অসহায় জাজাবোরের মতো করে৷ কিন্তু কেউ যেন দেখার নাই৷

রোববার ১২ টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌছে যাত্রীরা সে কষ্টের অভিযোগগুলো মিডিয়ার সামনে তুলে ধরেন৷ অভিযোগকারী যাত্রীদের বহনকারী ফ্লাইটটি হচ্ছে  বিজি৩০৬। শনিবার রাতে ইতালি থেকে রওনা হয়৷ ঢাকায় পৌছে ওই ফ্লাইটের যাত্রীরা তাদের রোম বিমানবন্দরের লাউঞ্জে দুর্বিষহ সময় পার করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বলে অভিযোগ অনেক যাত্রী ও তাদের স্বজনদের।

যাত্রীরা জানান, প্রথম দিন এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বন্ধ থাকা অবস্থায় তাদের প্রায় ৮ ঘণ্টা উড়োজাহাজের ভেতরে বসিয়ে রাখা হয়। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পরে তাদের টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হলেও অন্তত ১৭৪ জন যাত্রী হোটেলে থাকার সুযোগ পাননি। বাকিরা বাধ্য হয়ে  বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে রাত কাটাতে হয়।

যাত্রীদের একজন জানান, তারা প্রায় ৪০ ঘণ্টা ‘যাযাবরের মতো’ কাটিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘উড়োজাহাজের ভেতরেই আট ঘণ্টা বসেছিলাম। পরে আমাদের লাউঞ্জে নেওয়া হয় এবং বলা হয় যে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু যেসব যাত্রীর কাছে মার্কিন ও কানাডিয়ান পাসপোর্ট ছিল, শুধু তাদেরই হোটেলে নেওয়া হয়। আর আমাদের যাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট তাদের লাউঞ্জেই রাখা হয় আমাদের প্রায় ৪০ ঘণ্টা চেয়ারে বসেই কাটাতে হয়েছে।

তার মতে, ইতালিতে তাদের সাময়িকভাবে বের হওয়ার ব্যবস্থা করতে বিমান ও বাংলাদেশ দূতাবাস আরও চেষ্টা করতে পারত।

এই দীর্ঘ ভোগান্তির জন্য তিনি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলাকে দায়ী করেন।

আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা। তিনি বিমানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে বলেন, ‘একজন মানুষ কত ঘণ্টা এভাবে চেয়ারে বসে থাকতে পারে? আমরা যে এতটা কষ্ট পেলাম, অথচ কারও কোনো জবাবদিহি নেই।

ওই ফ্লাইটে থাকা এক যাত্রীর ছেলে মো. ওহিদুল হক শনিবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে লেখেন, দীর্ঘ সময় ধরে অপক্ষো করার কারণে বয়স্ক যাত্রী, নারী ও শিশুরা তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন।

ওই ফ্লাইটের যাত্রী সৈয়দ মাহমুদ হাসান ফেসবুকে লেখেন, শিশু, প্রবীণ ও পরিবারসহ প্রায় ১৭০ বাংলাদেশি নাগরিককে থাকতে হয়েছিল বিমানবন্দরের ভেতরেই। আর বিদেশি পাসপোর্টধারীদের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

টরন্টো থেকে স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি ২৫৯ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।

প্রায় ৮ ঘণ্টা ওড়ার পর কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে উড়োজাহাজটি রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।

বিমান বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই উড়োজাহাজে থাকা প্রকৌশলী ও রোমে বিমানের চুক্তিভিত্তিক প্রকৌশলী দল প্রথমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন।

কয়েক দফা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গতকাল শনিবার ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও দুই সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠায় বিমান।

প্রকৌশলীরা মেরামত কাজ শেষ করার পর রাতেই উড়োজাহাজটিকে ওড়ার উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। শনিবার ইতালির সময় রাত ১১টার দিকে ফ্লাইটটি রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।

রোমে নিয়োজিত বিমানের এক কর্মকর্তা জানান, বিমান কর্তৃপক্ষ সব যাত্রীর জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় ভিসা না থাকায় ইতালির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ অন্তত ১৭০ যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, শুধু কানাডিয়ান বা মার্কিন পাসপোর্টের অধিকারী যাত্রীরাই ইমিগ্রেশন পার হয়ে হোটেলে যেতে পেরেছিলেন।

এদিকে বিমানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা যাত্রীদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার করেনি বিমান বাংলাদেশ। সংস্থাটি শুধু জানিয়েছে, ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশসহ প্রকৌশলীরা গিয়ে উড়োজাহাজটি মেরামত করেন এবং সেটি চলাচলের উপযোগী করে তোলেন।

বিমান বলছে, জ্বালানি নেওয়ার জন্য নির্ধারিত যাত্রাবিরতির সময় সমস্যার সূত্রপাত।

এদিকে একই ধরনের অসুবিধায় পড়লে এয়ারলাইনস গুলো তাদের যাত্রীদের ব্যাপক সেবা এবং জরিমানা দিয়ে থাকে৷ কিন্তু বাংলাদেশ বিমানে ঘটে তার ব্যতিক্রম৷

নিচে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের সুযোগ সুবিধা প্রদান করার তালিকা তুলে ধরা হলো…

 অন্যান্য এয়ারলাইনসে সুযোগ

সুবিধা সমূহ 

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ফ্লাইট দুই ঘণ্টার বেশি দেরি হলে তারা যাত্রীদের রিফ্রেশমেন্ট ভাউচার দিবে। সেটি দিতে না পারলে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয়ের খরচ ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ফ্লাইট ৩ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে বিলম্বের কারণের ওপর নির্ভর করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন যাত্রী।

ফ্লাইট বিলম্বের কারণে রাত কাটানোর প্রয়োজন হলে হোটেলে থাকার খরচ এবং বিমানবন্দর থেকে হোটেল বা বাড়ি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিবহন খরচ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

যাত্রীদের বাইরে যোগাযোগের জন্য দুটি ফোন কল বা ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ বিলম্বে উপযুক্ত বিকল্প ফ্লাইট দিতে না পারলে বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা বা যুক্তিসঙ্গত খরচ ফেরত দেওয়ার কথাও রয়েছে।

ফ্লাইট পাঁচ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে এবং যাত্রী আর ভ্রমণ করতে না চাইলে টিকিটের অর্থ ফেরত চাইতে পারবেন।

এছাড়া কোনো ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগের নিয়ম প্রযোজ্য হলে নগদ অর্থে রিফান্ড পাবেন।

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের নীতিমালায় অন্য এয়ারলাইনসের মতো দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা বা চার ঘণ্টা—এভাবে নির্দিষ্ট ঘণ্টাভিত্তিক সময় উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিলম্ব অনুযায়ী, যাত্রীদের বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

যেমন—দুপুরে খাবারের সময়ে বিলম্ব হলে যাত্রীদের খাবার দেওয়ার কথাও রয়েছে।
যাত্রীরা চাইলে টেলিফোন সেবা নিতে পারবেন।

দীর্ঘ বিলম্বে রাত কাটানোর প্রয়োজন হলে হোটেলের ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে, স্থানীয় যাত্রীদের ক্ষেত্রে হোটেল সুবিধা দেওয়া নাও দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে তাদের পরিবহন সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস (কেএলএম)

কেএলএমের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ফ্লাইট দেরি হলে যাত্রীকে বিনামূল্যে বেশ কিছু সেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

  • অপেক্ষার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবার বা পানীয়
    •রাত কাটতে হলে বা নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় অবস্থান করতে হলে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ও যাতায়াতের খরচ
    • ১টি প্রিপেইড ফোন কার্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫ মিনিটের ২টি ফোন কলের খরচ। বিকল্প হিসেবে ২টি ফ্যাক্স বা ২টি ই-মেইল পাঠানোর সুযোগ

ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৪০ ঘণ্টা রোম বিমানবন্দরে আটকে থাকতে হয়েছিল বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী প্রায় ১৭০ যাত্রীকে।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম, ওষুধ ও শিশুখাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। হোটেলে যেতে না পেরে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে রাত কাটাতে হয়েছে তাদের।

যদিও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দাবি, বিমানবন্দরে থাকা যাত্রীদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে—দীর্ঘ বিলম্বের কারণে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হলে এয়ারলাইনসের দায়িত্ব কতটুকু ও আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনসগুলো কী ধরনের সেবা দিয়ে থাকে?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারওয়েজের প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে যাত্রীকে শুধু বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বা টার্মিনালে বসিয়ে রাখা এয়ারলাইনসের একমাত্র দায়িত্ব নয়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ‘যাত্রী অধিকার’ কাঠামোতে নির্দিষ্ট সময় পর যাত্রীদের খাবার, পানীয়, যোগাযোগের সুযোগ, প্রয়োজন হলে হোটেল ও বিমানবন্দর-হোটেল যাতায়াত এবং দীর্ঘ বিলম্ব হলে রিফান্ড বা বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করার নীতি রয়েছে।

তবে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে নীতিমালায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোথাও দুই ঘণ্টা পর থেকেই সেবা দেওয়ার বিধান রয়েছে, কোথাও আবার বিলম্বের সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

যাদও কোনো এয়ারলাইনের ‘যাত্রী সেবা’ নীতিমালায় একজন যাত্রীকে বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা বসিয়ে রাখা যাবে—এমন কোনো সময় সীমা পাওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস, রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস (কেএলএম), স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস (এসএএস) ও থাই এয়ারওয়েজের ‘যাত্রী সেবা’ নীতিমালায় কী রয়েছে, তা তুলে ধরা হলো এখানে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

“বাংলাদেশি পাসপোর্ট বলে ওরা আমাদের হোটলে নেয়নি’

আপডেট সময় : ১১:২৬:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশী পার্সপোর্ট বলে ওরা আমাদের হোটেলে নেয়নি৷ সারারাত রোম বিমান বন্দরেই কাটিয়ে দিতে হলো ৷ ঢাকা বিমান বন্দরে পৌঁছেই মিডিয়াকর্মীদের সামনে এমন অভিযোগ তোলেন বাংলাদেশ বিমানের এয়ারলাইনসের যাত্রীরা৷ বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় ৪০ ঘন্টা বিমান এবং বিমানবন্দরের লাউঞ্জে কাটাতে হলো ২৫৬ জন বিমান যাত্রীর৷ এর মধ্যে ৮ ঘন্টাই কাটাতে হয়েছে এসি বিহীন বিমানের ভিতরে৷ সীমাহীন সে কষ্টের পর বাকি কষ্টটা কাটতে হয়েছে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে৷

অবশ্য কানাডা আর আমেরিকার পাসপোর্ট হোল্ডারদের বাকি সময়টা কষ্টের যায়নি৷ বিমান কতৃপক্ষ তাদের আয়েসি হোটেলে নিয়ে যায়৷ ইমিগ্রেশন জটিলতায় অবশিষ্ট যাত্রীরা বিমানবন্দর লাউঞ্জে বাকিটা সময় কাটিয়েছে অসহায় জাজাবোরের মতো করে৷ কিন্তু কেউ যেন দেখার নাই৷

রোববার ১২ টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌছে যাত্রীরা সে কষ্টের অভিযোগগুলো মিডিয়ার সামনে তুলে ধরেন৷ অভিযোগকারী যাত্রীদের বহনকারী ফ্লাইটটি হচ্ছে  বিজি৩০৬। শনিবার রাতে ইতালি থেকে রওনা হয়৷ ঢাকায় পৌছে ওই ফ্লাইটের যাত্রীরা তাদের রোম বিমানবন্দরের লাউঞ্জে দুর্বিষহ সময় পার করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বলে অভিযোগ অনেক যাত্রী ও তাদের স্বজনদের।

যাত্রীরা জানান, প্রথম দিন এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বন্ধ থাকা অবস্থায় তাদের প্রায় ৮ ঘণ্টা উড়োজাহাজের ভেতরে বসিয়ে রাখা হয়। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পরে তাদের টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হলেও অন্তত ১৭৪ জন যাত্রী হোটেলে থাকার সুযোগ পাননি। বাকিরা বাধ্য হয়ে  বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে রাত কাটাতে হয়।

যাত্রীদের একজন জানান, তারা প্রায় ৪০ ঘণ্টা ‘যাযাবরের মতো’ কাটিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘উড়োজাহাজের ভেতরেই আট ঘণ্টা বসেছিলাম। পরে আমাদের লাউঞ্জে নেওয়া হয় এবং বলা হয় যে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু যেসব যাত্রীর কাছে মার্কিন ও কানাডিয়ান পাসপোর্ট ছিল, শুধু তাদেরই হোটেলে নেওয়া হয়। আর আমাদের যাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট তাদের লাউঞ্জেই রাখা হয় আমাদের প্রায় ৪০ ঘণ্টা চেয়ারে বসেই কাটাতে হয়েছে।

তার মতে, ইতালিতে তাদের সাময়িকভাবে বের হওয়ার ব্যবস্থা করতে বিমান ও বাংলাদেশ দূতাবাস আরও চেষ্টা করতে পারত।

এই দীর্ঘ ভোগান্তির জন্য তিনি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলাকে দায়ী করেন।

আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা। তিনি বিমানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে বলেন, ‘একজন মানুষ কত ঘণ্টা এভাবে চেয়ারে বসে থাকতে পারে? আমরা যে এতটা কষ্ট পেলাম, অথচ কারও কোনো জবাবদিহি নেই।

ওই ফ্লাইটে থাকা এক যাত্রীর ছেলে মো. ওহিদুল হক শনিবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে লেখেন, দীর্ঘ সময় ধরে অপক্ষো করার কারণে বয়স্ক যাত্রী, নারী ও শিশুরা তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন।

ওই ফ্লাইটের যাত্রী সৈয়দ মাহমুদ হাসান ফেসবুকে লেখেন, শিশু, প্রবীণ ও পরিবারসহ প্রায় ১৭০ বাংলাদেশি নাগরিককে থাকতে হয়েছিল বিমানবন্দরের ভেতরেই। আর বিদেশি পাসপোর্টধারীদের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

টরন্টো থেকে স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি ২৫৯ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।

প্রায় ৮ ঘণ্টা ওড়ার পর কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে উড়োজাহাজটি রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।

বিমান বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই উড়োজাহাজে থাকা প্রকৌশলী ও রোমে বিমানের চুক্তিভিত্তিক প্রকৌশলী দল প্রথমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন।

কয়েক দফা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গতকাল শনিবার ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও দুই সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠায় বিমান।

প্রকৌশলীরা মেরামত কাজ শেষ করার পর রাতেই উড়োজাহাজটিকে ওড়ার উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। শনিবার ইতালির সময় রাত ১১টার দিকে ফ্লাইটটি রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।

রোমে নিয়োজিত বিমানের এক কর্মকর্তা জানান, বিমান কর্তৃপক্ষ সব যাত্রীর জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় ভিসা না থাকায় ইতালির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ অন্তত ১৭০ যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, শুধু কানাডিয়ান বা মার্কিন পাসপোর্টের অধিকারী যাত্রীরাই ইমিগ্রেশন পার হয়ে হোটেলে যেতে পেরেছিলেন।

এদিকে বিমানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা যাত্রীদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার করেনি বিমান বাংলাদেশ। সংস্থাটি শুধু জানিয়েছে, ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশসহ প্রকৌশলীরা গিয়ে উড়োজাহাজটি মেরামত করেন এবং সেটি চলাচলের উপযোগী করে তোলেন।

বিমান বলছে, জ্বালানি নেওয়ার জন্য নির্ধারিত যাত্রাবিরতির সময় সমস্যার সূত্রপাত।

এদিকে একই ধরনের অসুবিধায় পড়লে এয়ারলাইনস গুলো তাদের যাত্রীদের ব্যাপক সেবা এবং জরিমানা দিয়ে থাকে৷ কিন্তু বাংলাদেশ বিমানে ঘটে তার ব্যতিক্রম৷

নিচে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের সুযোগ সুবিধা প্রদান করার তালিকা তুলে ধরা হলো…

 অন্যান্য এয়ারলাইনসে সুযোগ

সুবিধা সমূহ 

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ফ্লাইট দুই ঘণ্টার বেশি দেরি হলে তারা যাত্রীদের রিফ্রেশমেন্ট ভাউচার দিবে। সেটি দিতে না পারলে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয়ের খরচ ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ফ্লাইট ৩ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে বিলম্বের কারণের ওপর নির্ভর করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন যাত্রী।

ফ্লাইট বিলম্বের কারণে রাত কাটানোর প্রয়োজন হলে হোটেলে থাকার খরচ এবং বিমানবন্দর থেকে হোটেল বা বাড়ি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিবহন খরচ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

যাত্রীদের বাইরে যোগাযোগের জন্য দুটি ফোন কল বা ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ বিলম্বে উপযুক্ত বিকল্প ফ্লাইট দিতে না পারলে বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা বা যুক্তিসঙ্গত খরচ ফেরত দেওয়ার কথাও রয়েছে।

ফ্লাইট পাঁচ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে এবং যাত্রী আর ভ্রমণ করতে না চাইলে টিকিটের অর্থ ফেরত চাইতে পারবেন।

এছাড়া কোনো ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগের নিয়ম প্রযোজ্য হলে নগদ অর্থে রিফান্ড পাবেন।

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের নীতিমালায় অন্য এয়ারলাইনসের মতো দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা বা চার ঘণ্টা—এভাবে নির্দিষ্ট ঘণ্টাভিত্তিক সময় উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিলম্ব অনুযায়ী, যাত্রীদের বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

যেমন—দুপুরে খাবারের সময়ে বিলম্ব হলে যাত্রীদের খাবার দেওয়ার কথাও রয়েছে।
যাত্রীরা চাইলে টেলিফোন সেবা নিতে পারবেন।

দীর্ঘ বিলম্বে রাত কাটানোর প্রয়োজন হলে হোটেলের ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে, স্থানীয় যাত্রীদের ক্ষেত্রে হোটেল সুবিধা দেওয়া নাও দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে তাদের পরিবহন সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস (কেএলএম)

কেএলএমের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ফ্লাইট দেরি হলে যাত্রীকে বিনামূল্যে বেশ কিছু সেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

  • অপেক্ষার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবার বা পানীয়
    •রাত কাটতে হলে বা নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় অবস্থান করতে হলে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ও যাতায়াতের খরচ
    • ১টি প্রিপেইড ফোন কার্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫ মিনিটের ২টি ফোন কলের খরচ। বিকল্প হিসেবে ২টি ফ্যাক্স বা ২টি ই-মেইল পাঠানোর সুযোগ

ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৪০ ঘণ্টা রোম বিমানবন্দরে আটকে থাকতে হয়েছিল বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী প্রায় ১৭০ যাত্রীকে।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম, ওষুধ ও শিশুখাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। হোটেলে যেতে না পেরে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে রাত কাটাতে হয়েছে তাদের।

যদিও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দাবি, বিমানবন্দরে থাকা যাত্রীদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে—দীর্ঘ বিলম্বের কারণে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হলে এয়ারলাইনসের দায়িত্ব কতটুকু ও আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনসগুলো কী ধরনের সেবা দিয়ে থাকে?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারওয়েজের প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে যাত্রীকে শুধু বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বা টার্মিনালে বসিয়ে রাখা এয়ারলাইনসের একমাত্র দায়িত্ব নয়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ‘যাত্রী অধিকার’ কাঠামোতে নির্দিষ্ট সময় পর যাত্রীদের খাবার, পানীয়, যোগাযোগের সুযোগ, প্রয়োজন হলে হোটেল ও বিমানবন্দর-হোটেল যাতায়াত এবং দীর্ঘ বিলম্ব হলে রিফান্ড বা বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করার নীতি রয়েছে।

তবে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে নীতিমালায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোথাও দুই ঘণ্টা পর থেকেই সেবা দেওয়ার বিধান রয়েছে, কোথাও আবার বিলম্বের সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

যাদও কোনো এয়ারলাইনের ‘যাত্রী সেবা’ নীতিমালায় একজন যাত্রীকে বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা বসিয়ে রাখা যাবে—এমন কোনো সময় সীমা পাওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস, রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস (কেএলএম), স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস (এসএএস) ও থাই এয়ারওয়েজের ‘যাত্রী সেবা’ নীতিমালায় কী রয়েছে, তা তুলে ধরা হলো এখানে।