ঢাকা ০৪:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

জাপানি নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় ছন্দপতন, নানা চ্যালেঞ্জ-সংকট মাথায় নিয়ে শুরু হচ্ছে এশিয়ান গেমস

মো.বদরুল আলম চৌধুরী
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৯২ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নাগোয়া এমন একটি শহর যার খ্যাতি গড়ে উঠেছে যেকোনো কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে। এটি টয়োটা, ডেনসো এবং মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ও শিল্প-কাঠামোর কেন্দ্রস্থল। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিকস নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে পরিচিত এই শহরটি এখন তার সুনাম রক্ষায় এক কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি। নানামুখী প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক সংকোচন নীতি এবং প্রাকৃতিক শঙ্কা মাথায় রেখে আগামী দিনে নাগোয়া কীভাবে এই বিশ্বমঞ্চ সফলভাবে পার করে , এখন সেটাই দেখার বিষয়। 

দীর্ঘ ৩২ বছর পর জাপানে ফিরেছে এশিয়ান গেমসের আসর। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ‘আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস ২০২৬’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতাটি চলবে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত। ৪৫টি দেশ ও অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা ৪৩টি ক্রীড়া ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন এই আসরে। তবে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি নানা লজিস্টিক জটিলতা, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, আকাশচুম্বী ব্যয় এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার দ্বন্দ্ব পুরো আয়োজনটিকে এক অনিশ্চিত ও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

যদিও শনিবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে আয়োজক শহর নাগোয়ার রাস্তাঘাট এখন পরিষ্কার, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক এবং চারদিকে ঝুলছে বর্ণিল ব্যানার। কিন্তু এই সুশৃঙ্খল রূপের পেছনে রয়েছে এক সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক তাণ্ডবের ক্ষত। মাত্র কিছুদিন আগেই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ফলে শহরটির স্কুল ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছিল, এমনকি বেশ কিছু ভেন্যুতেও পানি ঢুকে পড়েছিল।

এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ঠিক দুদিন পর (সোমবার) একটি টাইফুনের আঘাত হানার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আয়োজকরা জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ভাসমান প্রমোদতরিটিকে উপকূল থেকে দূরে গভীর সমুদ্রে সরিয়ে নেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ।

প্রথাগত ‘অ্যাথলেটস ভিলেজ’হীন আবাসন ও বিশৃঙ্খলা

এবারের এশিয়ান গেমসের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে আবাসন ব্যবস্থায়। খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে এবং গেমস-পরবর্তী সময়ে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা বা ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ হয়ে ওঠার হাত থেকে বাঁচতে এবার কোনো প্রথাগত ‘অ্যাথলেটস ভিলেজ’ বা স্থায়ী ক্রীড়াবিদদের আবাসন গ্রাম নির্মাণ করা হয়নি। এর পরিবর্তে ১৭,০০০ ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিভিন্ন হোটেল, কন্টেইনার-ধাঁচের অস্থায়ী আবাসন এবং নাগোয়া বন্দরে নোঙর করা ‘কোস্টা সেরেনা’ নামক প্রমোদতরীতে।

তবে এই নতুন ধারার ব্যবস্থাপনা শুরুতেই বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে। দলগুলোর জন্য আয়োজিত আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানও এর শিকার হয়। ‘গার্ডেন পিয়ার’ অ্যাথলেটস ভিলেজে ভারতের জন্য নির্ধারিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান প্রথমে বিলম্বিত এবং পরে হঠাৎ করেই থামিয়ে দেওয়া হয়; ফলে ভারতীয় প্রতিনিধিদলসহ ছয়টি দেশের প্রতিনিধিরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য হন। আয়োজকরা কেবল ‘কিছু সমস্যার’ কথা উল্লেখ করে ক্ষমা চান এবং ১৫ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠান শুরুর প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লেগে যায়।

ছোটখাটো এসব সমস্যার দীর্ঘ তালিকার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ভারতীয় শ্যুটারদের ক্ষেত্রে। ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে এসে পৌঁছানোর পর ভারতীয় শ্যুটারদের আবাসনস্থলে পৌঁছাতে ভোর ৫টা বেজে যায়। এছাড়া ৩০-৩৫ জন ভারতীয় ক্রীড়াবিদের জন্য কোনো কক্ষই বরাদ্দ করা হয়নি। ‘শেফ দ্য মিশন’ সহদেব যাদব মিডিয়াকে জানান, আয়োজকরা দাবি করেছিলেন যে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি খেলোয়াড় এসেছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল; কারণ ভারত তাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই সংখ্যা ঠিক রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে নিজ উদ্যোগে হোটেলের অতিরিক্ত কক্ষ বুক করতে হয়।

Honohon i.JPG

এই সংকট মোকাবিলায় নাগোয়াতে বসবাসরত প্রায় ২,০০০ সদস্যের ভারতীয় প্রবাসীদের সহায়তায় তিন স্তরের সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিমানবন্দরে দুজন এবং ক্রীড়াবিদদের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে আরও তিনজন কর্মকর্তাকে মোতায়েন করা হয়েছে; পাশাপাশি আবাসন সমস্যা দেখা দিলে ব্যবহারের জন্য স্থানীয় ভারতীয় প্রবাসীদের বাসভবনগুলোও আগে থেকেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের ৫০১ সদস্যের দলের প্রায় অর্ধেকই তখনও নাগোয়াতে এসে পৌঁছায়নি। তবে শুধু ভারত নয়, লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনার জটিলতা থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, কাতার, থাইল্যান্ড কিংবা আয়োজক দেশ জাপান—কেউই রেহাই পায়নি।

ভাসমান হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত প্রমোদতরি ‘কোস্টা সেরেনা’-র স্বাগত অনুষ্ঠানে জাপানের ইতিহাসের তিন মহান ঐক্যসাধক—ওদা নোবুনাগা, তোয়োতোমি হিদেয়োশি এবং তোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর বেশভূষায় শিল্পীদের উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ১৫৯০-এর দশকে কোরিয়ায় জাপানি আগ্রাসনে তোয়োতোমি হিদেয়োশির বিতর্কিত ভূমিকার কারণে দক্ষিণ কোরিয়া তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক আপত্তি ও অসন্তোষ প্রকাশ করে। ‘ইমাজিন ওয়ান এশিয়া’ (একটি এশিয়ার কল্পনা) স্লোগানের এই আয়োজনে এমন চরিত্র চয়ন বেশ অস্বস্তির সৃষ্টি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিশৃঙ্খলার পেছনে রয়েছে কাঠামোগত পরিবর্তন। জাপানের বিশাল বিজ্ঞাপন ও ক্রীড়া-বিপণন সংস্থা ‘ডেনৎসু’ (Dentsu), যারা অতীতের বড় বড় আয়োজন সফলভাবে পরিচালনা করেছিল, টোকিও অলিম্পিকসের দুর্নীতি ও দরপত্র কারচুপির কেলেঙ্কারির জেরে এবার পরিচালন প্রক্রিয়ায় সেভাবে যুক্ত নেই। আইচি প্রিফেকচার এবং নাগোয়া সিটি কর্তৃপক্ষ মিলে সরাসরি আয়োজক কমিটি গঠন করেছে। জাপান রেসলিং ফেডারেশনের সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইকুকো তানিওকার মতে, প্রথাগত বড় সংস্থার মডেল থেকে সরে আসার এই নতুন কাঠামোই এত বিশাল পরিসরের আয়োজন পরিচালনার জটিলতাগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

আর্থিক চাপ,কাঠামোগত পরিবর্তন ও সাধারনের অনাগ্রতা

এশিয়ান প্যারা গেমসের খরচসহ এই আসরের মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ বিলিয়ন ইয়েনে (প্রায় ২.৩৭ বিলিয়ন ডলার), যা প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। ব্যয় সংকোচনের নীতি হিসেবেই মূলত অ্যাথলেটস ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। তবে আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ও আইচি প্রিফেকচারের গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা জানিয়েছেন, গেমসের খরচ ১০০ বিলিয়ন ইয়েনের বেশি কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে, টোকিও অলিম্পিকসকে কেন্দ্র করে দরপত্র কারচুপির কেলেঙ্কারির জেরে জাপানের অন্যতম বৃহৎ বিজ্ঞাপন ও বিপণন সংস্থা ‘ডেনৎসু’ (Dentsu) এবার পরিচালন প্রক্রিয়ায় যুক্ত নেই। ঐতিহ্যবাহী বড় কোনো সংস্থার সরাসরি অনুপস্থিতিও এই কাঠামোগত জটিলতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সবমিলে ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্যালেন্ডারে বিভিন্ন ব্যক্তিগত ইভেন্টের আধিক্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে গেমসটিকে ঘিরে আগের মতো উদ্দীপনা বা উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। জাপানের অনেক শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়াবিদ (যেমন ভলিবল ও জুডো তারকারা) অলিম্পিক বাছাইপর্ব ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছেন না। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ান গেমসকে যেন কোনোভাবেই অলিম্পিকের ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ বা সহযোগী সংস্থায় পরিণত হতে দেওয়া না হয়; বরং এর নিজস্ব ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখা জরুরি।

১৯৫১ সালে এশিয়ায় ক্রীড়া সংস্কৃতি প্রসার ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে এশিয়ান গেমস শুরু হয়েছিল। এতে কাবাডি বা সেপাক তাকরাওয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে স্থান দেওয়া হয়। ইন্টারন্যাশনাল প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হিডেনোরি তোমোজোয়ে সতর্ক করে বলেছেন, এশিয়ান গেমসকে কোনোভাবেই অলিম্পিকের ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ বা সহযোগী সংস্থায় পরিণত হতে দেওয়া যাবে না; বরং এর নিজস্ব ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হবে।

নানামুখী চ্যালেঞ্জ, আর্থিক সংকোচন এবং প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার হোঁচট পেরিয়ে এশিয়ানে গেমস এর আয়োজক আইচি-নাগোয়া শেষ পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক মহাযজ্ঞ কতটুক সফলভাবে উতরে যেতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো ক্রীড়াবিশ্ব।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

জাপানি নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় ছন্দপতন, নানা চ্যালেঞ্জ-সংকট মাথায় নিয়ে শুরু হচ্ছে এশিয়ান গেমস

আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নাগোয়া এমন একটি শহর যার খ্যাতি গড়ে উঠেছে যেকোনো কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে। এটি টয়োটা, ডেনসো এবং মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ও শিল্প-কাঠামোর কেন্দ্রস্থল। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিকস নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে পরিচিত এই শহরটি এখন তার সুনাম রক্ষায় এক কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি। নানামুখী প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক সংকোচন নীতি এবং প্রাকৃতিক শঙ্কা মাথায় রেখে আগামী দিনে নাগোয়া কীভাবে এই বিশ্বমঞ্চ সফলভাবে পার করে , এখন সেটাই দেখার বিষয়। 

দীর্ঘ ৩২ বছর পর জাপানে ফিরেছে এশিয়ান গেমসের আসর। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ‘আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস ২০২৬’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতাটি চলবে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত। ৪৫টি দেশ ও অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা ৪৩টি ক্রীড়া ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন এই আসরে। তবে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি নানা লজিস্টিক জটিলতা, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, আকাশচুম্বী ব্যয় এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার দ্বন্দ্ব পুরো আয়োজনটিকে এক অনিশ্চিত ও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

যদিও শনিবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে আয়োজক শহর নাগোয়ার রাস্তাঘাট এখন পরিষ্কার, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক এবং চারদিকে ঝুলছে বর্ণিল ব্যানার। কিন্তু এই সুশৃঙ্খল রূপের পেছনে রয়েছে এক সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক তাণ্ডবের ক্ষত। মাত্র কিছুদিন আগেই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ফলে শহরটির স্কুল ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছিল, এমনকি বেশ কিছু ভেন্যুতেও পানি ঢুকে পড়েছিল।

এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ঠিক দুদিন পর (সোমবার) একটি টাইফুনের আঘাত হানার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আয়োজকরা জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ভাসমান প্রমোদতরিটিকে উপকূল থেকে দূরে গভীর সমুদ্রে সরিয়ে নেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ।

প্রথাগত ‘অ্যাথলেটস ভিলেজ’হীন আবাসন ও বিশৃঙ্খলা

এবারের এশিয়ান গেমসের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে আবাসন ব্যবস্থায়। খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে এবং গেমস-পরবর্তী সময়ে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা বা ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ হয়ে ওঠার হাত থেকে বাঁচতে এবার কোনো প্রথাগত ‘অ্যাথলেটস ভিলেজ’ বা স্থায়ী ক্রীড়াবিদদের আবাসন গ্রাম নির্মাণ করা হয়নি। এর পরিবর্তে ১৭,০০০ ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিভিন্ন হোটেল, কন্টেইনার-ধাঁচের অস্থায়ী আবাসন এবং নাগোয়া বন্দরে নোঙর করা ‘কোস্টা সেরেনা’ নামক প্রমোদতরীতে।

তবে এই নতুন ধারার ব্যবস্থাপনা শুরুতেই বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে। দলগুলোর জন্য আয়োজিত আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানও এর শিকার হয়। ‘গার্ডেন পিয়ার’ অ্যাথলেটস ভিলেজে ভারতের জন্য নির্ধারিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান প্রথমে বিলম্বিত এবং পরে হঠাৎ করেই থামিয়ে দেওয়া হয়; ফলে ভারতীয় প্রতিনিধিদলসহ ছয়টি দেশের প্রতিনিধিরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য হন। আয়োজকরা কেবল ‘কিছু সমস্যার’ কথা উল্লেখ করে ক্ষমা চান এবং ১৫ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠান শুরুর প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লেগে যায়।

ছোটখাটো এসব সমস্যার দীর্ঘ তালিকার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ভারতীয় শ্যুটারদের ক্ষেত্রে। ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে এসে পৌঁছানোর পর ভারতীয় শ্যুটারদের আবাসনস্থলে পৌঁছাতে ভোর ৫টা বেজে যায়। এছাড়া ৩০-৩৫ জন ভারতীয় ক্রীড়াবিদের জন্য কোনো কক্ষই বরাদ্দ করা হয়নি। ‘শেফ দ্য মিশন’ সহদেব যাদব মিডিয়াকে জানান, আয়োজকরা দাবি করেছিলেন যে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি খেলোয়াড় এসেছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল; কারণ ভারত তাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই সংখ্যা ঠিক রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে নিজ উদ্যোগে হোটেলের অতিরিক্ত কক্ষ বুক করতে হয়।

Honohon i.JPG

এই সংকট মোকাবিলায় নাগোয়াতে বসবাসরত প্রায় ২,০০০ সদস্যের ভারতীয় প্রবাসীদের সহায়তায় তিন স্তরের সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিমানবন্দরে দুজন এবং ক্রীড়াবিদদের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে আরও তিনজন কর্মকর্তাকে মোতায়েন করা হয়েছে; পাশাপাশি আবাসন সমস্যা দেখা দিলে ব্যবহারের জন্য স্থানীয় ভারতীয় প্রবাসীদের বাসভবনগুলোও আগে থেকেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের ৫০১ সদস্যের দলের প্রায় অর্ধেকই তখনও নাগোয়াতে এসে পৌঁছায়নি। তবে শুধু ভারত নয়, লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনার জটিলতা থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, কাতার, থাইল্যান্ড কিংবা আয়োজক দেশ জাপান—কেউই রেহাই পায়নি।

ভাসমান হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত প্রমোদতরি ‘কোস্টা সেরেনা’-র স্বাগত অনুষ্ঠানে জাপানের ইতিহাসের তিন মহান ঐক্যসাধক—ওদা নোবুনাগা, তোয়োতোমি হিদেয়োশি এবং তোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর বেশভূষায় শিল্পীদের উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ১৫৯০-এর দশকে কোরিয়ায় জাপানি আগ্রাসনে তোয়োতোমি হিদেয়োশির বিতর্কিত ভূমিকার কারণে দক্ষিণ কোরিয়া তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক আপত্তি ও অসন্তোষ প্রকাশ করে। ‘ইমাজিন ওয়ান এশিয়া’ (একটি এশিয়ার কল্পনা) স্লোগানের এই আয়োজনে এমন চরিত্র চয়ন বেশ অস্বস্তির সৃষ্টি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিশৃঙ্খলার পেছনে রয়েছে কাঠামোগত পরিবর্তন। জাপানের বিশাল বিজ্ঞাপন ও ক্রীড়া-বিপণন সংস্থা ‘ডেনৎসু’ (Dentsu), যারা অতীতের বড় বড় আয়োজন সফলভাবে পরিচালনা করেছিল, টোকিও অলিম্পিকসের দুর্নীতি ও দরপত্র কারচুপির কেলেঙ্কারির জেরে এবার পরিচালন প্রক্রিয়ায় সেভাবে যুক্ত নেই। আইচি প্রিফেকচার এবং নাগোয়া সিটি কর্তৃপক্ষ মিলে সরাসরি আয়োজক কমিটি গঠন করেছে। জাপান রেসলিং ফেডারেশনের সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইকুকো তানিওকার মতে, প্রথাগত বড় সংস্থার মডেল থেকে সরে আসার এই নতুন কাঠামোই এত বিশাল পরিসরের আয়োজন পরিচালনার জটিলতাগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

আর্থিক চাপ,কাঠামোগত পরিবর্তন ও সাধারনের অনাগ্রতা

এশিয়ান প্যারা গেমসের খরচসহ এই আসরের মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ বিলিয়ন ইয়েনে (প্রায় ২.৩৭ বিলিয়ন ডলার), যা প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। ব্যয় সংকোচনের নীতি হিসেবেই মূলত অ্যাথলেটস ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। তবে আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ও আইচি প্রিফেকচারের গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা জানিয়েছেন, গেমসের খরচ ১০০ বিলিয়ন ইয়েনের বেশি কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এদিকে, টোকিও অলিম্পিকসকে কেন্দ্র করে দরপত্র কারচুপির কেলেঙ্কারির জেরে জাপানের অন্যতম বৃহৎ বিজ্ঞাপন ও বিপণন সংস্থা ‘ডেনৎসু’ (Dentsu) এবার পরিচালন প্রক্রিয়ায় যুক্ত নেই। ঐতিহ্যবাহী বড় কোনো সংস্থার সরাসরি অনুপস্থিতিও এই কাঠামোগত জটিলতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সবমিলে ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্যালেন্ডারে বিভিন্ন ব্যক্তিগত ইভেন্টের আধিক্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে গেমসটিকে ঘিরে আগের মতো উদ্দীপনা বা উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। জাপানের অনেক শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়াবিদ (যেমন ভলিবল ও জুডো তারকারা) অলিম্পিক বাছাইপর্ব ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছেন না। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ান গেমসকে যেন কোনোভাবেই অলিম্পিকের ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ বা সহযোগী সংস্থায় পরিণত হতে দেওয়া না হয়; বরং এর নিজস্ব ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখা জরুরি।

১৯৫১ সালে এশিয়ায় ক্রীড়া সংস্কৃতি প্রসার ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে এশিয়ান গেমস শুরু হয়েছিল। এতে কাবাডি বা সেপাক তাকরাওয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে স্থান দেওয়া হয়। ইন্টারন্যাশনাল প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হিডেনোরি তোমোজোয়ে সতর্ক করে বলেছেন, এশিয়ান গেমসকে কোনোভাবেই অলিম্পিকের ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ বা সহযোগী সংস্থায় পরিণত হতে দেওয়া যাবে না; বরং এর নিজস্ব ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হবে।

নানামুখী চ্যালেঞ্জ, আর্থিক সংকোচন এবং প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার হোঁচট পেরিয়ে এশিয়ানে গেমস এর আয়োজক আইচি-নাগোয়া শেষ পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক মহাযজ্ঞ কতটুক সফলভাবে উতরে যেতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো ক্রীড়াবিশ্ব।