ঢাকা ০৪:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ডলারের শহরে আত্মার নিঃসঙ্গতা

নিউইয়র্ক থেকে নুরুজ্জামান লাভলু
  • আপডেট সময় : ০১:০৮:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৮ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আমেরিকায় এসে মানুষের জীবনের এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হয়েছি। এখানে প্রাচুর্য আছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, নাগরিক জীবনের নানা স্বাচ্ছন্দ্য আছে। আকাশচুম্বী অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক আর নিয়ন আলোয় মোড়া নগরজীবনের নিরন্তর কোলাহল আছে। অথচ এত আয়োজনের মাঝেও কোথাও যেন মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের সহজ উষ্ণতা হারিয়ে যেতে বসেছে।

এখানে জীবন ছুটছে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। মানুষের সময় যেন ডলারের অঙ্কে বাঁধা। কিন্তু এই অন্তহীন ছুটে চলার শেষ কোথায়? জীবনের শেষ বিকেলে এসে মানুষ কার হাত ধরে বসে থাকে? কার কাঁধে মাথা রেখে বলতে পারে, আজ আমার বড় একা লাগছে?

স্টিভ নামে আমার একজন পরিচিত সিনিয়র বন্ধু আছেন। একসময় মার্কিন সামরিক বাহিনীতে চাকরি করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবন পেরিয়ে এখন বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছেন। তাঁর বড় সন্তানের বয়স চুয়ান্ন বছর, অথচ সেই সন্তানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। একাধিক বিবাহিত জীবনে তাঁর আরও সন্তান রয়েছে। তাদের সঙ্গেও সম্পর্কের সেতুগুলো ভেঙে গেছে। এখন সপ্তম স্ত্রীর সঙ্গে কাটছে তাঁর জীবনের পড়ন্ত বেলা।

স্টিভের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখনো মনে হয়, মানুষের জীবনে কত মানুষ আসে, কত সম্পর্কের জন্ম হয়, কত সংসার গড়ে ওঠে; অথচ শেষ পর্যন্ত মানুষ কী আশ্চর্য নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে পারে!

যে মানুষটির ঘরে একদিন শিশুদের হাসি-কান্না শোনা যেত, সেই মানুষটি আজ গভীর রাতে কার কথা ভাবেন? তাঁর স্মৃতিতে কি কখনো ফিরে আসে বড় সন্তানের শৈশবের মুখ? কোনো জন্মদিনে কি অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের? উৎসবের সকালে কি বুকের গভীরে হঠাৎ জেগে ওঠে হারিয়ে যাওয়া সংসারের বিষন্ন স্মৃতি?

জানি না। তাঁকে এসব প্রশ্নও করি না। মানুষের একান্ত বেদনারও নিজস্ব মর্যাদা আছে। সব নিঃসঙ্গতার দরজায় কড়া নাড়তে নেই।

তবে স্টিভকে দেখে বারবার মনে হয়, বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব হয়তো শরীরের ক্ষয় নয়, আপনজনের অনুপস্থিতি। বয়সের সঙ্গে পৃথিবী যখন ক্রমশ ছোট হয়ে আসে, তখন মানুষের প্রয়োজন হয় কয়েকটি পরিচিত মুখ, একটি নির্ভরযোগ্য হাত, আর সামান্য কিছু মমতামাখা প্রশ্ন—খেয়েছ? শরীর কেমন? ওষুধ নিয়েছ তো?

এই সাধারণ বাক্যগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জীবনের অসাধারণ আশ্রয়।

আমেরিকান সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য অনেক। সন্তান বড় হয়ে নিজের পৃথিবী গড়ে নেয়। বাবা-মায়ের জীবন থেকে আলাদা হয়ে নিজের স্বপ্ন, সংসার ও কর্মব্যস্ততায় ডুবে যায়। অবশ্য এখানেও ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকা অসংখ্য পরিবার আছে। তবু চারপাশের কিছু প্রবীণ মানুষের জীবন দেখে মনে হয়, স্বাধীনতার এই বিপুল আকাশের নিচে নিঃসঙ্গতারও এক নিঃশব্দ মরুভূমি বিস্তৃত।

এখানে বৃদ্ধ মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা আছে, সুন্দর আবাসন আছে, অবসরজীবনের নানা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ের শূন্যতা পূরণের কোনো প্রযুক্তি নেই। অর্থের বিনিময়ে সেবা পাওয়া যায়, স্নেহ নয়। পরিচর্যা পাওয়া যায়, কিন্তু সন্তানের মমতা কিংবা আপনজনের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি কেনা যায় না।

আমাদের বাংলাদেশের জীবন অনেকটাই ভিন্ন।

সেখানে অভাব আছে, অনিশ্চয়তা আছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে। সব পরিবার ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে না। তবু আমাদের সামাজিক জীবনের গভীরে পারিবারিক বন্ধনের যে শিকড় ছড়িয়ে আছে, তার মধ্যে এক আশ্চর্য মায়া খুঁজে পাই।

ঈদের আগে লাখো মানুষ কেন এত কষ্ট করে বাড়ি ফেরে? দীর্ঘ যানজট, ভিড় আর অবর্ণনীয় ক্লান্তি পেরিয়ে কেন ছুটে যায় দূরের কোনো গ্রামে? শুধু উৎসবের জন্য নয়। ফেরে মায়ের মুখ দেখতে, বাবার পাশে বসতে, ভাইবোনদের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে। ফেরে সেই উঠোনে, যেখানে শৈশবের অদৃশ্য পদচিহ্নগুলো আজও মুছে যায়নি।

একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের রাতের খাবারের টেবিলে হয়তো দামি কোনো আয়োজন নেই। আছে ভাত, ডাল, মাছের ঝোল আর সামান্য ভর্তা। কিন্তু সেই সামান্য আয়োজন ঘিরে থাকে কত গল্প, হাসি, অভিমান আর খুনসুটি! থাকে একে অপরের জীবনে জড়িয়ে থাকার এক গভীর নিশ্চয়তা।

এই নিশ্চয়তার কোনো বাজারদর নেই।

নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই মনে হয়, এই শহর মানুষকে অনেক কিছু দেয়, কিন্তু অবসর দেয় সামান্যই। এখানে এক ঘণ্টা মানে নির্দিষ্ট কিছু ডলার। অতিরিক্ত কাজ মানে বাড়তি আয়। সকাল থেকে রাত অবধি মানুষ ছুটছে ভাড়া, মর্টগেজ, ইনস্যুরেন্স, ট্যাক্স আর জীবনের অন্তহীন হিসাব মেলাতে।

দিন ফুরোয়, মাস পেরোয়, বছর হারিয়ে যায়। মানুষ অর্থ জমায়, অথচ অজান্তেই নিঃশেষ করে ফেলে জীবনের সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ—সময়।

কী অদ্ভুত পরিহাস! যে সময়ের বিনিময়ে মানুষ অর্থ উপার্জন করে, পৃথিবীর সমস্ত অর্থ দিয়েও সেই হারানো সময়ের এক মুহূর্ত ফিরিয়ে আনা যায় না।

এই উপলব্ধি আমার কাছে এখন আরও গভীর। কিছুদিন আগে হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বুকের পাঁজর খুলে চিকিৎসকেরা যখন বেঁচে থাকার নতুন পথ তৈরি করছিলেন, তখন জীবন যেন তার সমস্ত অহংকার নিয়ে এক মুহূর্তে নতজানু হয়ে পড়েছিল।

অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ ক্ষত নিয়ে যখন আবার পৃথিবীর আলোয় ফিরলাম, তখন অনেক পুরোনো হিসাব অর্থহীন মনে হলো। যে অর্জন একদিন অপরিহার্য ছিল, যে স্বপ্নের পেছনে এত ছুটেছি, সেসবের চেয়েও মূল্যবান হয়ে উঠল একটি সকাল, একটি পরিচিত কণ্ঠ, প্রিয় মানুষের সামান্য সান্নিধ্য।

বুকের মাঝখানের ক্ষতচিহ্নটি এখন প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, জীবনের জন্য আমাদের কত আয়োজন, অথচ জীবনের ওপর আমাদের অধিকার কত সামান্য!

আগে ভাবতাম, আরও দূরে যেতে হবে, আরও কিছু অর্জন করতে হবে। এখন নিজেকেই প্রশ্ন করি, আর কত দূর গেলে মানুষ শান্তির ঠিকানা খুঁজে পায়?

স্টিভের জীবনের পড়ন্ত বিকেল আর আমার হাসপাতালের সেই দিনগুলো যেন একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—মানুষ শেষ পর্যন্ত কিসের জন্য বাঁচে? সম্পদের জন্য, সাফল্যের জন্য, নাকি কারও ভালোবাসার ভেতর নিজের অস্তিত্বটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য?

আমি জানি, বাংলাদেশে ফিরলেই জীবনের সব অনিশ্চয়তা দূর হবে না। সেখানে সামাজিক অস্থিরতা আছে, অর্থনৈতিক সংকট আছে, জীবনের নিজস্ব কঠোরতা আছে। যে দেশ ছেড়ে এসেছি, সেই দেশ আমূল বদলে গেছে। তবু সেই মাটির সঙ্গে আমার আত্মার এক অদৃশ্য সংযোগ রয়ে গেছে।

সেখানে আমার ভাষা আছে, শৈশব আছে, স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা অসংখ্য মুখ আছে। কোনো চায়ের দোকানে বসলে পরিচিত কথার শব্দ শুনতে পাব। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে ফিরে আসবে ফেলে আসা দিনের গল্প। কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে হয়তো হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসবে আমার হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।

আমি সেই চেনা জীবনের কাছেই ফিরতে চাই।

যেখানে বিকেলের কিছুটা সময় প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানোকে আর্থিক ক্ষতি মনে হবে না। যেখানে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া যাবে। যেখানে সম্পর্কের জন্য সব সময় ক্যালেন্ডারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট খুঁজতে হবে না। যেখানে একটি দিনের সার্থকতা কেবল উপার্জনের অঙ্কে মাপা হবে না।

হয়তো এ আমার স্মৃতির বাংলাদেশ। বাস্তবের বাংলাদেশ আরও জটিল, আরও কঠিন। তবু মানুষের তো একটি অন্তর্গত স্বদেশ থাকে, যেখানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনো ফুরোয় না।

আমার এখন আর বিপুল অর্থের স্বপ্ন নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে একটি নিঃসঙ্গ ঘরে বসে শুধু অতীতের মুখগুলো মনে করতে চাই না। চাই কিছু আপন মানুষের সান্নিধ্য, পরিচিত ভাষার মমতা, আর এমন কিছু বিকেল, যেখানে কোথাও পৌঁছানোর তাড়া থাকবে না।

কারণ এখন বুঝি, মানুষের প্রকৃত সম্পদ ব্যাংকের হিসাবে জমা থাকে না। জমা থাকে সেইসব হৃদয়ে, যেখানে তার অনুপস্থিতি একটুখানি শূন্যতা তৈরি করে।

আমি বাড়ি ফিরতে চাই।

কোনো পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে নয়, কোনো অভিমান কিংবা অভিযোগ নিয়েও নয়। ফিরতে চাই জীবনকে নতুন করে চিনতে শেখা একজন মানুষের মতো, যে দীর্ঘ পথ ঘুরে বুঝেছে, পৃথিবীর সব রাস্তা মানুষকে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না।

কিছু পথ কেবল দূরত্ব বাড়ায়। আর কিছু পুরোনো, ভাঙাচোরা পথ মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের অস্তিত্বের গভীরে।

আমি সেই ফেরার পথটুকুই খুঁজছি৷

সাউথ রিচমন্ড হিল
নিউ ইয়র্ক, ইউএসএ।
২৭ অক্টোবর, ২০২৬

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ডলারের শহরে আত্মার নিঃসঙ্গতা

আপডেট সময় : ০১:০৮:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

আমেরিকায় এসে মানুষের জীবনের এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হয়েছি। এখানে প্রাচুর্য আছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, নাগরিক জীবনের নানা স্বাচ্ছন্দ্য আছে। আকাশচুম্বী অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক আর নিয়ন আলোয় মোড়া নগরজীবনের নিরন্তর কোলাহল আছে। অথচ এত আয়োজনের মাঝেও কোথাও যেন মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের সহজ উষ্ণতা হারিয়ে যেতে বসেছে।

এখানে জীবন ছুটছে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। মানুষের সময় যেন ডলারের অঙ্কে বাঁধা। কিন্তু এই অন্তহীন ছুটে চলার শেষ কোথায়? জীবনের শেষ বিকেলে এসে মানুষ কার হাত ধরে বসে থাকে? কার কাঁধে মাথা রেখে বলতে পারে, আজ আমার বড় একা লাগছে?

স্টিভ নামে আমার একজন পরিচিত সিনিয়র বন্ধু আছেন। একসময় মার্কিন সামরিক বাহিনীতে চাকরি করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবন পেরিয়ে এখন বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছেন। তাঁর বড় সন্তানের বয়স চুয়ান্ন বছর, অথচ সেই সন্তানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। একাধিক বিবাহিত জীবনে তাঁর আরও সন্তান রয়েছে। তাদের সঙ্গেও সম্পর্কের সেতুগুলো ভেঙে গেছে। এখন সপ্তম স্ত্রীর সঙ্গে কাটছে তাঁর জীবনের পড়ন্ত বেলা।

স্টিভের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখনো মনে হয়, মানুষের জীবনে কত মানুষ আসে, কত সম্পর্কের জন্ম হয়, কত সংসার গড়ে ওঠে; অথচ শেষ পর্যন্ত মানুষ কী আশ্চর্য নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে পারে!

যে মানুষটির ঘরে একদিন শিশুদের হাসি-কান্না শোনা যেত, সেই মানুষটি আজ গভীর রাতে কার কথা ভাবেন? তাঁর স্মৃতিতে কি কখনো ফিরে আসে বড় সন্তানের শৈশবের মুখ? কোনো জন্মদিনে কি অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের? উৎসবের সকালে কি বুকের গভীরে হঠাৎ জেগে ওঠে হারিয়ে যাওয়া সংসারের বিষন্ন স্মৃতি?

জানি না। তাঁকে এসব প্রশ্নও করি না। মানুষের একান্ত বেদনারও নিজস্ব মর্যাদা আছে। সব নিঃসঙ্গতার দরজায় কড়া নাড়তে নেই।

তবে স্টিভকে দেখে বারবার মনে হয়, বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব হয়তো শরীরের ক্ষয় নয়, আপনজনের অনুপস্থিতি। বয়সের সঙ্গে পৃথিবী যখন ক্রমশ ছোট হয়ে আসে, তখন মানুষের প্রয়োজন হয় কয়েকটি পরিচিত মুখ, একটি নির্ভরযোগ্য হাত, আর সামান্য কিছু মমতামাখা প্রশ্ন—খেয়েছ? শরীর কেমন? ওষুধ নিয়েছ তো?

এই সাধারণ বাক্যগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জীবনের অসাধারণ আশ্রয়।

আমেরিকান সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য অনেক। সন্তান বড় হয়ে নিজের পৃথিবী গড়ে নেয়। বাবা-মায়ের জীবন থেকে আলাদা হয়ে নিজের স্বপ্ন, সংসার ও কর্মব্যস্ততায় ডুবে যায়। অবশ্য এখানেও ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকা অসংখ্য পরিবার আছে। তবু চারপাশের কিছু প্রবীণ মানুষের জীবন দেখে মনে হয়, স্বাধীনতার এই বিপুল আকাশের নিচে নিঃসঙ্গতারও এক নিঃশব্দ মরুভূমি বিস্তৃত।

এখানে বৃদ্ধ মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা আছে, সুন্দর আবাসন আছে, অবসরজীবনের নানা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ের শূন্যতা পূরণের কোনো প্রযুক্তি নেই। অর্থের বিনিময়ে সেবা পাওয়া যায়, স্নেহ নয়। পরিচর্যা পাওয়া যায়, কিন্তু সন্তানের মমতা কিংবা আপনজনের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি কেনা যায় না।

আমাদের বাংলাদেশের জীবন অনেকটাই ভিন্ন।

সেখানে অভাব আছে, অনিশ্চয়তা আছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে। সব পরিবার ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে না। তবু আমাদের সামাজিক জীবনের গভীরে পারিবারিক বন্ধনের যে শিকড় ছড়িয়ে আছে, তার মধ্যে এক আশ্চর্য মায়া খুঁজে পাই।

ঈদের আগে লাখো মানুষ কেন এত কষ্ট করে বাড়ি ফেরে? দীর্ঘ যানজট, ভিড় আর অবর্ণনীয় ক্লান্তি পেরিয়ে কেন ছুটে যায় দূরের কোনো গ্রামে? শুধু উৎসবের জন্য নয়। ফেরে মায়ের মুখ দেখতে, বাবার পাশে বসতে, ভাইবোনদের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে। ফেরে সেই উঠোনে, যেখানে শৈশবের অদৃশ্য পদচিহ্নগুলো আজও মুছে যায়নি।

একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের রাতের খাবারের টেবিলে হয়তো দামি কোনো আয়োজন নেই। আছে ভাত, ডাল, মাছের ঝোল আর সামান্য ভর্তা। কিন্তু সেই সামান্য আয়োজন ঘিরে থাকে কত গল্প, হাসি, অভিমান আর খুনসুটি! থাকে একে অপরের জীবনে জড়িয়ে থাকার এক গভীর নিশ্চয়তা।

এই নিশ্চয়তার কোনো বাজারদর নেই।

নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই মনে হয়, এই শহর মানুষকে অনেক কিছু দেয়, কিন্তু অবসর দেয় সামান্যই। এখানে এক ঘণ্টা মানে নির্দিষ্ট কিছু ডলার। অতিরিক্ত কাজ মানে বাড়তি আয়। সকাল থেকে রাত অবধি মানুষ ছুটছে ভাড়া, মর্টগেজ, ইনস্যুরেন্স, ট্যাক্স আর জীবনের অন্তহীন হিসাব মেলাতে।

দিন ফুরোয়, মাস পেরোয়, বছর হারিয়ে যায়। মানুষ অর্থ জমায়, অথচ অজান্তেই নিঃশেষ করে ফেলে জীবনের সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ—সময়।

কী অদ্ভুত পরিহাস! যে সময়ের বিনিময়ে মানুষ অর্থ উপার্জন করে, পৃথিবীর সমস্ত অর্থ দিয়েও সেই হারানো সময়ের এক মুহূর্ত ফিরিয়ে আনা যায় না।

এই উপলব্ধি আমার কাছে এখন আরও গভীর। কিছুদিন আগে হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বুকের পাঁজর খুলে চিকিৎসকেরা যখন বেঁচে থাকার নতুন পথ তৈরি করছিলেন, তখন জীবন যেন তার সমস্ত অহংকার নিয়ে এক মুহূর্তে নতজানু হয়ে পড়েছিল।

অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ ক্ষত নিয়ে যখন আবার পৃথিবীর আলোয় ফিরলাম, তখন অনেক পুরোনো হিসাব অর্থহীন মনে হলো। যে অর্জন একদিন অপরিহার্য ছিল, যে স্বপ্নের পেছনে এত ছুটেছি, সেসবের চেয়েও মূল্যবান হয়ে উঠল একটি সকাল, একটি পরিচিত কণ্ঠ, প্রিয় মানুষের সামান্য সান্নিধ্য।

বুকের মাঝখানের ক্ষতচিহ্নটি এখন প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, জীবনের জন্য আমাদের কত আয়োজন, অথচ জীবনের ওপর আমাদের অধিকার কত সামান্য!

আগে ভাবতাম, আরও দূরে যেতে হবে, আরও কিছু অর্জন করতে হবে। এখন নিজেকেই প্রশ্ন করি, আর কত দূর গেলে মানুষ শান্তির ঠিকানা খুঁজে পায়?

স্টিভের জীবনের পড়ন্ত বিকেল আর আমার হাসপাতালের সেই দিনগুলো যেন একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—মানুষ শেষ পর্যন্ত কিসের জন্য বাঁচে? সম্পদের জন্য, সাফল্যের জন্য, নাকি কারও ভালোবাসার ভেতর নিজের অস্তিত্বটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য?

আমি জানি, বাংলাদেশে ফিরলেই জীবনের সব অনিশ্চয়তা দূর হবে না। সেখানে সামাজিক অস্থিরতা আছে, অর্থনৈতিক সংকট আছে, জীবনের নিজস্ব কঠোরতা আছে। যে দেশ ছেড়ে এসেছি, সেই দেশ আমূল বদলে গেছে। তবু সেই মাটির সঙ্গে আমার আত্মার এক অদৃশ্য সংযোগ রয়ে গেছে।

সেখানে আমার ভাষা আছে, শৈশব আছে, স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা অসংখ্য মুখ আছে। কোনো চায়ের দোকানে বসলে পরিচিত কথার শব্দ শুনতে পাব। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে ফিরে আসবে ফেলে আসা দিনের গল্প। কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে হয়তো হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসবে আমার হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।

আমি সেই চেনা জীবনের কাছেই ফিরতে চাই।

যেখানে বিকেলের কিছুটা সময় প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানোকে আর্থিক ক্ষতি মনে হবে না। যেখানে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া যাবে। যেখানে সম্পর্কের জন্য সব সময় ক্যালেন্ডারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট খুঁজতে হবে না। যেখানে একটি দিনের সার্থকতা কেবল উপার্জনের অঙ্কে মাপা হবে না।

হয়তো এ আমার স্মৃতির বাংলাদেশ। বাস্তবের বাংলাদেশ আরও জটিল, আরও কঠিন। তবু মানুষের তো একটি অন্তর্গত স্বদেশ থাকে, যেখানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনো ফুরোয় না।

আমার এখন আর বিপুল অর্থের স্বপ্ন নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে একটি নিঃসঙ্গ ঘরে বসে শুধু অতীতের মুখগুলো মনে করতে চাই না। চাই কিছু আপন মানুষের সান্নিধ্য, পরিচিত ভাষার মমতা, আর এমন কিছু বিকেল, যেখানে কোথাও পৌঁছানোর তাড়া থাকবে না।

কারণ এখন বুঝি, মানুষের প্রকৃত সম্পদ ব্যাংকের হিসাবে জমা থাকে না। জমা থাকে সেইসব হৃদয়ে, যেখানে তার অনুপস্থিতি একটুখানি শূন্যতা তৈরি করে।

আমি বাড়ি ফিরতে চাই।

কোনো পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে নয়, কোনো অভিমান কিংবা অভিযোগ নিয়েও নয়। ফিরতে চাই জীবনকে নতুন করে চিনতে শেখা একজন মানুষের মতো, যে দীর্ঘ পথ ঘুরে বুঝেছে, পৃথিবীর সব রাস্তা মানুষকে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না।

কিছু পথ কেবল দূরত্ব বাড়ায়। আর কিছু পুরোনো, ভাঙাচোরা পথ মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের অস্তিত্বের গভীরে।

আমি সেই ফেরার পথটুকুই খুঁজছি৷

সাউথ রিচমন্ড হিল
নিউ ইয়র্ক, ইউএসএ।
২৭ অক্টোবর, ২০২৬