ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ভাঙা পড়বে জীর্ণ ভবন, আধুনিক-পরিবেশবান্ধব হবে ঢামেক

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৭:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • / ৪৬ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কিছুদিন আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের একটি অনুষ্ঠানে স্বস্ত্রীক অতিথির আসনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানকার পরিবেশ দেখে তিনি খুশি হতে পারেন নি। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার তালিম সেখানে উপস্থিত ডাক্তারসহ কর্মকর্তা,কর্মচারিদের দিয়েছিলেন। তা অনেকের কাছে তা ভালো নাও লাগতে পারে,কিন্তু দেশকে ভালো এবং সুন্দর রাখার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের প্রয়োজন ডিসিপ্লিন ও শৃঙ্খলা মেনে চলা। এই জায়গাগুলো যে গত সতের বছর নষ্ট হয়ে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা মেডিকেলের জরাজীর্ণ অবস্থার পরিবতর্ন আনতে তিনি দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ নেয়ার যে বার্তা দিয়েছিলেন তারই প্রতিফলন মনে হয় সহায় ঘটতে যাচ্ছে।

জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পুরাতন জরাজীর্ণ ভবন ভেঙ্গে সেখানে নতুন করে আধুনিক সুযোগ সুবিধা এবং পরিবেশ বান্ধব ভবন নির্মানের পরিকল্পনা অনেকটাই চূড়ান্ত। ব্রিটিশ আমলের গড়া বিশাল সেই ভবনটির স্থলে নির্মিত হবে ১৫ তলার একাডেমক ভবন, ১৫ তলা বিশিষ্ট হোস্টেল এবং ১৫ তলা বিশিষ্ট কোয়ার্টার। থাকবে পরিবেশ বান্ধব ক্যাম্পাস।

তবে যতই পুরাতন এবং জরাজীর্ণ ভবনই হোক না কেন ঢাকা মেডিকেলই দেশের রোগীদের জন্য এক নাম্বার চিকিৎসাস্থল। প্রবাদই আছে এই মেডিকেলের বারান্দায় যে চিকিৎসা সেবা মিলে তা বাংলাদেশের কোথায়ও দেখা যায় না। যদিও কিছু অসাধু লোকের বিচরণ সর্বদা দেখা যায়। এর পিছনে কাজ করে বিশাল এক সিন্ডিকেট। চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এর গন্ধ ছড়িয়ে আছে।সকল ধরনের গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট করার সুযোগ সুবিধাদি এখানে থাকলেও এখানকার সব যন্ত্রপাতি প্রায়শই নষ্ট হওয়ার গল্প শোনা যায়। অসহায় রোগীরা তখন হয় প্রাইভেট হাসপাতালের দিকে ছুটে যান,নতুবা বাহির থেকে সব টেস্ট করিয়ে আনেন। তাদের খেয়ালীপনায় এই প্রতিষ্ঠানটি ক্রমাশয় বদনামে রুপ নেয়। এটি শুধু ঢাকা মেডিকেলেই নয়, সকল সরকারি হাসপাতাল গুলোতেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। তাইতো প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছিলেন, একজন রোগী চিকিৎসকের কাছ থেকে একটু খানি ভালো ব্যবহার পেলে তার অসুস্থ্যতা অর্ধেকটাই ভালো হয়ে যায়। মানবিক এই গুণাবলী সর্বত্রে প্রয়োগ না হলে টেকসই সমাজ গড়ে উঠা অসম্ভব। সরকার থেকে এই বার্তা বারবার দেয়া হচ্ছে।

তবে সব কিছুর পরেও চিকিৎসা সেবায় ঢাকা মেডেকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল (ঢামেক) হচ্ছে নির্ভরতা প্রতীক। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন এখানে। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক তৈরির কারিগর হিসেবেও পরিচিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

কিন্তু দেশের মানুষের চিকিৎসায় ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা সেই ঢামেকের স্বাস্থ্যই আজ ‘ভঙ্গুর’। পুরোনো ও জীর্ণ ভবন, আবাসন সংকটসহ নানান সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনাসমূহ প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ও পরিবেশ বান্ধব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বুধবার (২২ জুলাই) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র্য কমানোর জন্য প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নির্মিত নতুন একাডেমিক ভবন, হোস্টেল, গবেষণাগার, আধুনিক ক্লাসরুম পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন তথা ভবিষ্যতের দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটবে এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে সুস্থ-সবল জাতি গঠনে সহায়ক হবে বিধায় প্রকল্পটি অনুমোদনযোগ্য মনে করা হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর জানায়, ডিএমসি’র সম্প্রসারণ, উন্নয়ন এবং আধুনিকায়ন একান্ত প্রয়োজন। ফলে বর্তমান একাডেমিক ভবন ও হোস্টলেসমূহ মেরামত অযোগ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এজন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় সব আধুনিক ব্যবস্থা যেমন- একাডেমিক ভবন, শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল, লেকচার থিয়েটার, এক্সাম হল, প্রার্থনা কক্ষ, অডিটোরিয়াম ইত্যাদির সংস্থান রেখে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই মোতাবেক প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

আরও জানা গেছে, অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান মোতাবেক নতুন একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, আবাসিক কোয়ার্টার, মসজিদ, সার্ভিস ভবন এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক স্থাপনার সংস্থাপন রেখে প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়।

প্রস্তাবিত অবকাঠামোসমূহ
ঢাকা মেডিকেল কলেজকে আধুনিকায়নে নেওয়া প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে- দুটি বেজমেন্টসহ ১৫তলা বিশিষ্ট আবাসিক কোয়ার্টার ভবন, এর মোট আয়তন হবে দুই হাজার ৬০১ বর্গমিটার; ৮০০ আসন বিশিষ্ট ও একটি বেজমেন্টসহ ১৫তলা বিশিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল, এর আয়তন হবে ২৫ হাজার ৮৬৩ বর্গমিটার; বেজমেন্টসহ ১৫তলা বিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন, এর আয়তন ৮৬ হাজার ৮৫৪ বর্গমিটার; ৩০০ আসন বিশিষ্ট চারটি লেকচার থিয়েটার, ৩০০ আসন বিশিষ্ট দুটি পরীক্ষা কক্ষের সুবিধা রেখে চারতলা বিশিষ্ট একটি সার্ভিস ভবন; ৮০০ জন মুসল্লির জায়গা সংস্থান রেখে চারতলা বিশিষ্ট একটি মসজিদ; অনাবাসিক ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ, বাউন্ডারি ওয়াল, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও কালভার্ট, সেন্ট্রি পোস্ট, ওয়াকওয়ে, ফুটপাত, কম্পাউন্ড ড্রেন নির্মাণ।

এছাড়া বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির (বহিঃস্থ বিদ্যুতায়ন) জন্য ভবন ও সংশ্লিষ্ট স্থানে আসবাবপত্র ক্রয়, বিশেষ করে মেডিকেল কলেজ, ছাত্রাবাস ও অন্যান্য স্থানে; যন্ত্রপাতি (মেডিকেল কলেজ), অফিস সরঞ্জামাদি (ফটোকপিয়ার মেশিন দুটি, এসি একটি) ক্রয়; তিনটি প্রিন্টার, তিনটি স্ক্যানার, কম্পিউটার এবং আনুষঙ্গিক হিসেবে দুটি ল্যাপটপ ও একটি ডেস্কটপ কেনা হবে।

পাশাপাশি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, এসটিপি, ডিপটিউবওয়েল, অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংযোগ, এলপিজি ইলেকট্রোমেকানিক্যাল বিষয়সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব আনুষঙ্গিক বিষয়, সবুজায়ন, ওয়াটার বডি উন্নয়ন, পানি সাশ্রয়ী স্যানিটেশন, ফায়ার হাইড্রেন্ট সিস্টেম, সাব-স্টেশন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক অত্যাধুনিক লিফট, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী লাইট, অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক ফিটিংস, সব প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নানা কারণে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ দেশের প্রথম ও প্রধান মেডিকেল কলেজ। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল দেশের অন্যতম প্রধান স্বনামধন্য, প্রাচীন ও সর্বোচ্চ স্তরের চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আওতায় বর্তমানে প্রায় ৬০টি ভবন রয়েছে। ২ হাজার ৬০০ বেডের সংকুলান থাকলেও গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার রোগী এই প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণের জন্য ভর্তি হয়।

্এছাড়া বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভ করছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ৪টি। এর মধ্যে ১৯৫৫ সালে ছাত্রদের জন্য নির্মিত হয় ডা. ফজলে রাব্বি হল। প্রায় ৭০০ জনের আবাসন ব্যবস্থা থাকলেও পুরোনো ও জরাজীর্ণ এই হলে বর্তমানে ধারণক্ষমতার চেয়ে কম শিক্ষার্থী থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

এরই মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর ডা. ফজলে রাব্বি হলের মূল ভবনের চারতলাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় সেখানে শিক্ষার্থীরা থাকেন না। ফলে নতুন ব্যাচে ভর্তিদের আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া ডা. মিলন ইন্টার্নি হোস্টেলে পোস্টগ্রাজুয়েট ইন্টার্ন ছাত্ররা থাকেন, যা চিকিৎসক তৈরির সূতিকাগার।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ভাঙা পড়বে জীর্ণ ভবন, আধুনিক-পরিবেশবান্ধব হবে ঢামেক

আপডেট সময় : ০৯:৪৭:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

কিছুদিন আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের একটি অনুষ্ঠানে স্বস্ত্রীক অতিথির আসনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানকার পরিবেশ দেখে তিনি খুশি হতে পারেন নি। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার তালিম সেখানে উপস্থিত ডাক্তারসহ কর্মকর্তা,কর্মচারিদের দিয়েছিলেন। তা অনেকের কাছে তা ভালো নাও লাগতে পারে,কিন্তু দেশকে ভালো এবং সুন্দর রাখার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের প্রয়োজন ডিসিপ্লিন ও শৃঙ্খলা মেনে চলা। এই জায়গাগুলো যে গত সতের বছর নষ্ট হয়ে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা মেডিকেলের জরাজীর্ণ অবস্থার পরিবতর্ন আনতে তিনি দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ নেয়ার যে বার্তা দিয়েছিলেন তারই প্রতিফলন মনে হয় সহায় ঘটতে যাচ্ছে।

জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পুরাতন জরাজীর্ণ ভবন ভেঙ্গে সেখানে নতুন করে আধুনিক সুযোগ সুবিধা এবং পরিবেশ বান্ধব ভবন নির্মানের পরিকল্পনা অনেকটাই চূড়ান্ত। ব্রিটিশ আমলের গড়া বিশাল সেই ভবনটির স্থলে নির্মিত হবে ১৫ তলার একাডেমক ভবন, ১৫ তলা বিশিষ্ট হোস্টেল এবং ১৫ তলা বিশিষ্ট কোয়ার্টার। থাকবে পরিবেশ বান্ধব ক্যাম্পাস।

তবে যতই পুরাতন এবং জরাজীর্ণ ভবনই হোক না কেন ঢাকা মেডিকেলই দেশের রোগীদের জন্য এক নাম্বার চিকিৎসাস্থল। প্রবাদই আছে এই মেডিকেলের বারান্দায় যে চিকিৎসা সেবা মিলে তা বাংলাদেশের কোথায়ও দেখা যায় না। যদিও কিছু অসাধু লোকের বিচরণ সর্বদা দেখা যায়। এর পিছনে কাজ করে বিশাল এক সিন্ডিকেট। চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এর গন্ধ ছড়িয়ে আছে।সকল ধরনের গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট করার সুযোগ সুবিধাদি এখানে থাকলেও এখানকার সব যন্ত্রপাতি প্রায়শই নষ্ট হওয়ার গল্প শোনা যায়। অসহায় রোগীরা তখন হয় প্রাইভেট হাসপাতালের দিকে ছুটে যান,নতুবা বাহির থেকে সব টেস্ট করিয়ে আনেন। তাদের খেয়ালীপনায় এই প্রতিষ্ঠানটি ক্রমাশয় বদনামে রুপ নেয়। এটি শুধু ঢাকা মেডিকেলেই নয়, সকল সরকারি হাসপাতাল গুলোতেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। তাইতো প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছিলেন, একজন রোগী চিকিৎসকের কাছ থেকে একটু খানি ভালো ব্যবহার পেলে তার অসুস্থ্যতা অর্ধেকটাই ভালো হয়ে যায়। মানবিক এই গুণাবলী সর্বত্রে প্রয়োগ না হলে টেকসই সমাজ গড়ে উঠা অসম্ভব। সরকার থেকে এই বার্তা বারবার দেয়া হচ্ছে।

তবে সব কিছুর পরেও চিকিৎসা সেবায় ঢাকা মেডেকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল (ঢামেক) হচ্ছে নির্ভরতা প্রতীক। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন এখানে। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক তৈরির কারিগর হিসেবেও পরিচিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

কিন্তু দেশের মানুষের চিকিৎসায় ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা সেই ঢামেকের স্বাস্থ্যই আজ ‘ভঙ্গুর’। পুরোনো ও জীর্ণ ভবন, আবাসন সংকটসহ নানান সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনাসমূহ প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ও পরিবেশ বান্ধব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বুধবার (২২ জুলাই) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র্য কমানোর জন্য প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নির্মিত নতুন একাডেমিক ভবন, হোস্টেল, গবেষণাগার, আধুনিক ক্লাসরুম পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন তথা ভবিষ্যতের দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটবে এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে সুস্থ-সবল জাতি গঠনে সহায়ক হবে বিধায় প্রকল্পটি অনুমোদনযোগ্য মনে করা হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর জানায়, ডিএমসি’র সম্প্রসারণ, উন্নয়ন এবং আধুনিকায়ন একান্ত প্রয়োজন। ফলে বর্তমান একাডেমিক ভবন ও হোস্টলেসমূহ মেরামত অযোগ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এজন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় সব আধুনিক ব্যবস্থা যেমন- একাডেমিক ভবন, শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল, লেকচার থিয়েটার, এক্সাম হল, প্রার্থনা কক্ষ, অডিটোরিয়াম ইত্যাদির সংস্থান রেখে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই মোতাবেক প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

আরও জানা গেছে, অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান মোতাবেক নতুন একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, আবাসিক কোয়ার্টার, মসজিদ, সার্ভিস ভবন এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক স্থাপনার সংস্থাপন রেখে প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়।

প্রস্তাবিত অবকাঠামোসমূহ
ঢাকা মেডিকেল কলেজকে আধুনিকায়নে নেওয়া প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে- দুটি বেজমেন্টসহ ১৫তলা বিশিষ্ট আবাসিক কোয়ার্টার ভবন, এর মোট আয়তন হবে দুই হাজার ৬০১ বর্গমিটার; ৮০০ আসন বিশিষ্ট ও একটি বেজমেন্টসহ ১৫তলা বিশিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল, এর আয়তন হবে ২৫ হাজার ৮৬৩ বর্গমিটার; বেজমেন্টসহ ১৫তলা বিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন, এর আয়তন ৮৬ হাজার ৮৫৪ বর্গমিটার; ৩০০ আসন বিশিষ্ট চারটি লেকচার থিয়েটার, ৩০০ আসন বিশিষ্ট দুটি পরীক্ষা কক্ষের সুবিধা রেখে চারতলা বিশিষ্ট একটি সার্ভিস ভবন; ৮০০ জন মুসল্লির জায়গা সংস্থান রেখে চারতলা বিশিষ্ট একটি মসজিদ; অনাবাসিক ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ, বাউন্ডারি ওয়াল, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও কালভার্ট, সেন্ট্রি পোস্ট, ওয়াকওয়ে, ফুটপাত, কম্পাউন্ড ড্রেন নির্মাণ।

এছাড়া বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির (বহিঃস্থ বিদ্যুতায়ন) জন্য ভবন ও সংশ্লিষ্ট স্থানে আসবাবপত্র ক্রয়, বিশেষ করে মেডিকেল কলেজ, ছাত্রাবাস ও অন্যান্য স্থানে; যন্ত্রপাতি (মেডিকেল কলেজ), অফিস সরঞ্জামাদি (ফটোকপিয়ার মেশিন দুটি, এসি একটি) ক্রয়; তিনটি প্রিন্টার, তিনটি স্ক্যানার, কম্পিউটার এবং আনুষঙ্গিক হিসেবে দুটি ল্যাপটপ ও একটি ডেস্কটপ কেনা হবে।

পাশাপাশি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, এসটিপি, ডিপটিউবওয়েল, অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংযোগ, এলপিজি ইলেকট্রোমেকানিক্যাল বিষয়সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব আনুষঙ্গিক বিষয়, সবুজায়ন, ওয়াটার বডি উন্নয়ন, পানি সাশ্রয়ী স্যানিটেশন, ফায়ার হাইড্রেন্ট সিস্টেম, সাব-স্টেশন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক অত্যাধুনিক লিফট, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী লাইট, অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক ফিটিংস, সব প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নানা কারণে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ দেশের প্রথম ও প্রধান মেডিকেল কলেজ। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল দেশের অন্যতম প্রধান স্বনামধন্য, প্রাচীন ও সর্বোচ্চ স্তরের চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আওতায় বর্তমানে প্রায় ৬০টি ভবন রয়েছে। ২ হাজার ৬০০ বেডের সংকুলান থাকলেও গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার রোগী এই প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণের জন্য ভর্তি হয়।

্এছাড়া বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভ করছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ৪টি। এর মধ্যে ১৯৫৫ সালে ছাত্রদের জন্য নির্মিত হয় ডা. ফজলে রাব্বি হল। প্রায় ৭০০ জনের আবাসন ব্যবস্থা থাকলেও পুরোনো ও জরাজীর্ণ এই হলে বর্তমানে ধারণক্ষমতার চেয়ে কম শিক্ষার্থী থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

এরই মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর ডা. ফজলে রাব্বি হলের মূল ভবনের চারতলাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় সেখানে শিক্ষার্থীরা থাকেন না। ফলে নতুন ব্যাচে ভর্তিদের আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া ডা. মিলন ইন্টার্নি হোস্টেলে পোস্টগ্রাজুয়েট ইন্টার্ন ছাত্ররা থাকেন, যা চিকিৎসক তৈরির সূতিকাগার।