দেশের বিদ্যুৎ খাতে ও পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব, ইউনিট প্রতি বাড়ানোর প্রস্তাব ত্রিশ পয়সা
- আপডেট সময় : ০৯:৫৫:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- / ৪২ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে জ্বালানী তেলের দাম বেড়েছে। এবার বাড়ার অপেক্ষায় আছে বিদ্যুৎ। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে।কারণ, বিদ্যুৎ খাতে এডিবি’র কাছ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থ পেতে যাচ্ছে সরকার। সুতরাং শর্ত সাপেক্ষে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিকল্প কোন পথও খালি নেই।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো পিছনে সরকার যে যুক্তগুলো উপস্থাপন করতে যাচ্ছে তা হচ্ছে জ্বালানির আমদানি ব্যয়, ডলারের চাপ, ভর্তুকির বোঝা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর ভর্তুকির চাপ কমাতে মূল্যবৃদ্ধিকে একটি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে নতুন দামের প্রভাব পড়বে ঘরোয়া বিল থেকে শিল্পকারখানা—সবখানে।
পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও শিল্পখাতেও সমন্বয় আসতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। বাজারে পণ্যমূল্যের ওপর তার প্রভাব পড়া সময়ের ব্যাপার।
মধ্যবিত্ত পরিবার ইতিমধ্যেই খাদ্য, ভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হবে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল। গ্রামে সেচ ও ক্ষুদ্র শিল্পে খরচ বাড়লে কৃষিপণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে। শহরে ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়লে তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই সমাধানের জন্য জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ এবং সুশাসন জরুরি। কেবল মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়
কর্মজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকদের বড় অংশ নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মাসিক বাজেটে বিদ্যুৎ বিল একটি স্থায়ী খরচ। দাম ১৭–২১ শতাংশ বাড়লে গড় বিল কয়েকশ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জানা যায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুতের পাইকারি দামও চূড়ান্ত করে দিয়েছে। এ পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭-২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এমন কি দাম বাড়ানোর এ প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
এমন কি বিদ্যুৎ খাতে মূল্য সমন্বয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। বিইআরসি সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিশনের সভায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি।
বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি ইউনিটে দেড় টাকা বাড়লে বছরে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হবে। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়লে অতিরিক্ত আয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে। তবে পাইকারি পর্যায়ের এ মূল্যবৃদ্ধি খুচরা পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, মঙ্গলবার (৫ মে) নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) খুচরা পর্যায়ে আনুপাতিক হারে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসির কাছে জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই চার্জ আদায় করে প্রতিষ্ঠানটি।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৩ শতাংশই স্বল্প ব্যবহারকারী, যারা মাসে ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এ কারণে কম ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে মূলত ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানির দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ এপ্রিল নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হয়।
এ ছাড়া গত ৯ এপ্রিল পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের জন্য অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্টের চাপ তৈরি হয়ে সরকারের আর্থিক ব্যয় বাড়ে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
২০২২ সালের শেষ দিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে সরকারের হাতে নেওয়া হয়। দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি দাম না বাড়িয়ে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয় এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা আবার বিইআরসির হাতে ফিরিয়ে দেয়। তবে কিছু খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব হলেও তা সামগ্রিক সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট হয়নি। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে রেকর্ড ৫৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
যদিও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে খাতটির অপচয় ও অনিয়ম কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছে সরকারকে। তাদের মতে, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, সিস্টেম লস এবং উচ্চ ব্যয়ের চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন না করে বারবার দাম বাড়ালে এর চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই পড়বে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০ শতাংশ বাড়তি খরচ আছে। এসব খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো যেতে পারে। ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানোর অজুহাত পুরোনো। দাম বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এটি হলে আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো পার্থক্য থাকে না।
আবার অনেকে মনে করছেন এক সাথে দাম না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের বাড়ানো যেতে পারে। বর্তমানে বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা, খরচ ১২ টাকা। বাকিটা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।















