শেষ দশ মিনিটের চমকে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা
- আপডেট সময় : ০৪:৩৪:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
- / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
চরম নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ দেখলো ফুটবল বিশ্ব। ফুটবল ভক্তরা দেখলো পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনা কিভাবে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছাল। চলতি বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য আরেকটি প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল আর্জেন্টিনা। পিছিয়ে থেকে শেষ ইংল্যান্ডের হৃদয় ভেঙে খানখান করে দিলো বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। রোববারের ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে পারলে তারা হবে ইতিহাসের তৃতীয় দল, যারা টানা দুই বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি গড়বে।
১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই ব্যবধানে জিতেছিলো আর্জেন্টিনা। এবার মেসির নেতৃত্বে জিতলো সেমিফাইনালে। সেবার ইশ্বরের হাত দিয়ে ম্যারাডোনার গোল করা নিয়ে নানা গল্প লেখা হলেও এবার কিন্তু মেসির বাঁ পায়ের যাদুকরি দুই অ্যাসিস্টে দুই গোল দেখলো ফুটবল বিশ্ব। মেসিদের এমন চমক ইংলিশদের ফাইনালে উঠার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। বাড়লো আবারো ৬০ বছরের আক্ষেপ।

ম্যাচের ৮৪ মিনিট পিছিয়ে থেকে পরাজয়ের ঘন্টা প্রায় বেজে উঠেছিলো বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি মাইকেল গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়া ইংল্যান্ড যেন বিজয় উদযাপনের অপেক্ষায় ছিলো। স্তব্ধ হয়ে পড়া আর্জেন্টাইনদের স্বস্তিতে ফিরালেন এনজো ফার্নান্দেজের দারুন এক গোলে। সেখান থেকেই বদলে যেতে থাকে ম্যাচের সকল হিসাব নিকাষ।
ম্যাচের সময়ের দিকে যখন সবাই তাকিয়ে, ঘড়ির কাটাও যেন খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনি মেঘদূত হয়ে হাজির হলেন এনজো ফার্নান্দেজ। ৮৫ মিনিটের মাথায় মেসির অ্যাসিস্ট থেকে দূরন্ত এক শটে গোল করে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের স্বস্তিতে ফেরান। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে দূর্দান্ত শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন এই আর্জেন্টাইন। এরপর যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোল করে আর্জেন্টিনাকে আরেকটি স্মরণীয় জয় উপহার দেন লাউতারো মার্তিনেজ। ডান প্রান্ত থেকে মেসির বাঁ পায়ের ক্রস থেকে বল পেয়ে লাউতারো মার্তিনেজ হেডে ইংল্যান্ডের জালে জড়িয়ে দেন। শেষ মূহুর্তের চমকে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলের বিজয় উল্লাস করে।
চলতি বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে খুব একটা গণনায় ধরা হয়নি। মেসিদের ফুটবল লড়াইয়েও কেমন যেন একটা গা ছাড়া ভাব ছিল লক্ষণীয়। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই প্রত্যাশা জাগানো তেমন নৈপুন্য দেখাতে পারেনি তারা। নকআউটে বেশ ভুগতে হয়েছিলো। কেপ ভার্দে, মিশর এবং সুইজারল্যান্ড প্রত্যেকটি ম্যাচেই নাভিশ্বাস বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই দলটিই কিনা ফাইনালে! সুইসদের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ছিল আর্জেন্টিনার। ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে ছিলো লিওনাল স্ক্যালোনির শীর্ষরা। সেখান থেকে শেষ দশ মিনিটে অবিশ্বাস্য কামব্যাক সত্যি অনেকদিন মনে রাখার মতোই। আর এই বিজয় মনে করিয়ে দিলো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আজোঅব্দি হারেনি আর্জেন্টিনা।
প্রথম ৪৫ মিনিটে দুই দলের কেউই লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি। এমনকি শট নিতেও দেখা যায়নি কাউকে। দুই দলই একে অন্যের অর্ধে গিয়ে আক্রমণ চালালেও সুবিধা করতে পারেনি। দুই কিপারকেও বড় কোনো পরীক্ষা দিতে হয়নি। মাঝমাঠের পরিশ্রম আর মারামারি ফাউলের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল প্রথমার্ধভ
যদিও এই সময়ে আর্জেন্টিনা ৫৮ শতাংশ বল দখলে রেখেছিল। তাদের প্রধান তারকা লিওনেল মেসিও ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। পানি পানের বিরতির আগে তার ফ্রি কিক জর্ডান পিকফোর্ড পাঞ্চ করে কর্নার বানান। কর্নারেও শট নেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এনজো ফার্নান্দেজ পিকফোর্ডকে ফাউল করায় সেটি কাজে লাগেনি।

৩৩ মিনিটে বিপজ্জনক জায়গা থেকে ইংল্যান্ডের ফ্রি কিক ঠেকাতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। ডেক্লান রাইসের ফ্রি কিকে স্টোনসের হেড সাইড নেটে লাগে। দুই মিনিট পর ইংল্যান্ডের ফাইনাল থার্ডে তিন চারজন খেলোয়াড়ের বাধার মুখে পড়েন মেসি। এলিয়ট অ্যান্ডারসন তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জ করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন। ফ্রি কিক থেকে মেসির পাস ধরে ইংল্যান্ডের বক্স থেকে ফিরে আসা বলে শট নেন এনজো। ৩৯ মিনিটে তার শক্তিশালী শট অল্পের জন্য গোলবারের ওপর দিয়ে যায়। এভাবেই প্রথমার্ধের খেলা শেষ করে বিরতিতে যায় দুটি দল।। দ্বিতীয়ার্ধের খেলাটি ছিলো কেবলই ইতিহাস।
সমর্থকদের সাথে খেলোয়াড়দের উল্লাস
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা একটি রাজনৈতিক ব্যানার নিয়ে সমর্থকদের সঙ্গে জয় উদযাপন করেন, যেখানে লেখা, ‘লাস মালভিনাস (ফকল্যান্ডসের স্প্যানিশ নাম) আর্জেন্টাইনদের’। এভাবে আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে সম্ভবত ঝুঁকির মুখে পড়ল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধি অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের ভেতরে ‘রাজনৈতিক, আপত্তিকর এবং/অথবা বৈষম্যমূলক প্রকৃতির ব্যানার, পতাকা, প্রচারপত্র, পোশাক এবং অন্যান্য সামগ্রী’ নিষিদ্ধ। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে এনিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা মাঠ ছাড়েন। তার কিছুক্ষণ পরই ভক্তদের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করতে যান। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও জিওভানি লু সেলসো একটি ব্যানার নিয়ে হাজির হন। সেখানেই লেখা, ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টাইনদের।’ ব্যানার নিয়ে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা চিরকাল আর্জেন্টিনার থাকবে।’
দক্ষিণ আটলান্টিকের যে দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটিশদের কাছে ফকল্যান্ডস এবং আর্জেন্টাইনদের কাছে মালভিনাস নামে পরিচিত। এই দ্বীপের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮২ সালে এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে তাদের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত সংঘাত হয়েছিল। যাতে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সৈন্য এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ যোদ্ধা নিহত হন। ব্রিটেন শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে। দ্বীপপুঞ্জের অধিকাংশ বাসিন্দা বলেছেন যে, তারা ব্রিটেনের অংশ হয়েই থাকতে চান। কিন্তু আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে এই দ্বীপপুঞ্জ উত্তরাধিকারসূত্রে তাদেরই।
এখন দেখার অপেক্ষা ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধি লংঘনের কারণে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করা হয় কি না!

ম্যাচটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ও পরিসংখ্যান :
* আর্জেন্টিনা মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছাল। এর আগে তারা ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে এই কীর্তি গড়েছিল।
* ১৯৬৬ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল জেতার পর ইংল্যান্ড তাদের শেষ তিনটি সেমিফাইনালের (১৯৯০, ২০১৮ ও ২০২৬) প্রতিটিতেই হারল।
* আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালটি হবে বর্তমান উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান কনমেবল কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়নের মধ্যকার প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল।
* ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুটি গোলেই অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। চলতি বিশ্বকাপে এখন তার নামের পাশে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট রয়েছে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে গোল বা অ্যাসিস্ট করতে ব্যর্থ হলে মেসির প্রথমবারের মতো গোল্ডেন বুট জেতা একরকম নিশ্চিত।
* একুশ শতকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রথমে গোল করেও ফাইনালে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার মাত্র দুটি ঘটনা ঘটল। দুটিতেই পরাস্ত হওয়া দলের নাম ইংল্যান্ড— ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ও ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে।
* বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসি এখন পর্যন্ত সর্বকালের সর্বোচ্চ ৩৩টি (২১টি গোল ও ১২টি অ্যাসিস্ট) গোলে অবদান রেখেছেন। ২৫টি গোলে অবদান নিয়ে (২০টি গোল ও ৫টি অ্যাসিস্ট) তার ঠিক পরেই আছেন এমবাপে।
* এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই মেসি গোল বা অ্যাসিস্ট করেছেন এবং এখন পর্যন্ত টানা ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অন্তত একটি গোল বা অ্যাসিস্ট করার মাধ্যমে তিনি টুর্নামেন্টের আরেকটি অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।
* ইংল্যান্ডের গর্ডন তার শেষ চারটি বিশ্বকাপ ম্যাচে সরাসরি ৪টি গোলে সম্পৃক্ত ছিলেন।
* মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে তার পঞ্চম ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জিতেছেন, যা গতবার কাতারে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে জেতা পাঁচটি ম্যাচসেরার সম্মাননার সমান। ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনি এখন রেকর্ড ১৬টি ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কারের মালিক।
* ২০২২ বিশ্বকাপে গোল করতে ব্যর্থ হওয়া লাউতারো চলমান টুর্নামেন্টে এরই মধ্যে তিনটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন।
* এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত ১৯টি গোল করেছে— যা একুশ শতকে একটি নির্দিষ্ট বিশ্বকাপে যেকোনো দলের জন্য সর্বোচ্চ। শুধু তাই নয়, তারাও এর আগে কখনও কোনো আসরে এত গোল করতে পারেনি। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আসরে ১৯৩০ সালে দলটি ১৮টি গোল করেছিল।
* আর্জেন্টিনার ১৯টি গোলের মধ্যে ১২টি এসেছে ৭৫ মিনিটের পর। এর মধ্যে ৭৫ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হয়েছে ৮টি গোল আর ৪টি গোল এসেছে অতিরিক্ত সময়ে।





















