জ্বালানী সঙ্কটে সবচে বেশি ভুক্তভোগী গ্রামাঞ্চল, বন্ধ হয়ে পড়েছে ১৮ বিদ্যুৎ কেন্দ্র
- আপডেট সময় : ০৬:০৭:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
- / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের সর্বত্রেই জ্বালানী তেলের প্রভাব পড়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা থেকে শুরু করে কোন দিক বাদ থাকেনি।প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে যে জ্বালানী সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। যার ফলে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে যেখানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াট,সেখানে উৎপন্ন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ ১ হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে।
শহরের এই প্রভাব খুব একটা বেশি দেখা না গেলেও বিদ্যুতের এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে বেশি গ্রামাঞ্চলে। তীব্র গরমে গ্রামাঞ্চলের জনজীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। মূলত চলতি বছরে গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত জ্বালানি পণ্যের সাপ্লাই চেনে ব্যাঘাত ঘটে। ফার্নেস তেল, কয়লার মূল্য বেড়ে যাওয়া এবং এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সংকটে ভুগছে দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ফার্নেস তেলের দাম বাড়িয়েছে, তবুও সহসাই সংকট কাটছে না। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সাধারণত ব্যয়বহুল।তবে বিদ্যুতের দাম কমাতে গ্যাসের মাধ্যমে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চাইছে, যা তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
লোডশেডিংয়ের চিত্র
দেশে অবস্থিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩২ মেগাওয়াট, যেখানে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৫২ মেগাওয়াট। একই দিনে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) চাহিদা চলে গিয়েছিল ১৫ হাজার ৭২২ মেগাওয়াটে, যার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সোমবার (২০ এপ্রিল) সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
বিপিডিবির গত ১৬ এপ্রিলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেওয়া যায়, মোট উৎপাদনের বিপরীতে লোডশেডিং করা হয়েছে ১৪৮২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ঢাকায় সবচাইতে বেশি, ৩৬০ মেগাওয়াট লোডশেডিং। এছাড়া চট্টগ্রামে ১২০ মেগাওয়াট লোডশেডিং, খুলনায় ৩১৯ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১৯৫ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ২১০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ২৫ মেগাওয়াট, বরিশালে ৯৫ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং করা হয়েছে। সার্বিক হিসেবে ঢাকার বাইরে লোডশেডিং হয়েছে ১১২২ মেগাওয়াট।
জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটা প্রভাব পড়ছে, তবে আমরা আশা করছি লোডশেডিং বড় আকারে হবে না। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্দিষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে
এদিকে ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্যানুসারে, ১৮ এপ্রিল দিনের শুরুতে সকাল ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট। তার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৫৯৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সে সময় লোডশেডিং করা হয়েছে ৮০৫ মেগাওয়াট। একইভাবে সকাল ৭টায় ১২৫৫ মেগাওয়াট, ৮টায় ৬৪৩ মেগাওয়াট, ৯টায় ৩৬০ মেগাওয়াট, ১০টায় ২০৯ মেগাওয়াট, বেলা ১১টায় ৬৭৯ মেগাওয়াট, দুপুর ১২টায় ১১০৬ মেগাওয়াট, ১টায় ১০৩৬ মেগাওয়াট, ২টায় ৮৪৪ মেগাওয়াট, বিকেল ৩টায় ৫৬২ মেগাওয়াট, ৪টায় ১৬৮ মেগাওয়াট, ৫টায় ১২৭ মেগাওয়াট, সন্ধ্যা ৬টায় ১১৮ মেগাওয়াট, ৭টায় ১২৮ মেগাওয়াট, রাত ৮টায় ১৪২ মেগাওয়াট, ৯টায় ৭৪ মেগাওয়াট, ১০টায় ১৪১ মেগাওয়াট, ১১টায় ৪৫১ মেগাওয়াট, ১২টায় ৭৩৩ মেগাওয়াট, রাত ১টায় ৮১৪ মেগাওয়াট, ২টায় ৮৯৮ মেগাওয়াট, ৩টায় ৯৫৩ মেগাওয়াট, ৪টায় ৯১৪ মেগাওয়াট ও ভোর ৫টায় ৬৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ কখন যায় কখন আসে বোঝা যায় না। এখনো সেভাবে গরম শুরু হয়নি, অথচ তার আগেই যেভাবে দিনে ৭-৮ বার লোডশেডিং হচ্ছে, তা অনেকটা অসহনীয়। এতে কৃষি কাজের পাশাপাশি বাড়ির দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল ঢাকা ও বরিশালে কোনো লোডশেডিং হয়নি। তবে চট্রগ্রামে ৯৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং, কুমিল্লায় ১১০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১০০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৩০ মেগাওয়াট, খুলনায় ১৪৫ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১১০ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৫৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।
জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা দুইভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চল গ্রিডের অধীনে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেট এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের অধীনে রয়েছে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর।
পিজিসিবির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের চাইতে পূর্বাঞ্চল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক বেশি। ১৮ এপ্রিল পূর্বাঞ্চল গ্রিডে ১০ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই সরবরাহ করা হয়েছে ৫৬১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৪২৫ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ১৩৭৮ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১০১৯ মেগাওয়াট ও সিলেটে ৫৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
বর্তমানে রংপুর বিভাগে চাহিদা ৯০০ মেগাওয়াট। আমরা চাহিদার তুলনায় ২৫-৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি, অর্থাৎ ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে খুব একটা লোডশেডিং হচ্ছে না
সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ ঢাকার বিদ্যুতের চাইতেও কম। ১৮ এপ্রিল ওয়েস্টার্ন গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে ৪২৯৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে খুলনায় ১৭৫৪ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৮৮ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১৪৯১ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৫৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি
ঢাকার চাইতে গ্রামের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। দিনের ৬ থেকে ৮ বারের লোডশেডিংয়ে গড়ে প্রতিদিন ৪-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি প্রভাব পড়েছে কৃষি কাজে, ছোট ছোট কলকারখানাগুলোতে।
রংপুর বিভাগে বর্তমানে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ঘাটতি ১৫-২০ মেগাওয়াট। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রংপুরে এখনো সেভাবে লোডশেডিং শুরু হয়নি। আমরা গ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
এদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধে সময় নির্ধারণ করলেও তা সরকারি তদারকের অভাবে প্রতিপালন করছেন না। রংপুরসহ আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোতে রাত ৯টার পরও দোকানপাট, বিপণি বিতান খোলা রাখা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। রংপুর বিভাগে বর্তমানে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ঘাটতি ১৫-২০ মেগাওয়াট।
জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র
দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। তবে বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র ৮টি। এছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে ২টি।
বন্ধ থাকা ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হলো—
গ্যাসভিত্তিক : ঘোড়াশাল রিপাওয়ারড ইউনিট ৪, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট ৫, ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল ১০৮ মেগাওয়াট, মেঘনাটঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৫৮৩ মেগাওয়াট, জেরা মেঘনাঘাট ৭১৮ মেগাওয়াট, বাঘাবাড়ী ৭১ মেগাওয়াট, সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট।
তেলভিত্তিক : গাগনগর ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট, জুলদাহ ১০০ মেগাওয়াট, জুলদাহ ২ ইউনিট ১০০ মেগাওয়াট, জঙ্গলিয়া ৫২ মেগাওয়াট, ফেনী লঙ্কা পাওয়ার, রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট, নাটোর ৫২ মেগাওয়াট।





















