সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
- আপডেট সময় : ০৮:৪০:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
- / ৪৮ বার পড়া হয়েছে
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করে হত্যা এবং একই দিনে আরও একজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে আদালত উল্লেখ করেছেন, অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড ছিল রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে বেসামরিক জনগণের ওপর পরিচালিত ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলার’ অংশ, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে।
ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে গত ২৮ জুন সংক্ষিপ্ত রায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরেকজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে আপিলের জন্য আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ শুরু হলো।
রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় আন্দোলনরত নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা হয়। বিশেষ করে একটি ভবনের কার্নিশে প্রাণ বাঁচাতে ঝুলে থাকা এক তরুণকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা এবং একই দিনে আরও একজনকে হত্যার বিষয়টি ভিডিও, আলোকচিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আদালতের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত আক্রমণের অংশ।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ করেন, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালন না করে বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। আদালত বলেন, কমান্ড চেইনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি অধস্তন সদস্যদের কর্মকাণ্ডের দায়ও এড়াতে পারেন না। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ নীতিও প্রযোজ্য হয়েছে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রসিকিউশন ভিডিও ফুটেজ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, চিকিৎসা প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য নথিপত্রের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিপক্ষের যুক্তি ও সাক্ষ্য প্রমাণসমূহ অভিযোগ খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট নয় বলেও আদালত মত দেন।
মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়ার পর তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরে অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এখন নিয়ম অনুযায়ী দণ্ডিতরা আপিল বিভাগের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ পাবেন। আপিল নিষ্পত্তির পরই রায় কার্যকরের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে মামলাটির বিচারিক ভিত্তি ও ট্রাইব্যুনালের আইনি বিশ্লেষণ স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





















