মেসিদের এবার ফাইনালে ওঠার লড়াই, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড
- আপডেট সময় : ০৮:০৭:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
- / ৪৭ বার পড়া হয়েছে
আর মাত্র কয়েক ঘন্টা। রাত একটাতেই আরেকটি ফাইনালে উঠার লড়াই। ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি। লড়াইয়ে মঞ্চ যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা স্টেডিয়াম। দুই দলের সমর্থকদের ভীড় সেখানে। এ লড়াইয়ে যারাই জিতবে ট্রফির একেবারেই কাছাকাছি পৌছে যাবে তারা। আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের সেই ফাইনাল যুদ্ধ। সে লড়াইয়ে স্পেনের বিপক্ষে ট্রফি জয়ের জন্য লড়াই করবে কারা,রাতেই এর ফয়সালা হয়ে যাচ্ছে।
আর্জেন্টিনা না ইংল্যান্ড, সবার মধ্যে চলছে এখন সে হিসেব-নিকেষ। তবে আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ড ম্যাচটি যেন একটি ম্যাচের ভিতরই সীমাবদ্ধ থাকছে না। মেক্সিকো ১৯৮৬, ফ্রান্স ১৯৯৮, জাপান ২০০২….বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াইয়ে মনে করিয়ে দেয় ইতিহাস, আবেগ ও স্মৃতিতে ভরপুর এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা। যদিও ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত শুধু ফুটবল, ফকল্যান্ডস (মালভিনাস) যুদ্ধ নয়।
আর তাই ইংল্যান্ড দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে ফেলে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মধ্যে ভিন্ন কে প্রতিক্রিয়া কাজ করে। একটা প্রতিশোধ ভাব জেগে উঠে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ডস দ্বীপ দখল করে নেয় ইংলিশরা। সেই যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার বীজ যেন এখনো চেপে আছে আর্জেন্টাইনরা।
৭৪ দিন ধরে ফকল্যান্ড যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। যুদ্ধে জয় পায় যুক্তরাজ্য। এর প্রায় ৩০ বছর পর ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে বসবাসকারীদের মধ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাসিন্দা গণভোটে ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন। যদিও সেই ভোট নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে, অন্যদিকে ব্রিটেন থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার মাইল। ঐতিহাসিক সূত্র ধরে আর্জেন্টিনা স্থানীয় নামের মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জকে তাদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে আসছে। অন্যদিকে, ১৮৩৩ সাল থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে শাসন করে আসছিল ব্রিটেন। দ্বীপের বাসিন্দারাও ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত।
আর তাই আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ডের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচ হতেই সামনে চলে আসে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। কোয়াটার ফাইনালের পর মেসিদের বিজয়উদাপনে তার নির্দশন দেখা গেছে। সে না হয় অন্য হিসাব। কিন্তু বর্তমানে দু’দলের ফুটবল শক্তি কি বলছে সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টজুড়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার পর নকআউটে কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নেয় লিওনেল স্কালোনির দল। অন্যদিকে ইংল্যান্ডও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর নকআউটে ডিআর কঙ্গো, মেক্সিকো ও নরওয়েকে বিদায় করে সেমিফাইনালে উঠেছে থমাস টুখেলের শিষ্যরা।
পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলের লড়াই বরাবরই হাড্ডাহাড্ডি। সব মিলিয়ে ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ইংল্যান্ডের জয় ৬টি, আর্জেন্টিনার ২টি এবং ড্র হয়েছে ৬টি। বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে তারা। সেখানে ইংল্যান্ডের জয় ৩টি এবং আর্জেন্টিনার জয় ২টি। সর্বশেষ বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০২ সালে, যেখানে ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জয় পেয়েছিল।
বর্তমান ফর্মের বিচারে আর্জেন্টিনা কিছুটা এগিয়ে। এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৭ গোল করেছে আলবিসেলেস্তেরা। অধিনায়ক লিওনেল মেসি করেছেন ৮ গোল, যা গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে শীর্ষে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সমান। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম দুজনই করেছেন ৬টি করে গোল—বিশ্বকাপ ইতিহাসে একই দলের দুই খেলোয়াড়ের এক আসরে ৬ বা তার বেশি গোল করার বিরল কীর্তি এটি।
ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে বলেন, “এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ। আমরা একটি দুর্দান্ত দলের বিপক্ষে খেলব, যাদের একজন অসাধারণ কোচ রয়েছে। এটিকে অন্য কিছুর রূপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।” একই সঙ্গে তিনি জানান, দল শেষ বিন্দু শক্তি দিয়ে লড়বে।
ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেলও অতীতের ইতিহাস নয়, বর্তমানের লড়াইটিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা পরবর্তী ধাপে যেতে চাই। সেমিফাইনালে এসেই কেউ সন্তুষ্ট নয়। আমরা ক্ষুধার্ত, প্রস্তুত এবং নিজেদের সেরাটা দিতে চাই।” তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে প্রেরণা হিসেবে নয়, বরং নিজেদের ফুটবলের ওপরই ইংল্যান্ডের বিশ্বাস।
আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি ম্যাচের আগে বলেন, “আমাদের সামনে কঠিন প্রতিপক্ষ। তাদের দারুণ কোচ আছে। এটি একটি ফুটবল ম্যাচ, এর বেশি কিছু নয়।” অন্যদিকে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন জানিয়েছেন, দল এখন শুধু ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়েই ভাবছে এবং বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে তারা প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাচটি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মাঝমাঠের লড়াই। একদিকে মেসির সৃজনশীলতা, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের আক্রমণভাগ; অন্যদিকে কেইনের ফিনিশিং, বেলিংহ্যামের বক্স-টু-বক্স উপস্থিতি এবং ইংল্যান্ডের সংগঠিত রক্ষণ—সব মিলিয়ে দুই দলের শক্তির পার্থক্য খুবই সামান্য। অপ্টার সুপারকম্পিউটারও ইংল্যান্ডকে মাত্র ৫১.৯ শতাংশ সম্ভাবনায় এগিয়ে রেখেছে।
দীর্ঘ ইতিহাস, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে আটলান্টায় আজকের লড়াই বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ হওয়ার সব উপাদানই বহন করছে। যে দল চাপ সামলে নিজেদের পরিকল্পনা কার্যকর করতে পারবে, তারাই স্পেনের বিপক্ষে শিরোপা লড়াইয়ের টিকিট নিশ্চিত করবে।
যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল!
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক কয়েক মিনিটকে স্মরণ করলেন বর্তমান আর্জেন্টাইন দলের মিডফিল্ডার ডি পল। যদিও তার বহুল আলোচিত ‘হ্যান্ড অব গড’খ্যাত গোলটি একইসঙ্গে বিতর্কিতও। মাথায় নাগাল না পেয়ে হাতের ছোঁয়ায় তিনি টেক্কা দিয়েছিলেন ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে। অথচ এরপর ম্যারাডোনা চার ফুটবলারকে কাটিয়ে অনেকদূর দৌড়ে গিয়ে করেছিলেন শতাব্দীর সেরা গোলটি। সৌন্দর্য ও বিতর্কিত অধ্যায় যেন একসঙ্গে লেখা হয়ে গেল!
ম্যাচ শেষে আলবিসেলেস্তে ফুটবল-ইশ্বর রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘হয়তো এটা ঈশ্বরের হাত ছিল।’ পরে আবার বলছিলেন, ‘ইংরেজদের পকেট মারার মতোই ভালো অনুভূতি হচ্ছে।’ এ ছাড়া অনেকে এটিকে চার বছর আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের প্রতি প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখলেও, ২০১৪ সালে ভেনেজুয়েলার টেলিভিশনে কাজ করার সময় ম্যারাডোনা যুদ্ধটিকে ‘দুটি খুনি সরকারের সাজানো অর্থহীন যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেন।
২১ বছর আগে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দুই জায়ান্ট দলের। ২০০৫ সালে প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের ৩-২ ব্যবধানে জয়ের পর আর কখনও মুখোমুখি হয়নি তারা। আর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের দেখা হতে যাচ্ছে ২৪ বছর পর। দুই দলের ইতিহাসে রয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় ও বিতর্কিত অধ্যায়।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথের আলোচিত ঘটনা
ম্যারাডোনার স্মরণীয় অধ্যায়ের আগে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ওয়েম্বলিতে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক অ্যান্তোনিও রাত্তিনকে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে মাঠ থেকে বের করে দেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রিটলিন। রাত্তিন রেফারির ভাষা বুঝতে না পেরে একজন দোভাষীর দাবি জানান এবং ওই ঘটনায় লেগে যায় প্রায় ১০ মিনিট। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত পুলিশ মাঠে নেমে তাকে বাইরে নিয়ে যায়। এ ঘটনাই পরবর্তীতে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
১৯৭৭ সালে বুয়েন্স আয়ার্সের লা বোম্বোনেরায় অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ম্যাচে ঘটে আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা। ম্যাচ শেষ হওয়ার সাত মিনিট আগে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরি পেছন দিক থেকে কড়া ট্যাকল করেন আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল বার্তোনিকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বার্তোনি উঠে দাঁড়িয়ে চেরির মুখে সরাসরি ঘুষি মারেন। ঘুষিতে চেরির সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়। পরে দুজনকেই লাল কার্ড দেখানো হয়।
২৪ বছর আগে দুই দলের সর্বশেষ দেখায়ও ছিল বিতর্ক, তবে এবার সুবিধা পেল ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধের শেষদিকে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মরিসিও পচেত্তিনো ইংলিশ ফরোয়ার্ড মাইকেল ওয়েনকে বক্সে ফাউল করেছেন বলে সিদ্ধান্ত দেন ইতালিয়ান রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করেন ডেভিড বেকহ্যাম। সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতে নকআউট পর্বে ওঠে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
তবে ইংল্যান্ডকে আর্জেন্টিনা চূড়ান্ত পরাজয়ের স্বাদ দেয় ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। ম্যারাডোনার বিতর্কিত ও বিখ্যাত দুই গোলে ভর করে ২-১ ব্যবধানে জেতে আর্জেন্টিনা। এক সপ্তাহ পর আলবিসেলেস্তেরা নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের উৎসবে মাতে। বিতর্কিত গোল নিয়ে পরে ম্যারাডোনা জানান, ‘নিজের মাথার একাংশ ও আরেকাংশে ছিল ইশ্বরের হাতের স্পর্শ’! ম্যাচ রেফারি আলি বিন নাসেরও সেখানে কোনো অপরাধ দেখেননি এবং গোলের স্বীকৃতি দেন। ম্যারাডোনা উদ্যাপনে মেতে ওঠেন, আর ক্ষোভে ফেটে পড়েন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা।
দুই দলের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বাধিক আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। খেলার প্রথমার্ধ শেষে স্কোর ছিল ২-২। ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করেন অ্যালান শিয়েরার ও মাইকেল ওয়েন। আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও হাভিয়ের জানেত্তি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দিয়েগো সিমিওনের ফাউলের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তাকে লাথি মারেন ডেভিড বেকহ্যাম। যার সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখান রেফারি। এরপর ১০ জন নিয়েও ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। যেখানে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টারে ওঠে।





















