সংকটে ওষুধ শিল্প: জনস্বাস্থ্যের জন্য এক হুমকি
- আপডেট সময় : ০৮:১৭:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ৫১ বার পড়া হয়েছে
- মুন্সীগঞ্জের এপিআই (API) ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক এই খাতের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে৷
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিশ্ববাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হলেও, বর্তমানে এটি গভীর কাঠামোগত ও নীতিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো সময়মতো মোকাবিলা করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা মানবাধিকারের অন্যতম মৌলিক শর্ত। অথচ, বর্তমান অর্থনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এই মৌলিক অধিকারটিই এখন চরম অনিশ্চয়তা ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটের মূল কারণ:
উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (BAPI)-এর তথ্য অনুযায়ী, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (API), প্যাকেজিং সামগ্রী এবং জ্বালানির তীব্র সংকট উৎপাদন খাতকে কোণঠাসা করে ফেলেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট:
কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে উৎপাদনকারীরা বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে ওষুধ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।
মূল্য সমন্বয়ে স্থবিরতা: উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ওষুধ কোম্পানিগুলো কিছু ওষুধের দাম সমন্বয়ের আবেদন জানিয়েছিল, কিন্তু নীতিগত জটিলতার কারণে তা সময়মতো অনুমোদিত হয়নি। এছাড়া, নতুন জীবন রক্ষাকারী ও সাধারণ ওষুধের বিপণন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়াও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।
আমদানি ও মুদ্রা বাজারের চাপ: যদিও এই শিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে, তবুও এর প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ব্যাংকিং খাতে লেটার অফ ক্রেডিট (LC) খোলার জটিলতা এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে কাঁচামাল সময়মতো আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও ইনজেকশন উৎপাদনের ওপর।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব এবং সরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা
ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধ শিল্পের এই সামগ্রিক সংকট দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধের বাজেট ও বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় এমনিতেই সীমিত। এর ওপর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট যুক্ত হওয়ায় প্রায়শই বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন বা জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশনের তীব্র ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
এর ফলে অসহায় রোগীরা চড়া দামে খোলা বাজার বা অন্য উৎস থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলছে। বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো কোনোমতে টিকে থাকার লড়াই চালালেও, অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান (SME) উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বিদেশি নির্ভরতা এবং জিএমপি (GMP) পরিপালন
আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করার পাশাপাশি, বাংলাদেশ বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা এপিআই (API)-এর ক্ষেত্রে দেশটি প্রায় পুরোপুরি বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
কাঁচামালের উৎস:
বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামালের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই আসে চীন ও ভারত থেকে। এছাড়া, অত্যন্ত জটিল অণু (complex molecules) এবং বিশেষায়িত রাসায়নিক উপাদানগুলো জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিভিন্ন পশ্চিমা ও উন্নত দেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
মান নিয়ন্ত্রণ:
ওষুধের নিরাপত্তা ও গুণমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস’ (GMP) নির্দেশিকা এবং ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়া (BP) ও ইউনাইটেড স্টেটস ফার্মাকোপিয়া (USP)-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো কঠোরভাবে পরিপালন করা হচ্ছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এই মানদণ্ডগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি বজায় রাখে।
আশার আলো:
এপিআই (API) ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও এর সম্ভাবনা এই বহুমুখী সংকট থেকে টেকসই উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করা। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় পূর্ববর্তী সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘এপিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ (API Industrial Park) এই খাতের ভাগ্য বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পার্কটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে তা দেশের মোট কাঁচামালের চাহিদার অন্তত ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করতে সক্ষম হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি বছর কাঁচামাল আমদানির পেছনে প্রায় ১৩,০০০ থেকে ১৫,০০০ কোটি টাকা (১.৩ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয় করে। এপিআই পার্কটি পুরোপুরি কার্যকর হলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
দুর্ভাগ্যবশত, গ্যাস সংযোগে বিলম্ব, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (CETP) নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তার অভাবের কারণে এই সম্ভাবনাময় প্রকল্পের সুফল এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
মানুষের জীবন নিয়ে কোনো বাণিজ্য নয়
একটি মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে ওষুধ শিল্প ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল খাতগুলোকে কখনোই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা বাজারের নির্মম মুনাফালোভী আচরণের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে, কারখানাগুলোকে পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা, এলসি (LC) প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং এপিআই পার্কে বিদ্যমান অবকাঠামোগত বাধাগুলো অবিলম্বে দূর করা জরুরি। তা না হলে জাতীয় অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক অধিকার সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে।




















