অটো রিকসায় গলায় ফাঁস, বেকায়দায় সরকার
- আপডেট সময় : ১২:১৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৫১ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা শহরের সবচেয়ে সহজ আয়ের পথ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। গ্রাম থেকে প্রতিনিয়ত লোকজন ছুটে এসে অটোরিকশার হ্যান্ডেল ধরে বসেছে। রাস্তা-ঘাট চেনা নাই কিন্তু দাম হাঁকাচ্ছে যেনতেন। প্রশ্ন হচ্ছে হঠাৎ ঢাকায় কেন এতো অটোরিকশা? কেউ কেউ বলছেন রাজনৈতিক চাপে বিরোধী দলের স্থানীয় নেতারা নিজেকে নিরাপদে রাখা এবং আয়ের সহজ বিকল্প পথ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি যখন-তখন আবার আন্দোলনে মাঠও চাঙ্গা করা যাবে। ঢাকা বাসিদের মতে, যে কারণেই হোক না কেন এটি এখন খুবই বিপদ জনক একটি পরিবহন হয়ে উঠেছে। হঠাৎ কারো গায়ের উপর উঠিয়ে দেয়া, প্রাইভেট কার এই বাহনগুলোর কাছে যেন বড়ই অসহায়। একটু খোঁচা লাগলেই প্রাইভেট কারের বিশাল ক্ষতি। এমন কি সাধারণ মানুষও এই অটোরিকশার যন্ত্রনায় স্বাভাবিকভাবে রাস্তা পারাপার হতে পারছেন না। গলির রাস্তা ছাড়িয়ে অটোরিকশায় মহাসড়কও দখল করে নিয়েছে। বাধাতেও মানছে তারা।
কথায় কথায় আন্দোলনের কর্মসূচির ডাক দিচ্ছে অটোরিকশা চালকরা। এলার্জির মতো ছড়িয়ে পড়েছে শহরে সর্বত্রে। প্রতিনিয়ত র্যাপিড গতিতে বাড়ছে। এদের একটি বিশাল সিন্ডিকেটও ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে। অটো রিকসা রাখতে গেলে গ্যারেজে টাকা দিতে হয়। তাদের আবার বিশাল লাভ। এই সিন্ডিকেটের অংশ নাকি আবার সরকার দলের স্থানীয় নেতারা নিয়ন্ত্রন করছেন। শুধু রিকশা রাখার ভাড়াতেই নাকি লাখ লাখ টাকা উঠে। আবার মাঝেমধ্যে দেখা যায় পুলিশি অভিযান। সেগুলোও ছড়ানোর জন্য এক ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করে। আফতাব নগরের পুলিশ ফাঁড়িতে অসংখ্য অটোরিকসা দেখতেই জৈনিক রিকশা চালকের কাছ থেকে জানা যায়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে অটো রিকশা তুলে নিয়ে গেলেও সেগুলো আবার অর্থের বিনিময়ে ছেড়েও দেওয়া হয়।
তাই জনমনে প্রশ্ন ছেড়েই যদি দেওয়া হয় তাহলে কেনই বা ধরা হয়। এটি এক ধরনের পিংপল পিংপল খেলার মতোই। তবে রিকশা-পুলিশ খেলায় সরকারের কিন্তু নাজেহাল। কঠিন চাপে আছে বিএনপি সরকার। অটোরিকসার চাপে রীতিমতো সরকারের গলায় ফাঁস।
এরই মধ্যে আজ সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ এমপি যে তথ্য তুলে ধরেছেন তা ছিলো আরো ভয়াবহ। সারা দেশে প্রায় ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে সরকারকে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকাতেই অটোরিকসার পরিমান প্রায় অর্ধশতাধিক। বিপুল সংখ্যত এই অটোরিকশা ৩ হাজারেরও বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট থেকে চার্জ হওয়ায় সরকার বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন চলাকালে ৭১ বিধিতে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার বিষয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানুর এক নোটিশের জবাবে এমনটা জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি হুইলারের দৈনন্দিন যে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, তা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ। এর বেশিও হতে পারে। বিপুল এই চাহিদার বিপরীতে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। অন্যদিকে শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং অবৈধ অনুমোদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক পিলার থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে সেটি চার্জিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের রাজস্বের ক্ষতি, অন্যদিকে দুর্নীতি হচ্ছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগ-সিটি করপোরেশনের লোকজন জড়িত। যারা ব্যবহার করছে, তারা তো ব্যবহার করছেই। সুতরাং, আমাদের ইমানদারিত্ব বজায় রাখতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গত এক দশকে দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক ৩ চাকার যানবাহন নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম ভাড়া, সহজলভ্যতা ও স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার কারণে এসব যান সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে চালক, মালিক, গ্যারেজ মালিক, গ্যারেজ শ্রমিক, ব্যাটারি ও খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, চার্জিং সেবাদাতা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এই খাত একটি বিস্তৃত অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। তবে দ্রুত ও অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে এই খাতটি এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যানজট, পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিপুল সংখ্যক যান একযোগে চার্জ দেয়ার ফলে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ, অননুমোদিত বা আবাসিক সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফর্মার ও বিতরণ লাইনের উপর বাড়তি লোড এবং পিক সময়ে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে যানবাহনগুলোর বড় অংশে ব্যবহৃত লেড এসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং, শিসা দূষণ, মাটি ও পানি দূষণ এবং বিশেষ করে শিশু ও শ্রমিকদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে সবদিক বিবেচনা করে সরকার নীতিমালা ও বিধি প্রণয়ন করেছে। শিগগির তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার বেশকিছু দিক বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে- চালক নিয়ন্ত্রণ, রোড নির্ধারণ, পরিবেশ উপযোগী ব্যাটারি ও রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি চালু করা ইত্যাদি। এ সময় বিকল্প ও বেকারত্বের বিষয়টি মাথায় রেখে সবকিছু বিবেচনা করে এ বিষয়ে নীতিমালা ও বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুমোদনের পর এর আলোকে অটোরিকশার নিবন্ধন রোড নির্ধারণ, চালক নিয়ন্ত্রণ, চলাচল ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে গ্রহণ করা হবে। এর মাধ্যমে রাজধানীর যানজট নিরসন, সড়ক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তিনি জানান, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বর্তমানে রাজধানীর ১৭টি সিগনালে ৫০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সিগনালগুলোয় অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। এরই ধারাবাহিকতায় ট্রাফিক রমনা, তেজগাঁও বিভাগে আরও ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়েও এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।




















