নাটকীয়,অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনা,বিদায় মিশর
- আপডেট সময় : ০১:২৭:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
- / ৫৪ বার পড়া হয়েছে
Argentina players toss teammate Lionel Messi (10) into the air as they celebrate after the World Cup round of 16 soccer match between Argentina and Egypt in Atlanta, Tuesday, July 7, 2026. (AP Photo/Jacob Kupferman)
কাঁদলেন মেসি৷ ঠিক আগের দুই রাতে যেমন কেঁদেছিলেন নেইমার ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো৷ তবে এই আর্জেন্টাইন সুপার স্টারের চোখের পানিতে ছিল না কোন হতাশা, কিংবা রাগ-অনুরাগ৷ এতে মেসি আবারো মনে করিয়েদিলেন সব কান্নাই শুধু কষ্টের হয় না, কিছু কান্না সুখেরও হয়৷
কাঁদবেই বা না কেন? প্রায় আশি মিনিট দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোলের জয়! সত্যি এ যেন এক ম্যাজিক্যাল কামব্যাক। অবিশ্বস্য প্রত্যাবর্তন। এমন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা যে কেবল মেসিকে ঘিরেই সম্ভব! যদিও পেনাল্টি মিস করে মেসি নিজেও ছিলেন হতাশায়। তবে শেষ বারো মিনিটে মেসিদের ম্যাজিকে মিশরের জাল কেঁপে উঠলো রোমেরো ৭৯, মেসি ৮৪ এবং ফার্নান্ডেজ ৯০ মিনিটের যোগ করা সময়ে টানা তিন গোলে করে।
তাতে জমাট বাধা রাজ্যের হতাশার মেঘ কেটে যায়, নেচে উঠে তারা আনন্দ- উল্লাসে। জীবন ফিরে পাওয়া ম্যাচের আনন্দটাই হলো অনেকটা শিরোপা বিজয়ের মতোই। সতীর্থরা ঘিরে ধরে মেসিকে ছুড়ে মারলেন আকাশে। একবার দুবার নয়, বেশ কয়েকবার। একতাবদ্ধ হয়ে মাঠে করলেন আনন্দ উদযাপন।


অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটলান্টাতে শেষ ষোল’র এই লড়াইয়ের গল্পের শুরুটাই ছিলো ভিন্ন । মেসির পেনাল্টি মিসের রেকর্ডের সাথে আর্জেন্টিনার ট্রেজেডির গল্পটাই ছিলো এগিয়ে। মোহাম্মদ সালাহ নেতৃত্বাধীন মিশর শুরুতেই আক্রমনাত্মক ফুটবল খেলে যেভাবে চেপে ধরেছিল আর্জেন্টিনাকে,তাতে বিকল্প ভাবনাটাই ছিলো দু:স্বপ্নের মতোই।


শুরুতেই বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের ভয় ধরিয়ে দিলেন মিশরের ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম। পনের মিনিটেই তার করা গোলে মিশর ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায়। মিশরীয় ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম ডি-বক্সের মাঝখান থেকে দুর্দান্ত এক হেড করেন। বলটিকে পোস্টের ডানদিকের নিচের কোণ দিয়ে জালের ভেতরে পাঠান তিনি। কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে ক্রস বাড়িয়ে এই গোলটিতে অ্যাসিস্ট করেন মারওয়ান আতিয়া।
ছয় মিনিটের ব্যবধানে গোল শোধের দারুণ এক সুযোগও পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি মেসি। ২১ মিনিটের সময় সমতায় ফেরার সেই সুযোগ মিসের পর বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
তাগলিয়াফিকো মিশরের বক্সের মধ্যে ফাউলের শিকার হন। ২১ মিনিটে মেসি পেনাল্টি কিক নেন। তার বাম পায়ের শট বাঁ দিকে ডাইভ দিয়ে ফিরিয়ে দেন মোস্তফা শোবেইর। বিশ্বকাপে নেওয়া মোট ৮টি পেনাল্টির মধ্যে ৪টিই মিস করলেন মেসি। চলতি বিশ্বকাপে এটি তার দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। এর আগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পেনাল্টি গোল করতে পারেননি তিনি। মেসি শটটি গোলরক্ষকের বাঁ দিক ঘেঁষে নিলেও তাতে যথেষ্ট গতি ছিল না। মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা সঠিক উচ্চতায় থাকা বলটিকে দারুণভাবে প্রতিহত করেন।
অন্যদিকে মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফার জন্যও এটি চলতি টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় পেনাল্টি সেভ। এর আগে গ্রুপ পর্বে ইরানের তারেমির পেনাল্টিও তিনি একইভাবে আটকে দিয়েছিলেন।
২৮ মিনিটে আরেকবার আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে দেন মোস্তফা। রদ্রিগো ডি পলের ক্রসে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড ডানদিকে ঝুঁকে রুখে দেন তিনি। ১০ মিনিট পর মেসির বাঁ পায়ের শট গোলবারের অনেক উপর দিয়ে যায়। পরের মিনিটেই তাগলিয়াফিকোর কাটব্যাক থেকে বল পেয়ে আলভারেজ শট নেন। এটিও বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল রুখে দেন মোস্তফা।
বিরতি পরেই আর্জেন্টিনা শুরুতেই আক্রমনে যায়। মিসরের রক্ষণভাগে ৯ জন খেলোয়াড় একদম জমাট বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। মেসি শেষ পর্যন্ত কিছুটা জায়গা তৈরি করে রদ্রিগো ডি পলকে বল বাড়িয়ে দেন। কিন্তু ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া ডি পলের নিচু শটটি মিসরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা সহজেই গ্লাভসবন্দী করেন।

কিন্তু কাউন্টার অ্যাটাকে হাসানের বাড়ানো পাস ধরে মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান জিকো যদিও আক্রমণের শুরুর দিকে ফাউল হওয়ার কারণে গোলটি বাতিল করা হয়। যদিও হাসানের চমৎকার দৌড়ে সালাহর পাস এবং জিকোর ফিনিশিং মিলিয়ে এটি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হতে পারতো। এই গোল মিস হলেও আরেকটি কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সেই মোস্তফা জিকোই গোল করেন। একটি বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাক থেকে হাসানের বাড়ানো পাস ধরে মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান জিকো।
দুই গোল পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এই সময়ের মধ্যে ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখাটাই ছিল যেন দু:স্বপ্নের মতোই। কিন্তু বিশ্বকাপের এই মঞ্চে সেই রোমাঞ্চকর কাজটি করে দেখালন রোমেরো, মেসি ও ফার্নান্ডেজ। পেনাল্টি মিস করলেও মেসিই ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণ ভ্রমরা। শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত দলের ভরসার ভূমিকায়ও ছিলেন।
ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। ৭৯ মিনিটের সময় ডান দিক থেকে বাড়ানো মেসির একটি ক্রসে চমৎকার হেডে বল জালে জড়ান। মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের তার বাঁ হাত দিয়ে বলটি ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। পোস্টের ভেতরের কোণ দিয়ে বল লাইনের ভেতরে ঢুকে পড়া আটকাতে পারেননি। মিশরীয় ডিফেন্ডাররা অফসাইডের জন্য আবেদন করলেও তা বৃথাই যায়। ব্যবধান কমে হয় ২-১।
এর ঠিক চার মিনিট পরেই ৮৪ মিনিটের সময় দারুন এক শটে মেসি নিজেই গোলের খাতায় নাম লিখান। ২-২ গোলে সমতায় ফিরে দল। গোলরক্ষকের গায়ে লেগে বারের নিচের অংশে লেগে বলটি জোরালো শটে জালে জড়ায়। মেসি এই নিয়ে টানা নয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করলেন। চলতি বিশ্বকাপে তার গোল সংখ্যা আটে। সব কয়টি বিশ্বকাপে তার গোলের সংখ্যা মোট ২১টি।

এরপর ম্যাচটি যখন নব্বই মিনিটের সময়ের কাটা ঘুরিয়ে যোগ হওয়া আরো সাত মিনিটের দিকে গড়ালো ঠিক তখনি বিজয়ের কাঙ্খিত গোল পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। একটি দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে বক্সের মাঝখান থেকে চমৎকার হেডে গোল করেন এনজো ফার্নান্দেজ। ৯২তম মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজের অ্যাসিস্টে ফার্নান্দেজ তৃতীয়বার জাল কাঁপান। আর তাতে কেঁপে উঠলো অ্যাটলান্টা স্টেডিয়াম।

হতাশায় মিশরের গোল রক্ষক, হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়েন সালাহ নেতৃত্বাধীন মিশরীয় দল।


















