সংশোধনীসহ অর্থবিল ২০২৬ পাশ : কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল
- আপডেট সময় : ০৭:৪৮:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
- / ৪৪ বার পড়া হয়েছে
জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে অর্থবিল-২০২৬। বিলটি পাসের আগে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর সুপারিশ করেন। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সব প্রস্তাব গ্রহণের ঘোষণা দেন।
সেই প্রস্তাব মোতাবেক কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের পাশাপাশি ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত আয়করের করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে লাগবে না টিআইএন নম্বর। এর পাশাপাশি সংশোধনীতে খুচরা বিক্রেতাদের পণ্য বিক্রির ওপর অগ্রিম কর বাতিল করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা, পার্বত্য অঞ্চল ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কর-সুবিধা বৃদ্ধি এবং শিল্পের কাঁচামাল ও চিংড়ি খাতের বিভিন্ন উপকরণ আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট কমানোর সুপারিশও করেন তিনি। সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব করতে সরকার কাজ করছে।
বাজেট আলোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সব সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে। সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও জানান, কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদিদোকান করের আওতার বাইরে থাকবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছয় হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বেসরকারি খাত, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নের জন্য ১০টি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমাপনী বক্তব্য শেষে অর্থমন্ত্রী অর্থবিল-২০২৬ এবং সংশ্লিষ্ট বিলগুলো পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
রাজস্ব বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর
জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী সদস্যদের গঠনমূলক আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব এবং বিভিন্ন খাত নিয়ে বিস্তৃত সমালোচনার পর ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পাস হয়েছে। অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণীত এ বাজেটকে সরকার বাস্তবমুখী ও সংস্কারমুখী হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল বাজেটের বেশ কিছু ইতিবাচক দিকের প্রশংসা করলেও রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বাজেট আলোচনায় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক চাপের মধ্যেও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তারা বিশেষ করে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে বিরোধী দল বাজেটে কর ব্যবস্থার কিছু সংস্কারকে স্বাগত জানালেও তারা দাবি করে, কর আদায়ের ভিত্তি আরও বিস্তৃত না হলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতি, অপচয় ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপরও জোর দেন বিরোধী সদস্যরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আরও সুস্পষ্ট উদ্যোগ প্রয়োজন।
যেসব খাতে সর্বাধিক গুরুত্ব
সামাজিক নিরাপত্তা: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিএফ, ভিজিডিসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যাতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া যায়।
স্বাস্থ্য খাত: সরকারি হাসপাতালের সেবা সম্প্রসারণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় এবং জনবল নিয়োগে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
শিক্ষা: প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল শিক্ষা, কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিযন্ত্রে সহায়তা, সার ও বীজে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো: সড়ক, সেতু, রেলপথ, বন্দর ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা হয়েছে, যাতে বাণিজ্য ও শিল্পায়ন আরও গতিশীল হয়।
যেসব খাতে কর কমানো বা ছাড় দেওয়া হয়েছে
ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা, শিল্প উৎপাদন উৎসাহিত করা এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কিছুটা কমানোর লক্ষ্যে বাজেটে কয়েকটি ক্ষেত্রে কর হ্রাস বা কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
- কিছু শিল্প খাতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক কমানো হয়েছে।
- উৎপাদনমুখী শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতে নির্বাচিত কর-সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে কর-প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
- তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতের জন্য নির্দিষ্ট কর-সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
- কৃষি উৎপাদন ও কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে কর-সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যাতে বাজারমূল্যের ওপর চাপ কমানো যায়।
তবে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে বিলাসপণ্য, তামাকজাত দ্রব্য এবং কিছু ভোগ্যপণ্যের ওপর কর ও শুল্ক সমন্বয় করা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের পরিকল্পনা
চলতি অর্থবছরের মতো এবারও বাজেটে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রাখা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ, সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর আদায় বৃদ্ধি অন্যতম কৌশল। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর এবং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বৈদেশিক উৎস থেকে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের কাছ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রকল্প সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের আশা, উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্য
সরকারের মতে, বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এজন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংসদীয় আলোচনার প্রতিফলন
বাজেট আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষই বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সরকারি দলের সদস্যরা বলেছেন, পরিকল্পিতভাবে রাজস্ব সংগ্রহ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। বিরোধী সদস্যরা জবাবে বলেন, কেবল বাজেট ঘোষণা নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
অর্থমন্ত্রী সমাপনী বক্তব্যে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার অব্যাহত রাখবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে রাজস্ব আহরণ, বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর।



















