ঢাকা ১২:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

লক্ষ্মীপুরে মা’সহ ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত ঘাতক, বেঁচে থাকা সন্তান বাকরুদ্ধ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:০৬:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
  • / ৪০ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীসহ লক্ষীপুরে একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে সন্দেহভাজন ঘাতকও স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে নিহত হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোড এলাকার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, পরিবারটির বাড়ি কুমল্লা জেলায়। তার বেশ কয়েক বছর ধরেই লক্ষীপুরে বসবাস করতো। পরিবারটির গৃহকর্তা বিদুৎ পিষ্ঠ হয়ে মারা যান। এরপর থেকে লক্ষীপুরের রায়পুরের ওই বাসাতেই বসবাস করে আসছেন পরিবারটি।

নিহতরা হলেন মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় মেয়ে ঢাবি শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার (২১), মেঝ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। গণপিটুনিতে নিহতের নাম অন্তর মজুমদার (৩৫)।  নিহত সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক জানান, পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এ সময় স্থানীয়দের হামলার মুখেও পড়তে হয় তাদেরকে। স্থানীয় লোকজনের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে ছয়-সাত জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

তবে কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে শাহীনুরের স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, আজ সকালে তিন মেয়েসহ শাহীনুরকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ সময় তাদের চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে আসেন। ঘাতক অন্তর মজুমদার পালানোর চেষ্টা করলে ধাওয়া দিয়ে তাকে আটক করে গণপিটুনি দেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

খবর পেয়ে রায়পুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাহারুল আলম বলেন, ‘হাসপাতালে মোট পাঁচজনকে আহত অবস্থায় আনা হয়েছিল। এর মধ্যে দুই মেয়ে ও তাদের মা মারা গেছেন। এক মেয়েকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদের সবার শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।’

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, ‘হাসপাতালে আনার আগেই দুই মেয়ের মৃত্যু হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মা। তাদের শরীরে বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত রয়েছে।’

রায়পুর থানার ওসি নিশ্চিত করেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে বিকেল ৫টার দিকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে পৌঁছানোর পরই মারা যান সায়মা।
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক  বলেন, নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা অন্তর মজুমদার নামের ওই যুবক ওই বাসায় যাতায়াত করতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

তিনি জানান, আজ বেলা পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে অন্তর মজুমদার ধারালো অস্ত্র নিয়ে ওই ঘরে প্রবেশ করেন এবং মা ও তিন মেয়েকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ঘাতক পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় এলাকাবাসী তাকে ধরে গণপিটুনি দিলে তিনি মারা যান।

পরিবারের সবাইকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ একমাত্র ছেলে সিফাত

সাত বছর আগে বাবাকে হারিয়েছিলেন। তখনো কোন কিছু ঠিক করে বুজে উঠতে পারেননি ছোট্ট সিফাত। বয়স তখন কতোই বা ছিলো, ১১ বছরের বালক। এবার কিনা হারাতে হলো মা এবং দুই বোনকে। সংসারের গ্লানি ধরতে অল্প বয়সেই সিফাত রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি ধরেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এখানে কর্মরত। সকালবেলা সিফাত তার বাসার অদূরেই কর্মস্থলে চলে যান।

সিফাতের বরাত দিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সকালে সিফাত দোকানে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। আমার দোকানের পেছনেই তাদের বাসা। লোকজন জড়ো হয়ে ঘাতক যুবককে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এদিকে একসঙ্গে মা ও তিনবোনের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সিফাত। প্রথমে ঘটনা শুনে বাসায় গিয়ে বুক চাপড়ে তিনি কান্নাকাটি করতে থাকেন। তার কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ধারণকৃত একটি ভিডিওতে তার গগনবিদারি কান্নার দৃশ্য দেখা যায়। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে বণিক সমিতির নেতার বাসায় নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে একবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে গাড়িতে নিয়ে এসে ফের বণিক সমিতির নেতার বাসায় রাখা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে সিফাতের বাবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তখন পরিবারের বড় মেয়ে রায়পুর মার্চেন্টস একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। অন্যরা বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ালেখা করতেন। এছাড়া ছোট মেয়ে শিফা প্রায় দুই বছর বয়সী ছিলেন। এর মধ্যে বড় মেয়ে সায়মা এসএসসি পাস করে আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তির জন্য চেষ্টা করেন। সর্বশেষ কোথাও ভর্তি হননি তিনি। মেজো মেয়ে স্থানীয় লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। আর ছোট মেয়েও স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল।

একমাত্র ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দোকানে চাকরি নেন। সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র।
নিহত সায়মার একসময়ের ক্লাসমেট প্রমি আক্তার বলেন, সাইমা মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বের হয়েছে। এর মধ্যে সে মেডিকেল ভর্তির জন্যও চেষ্টা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। তবে ভর্তি হয়েছে কিনা জানি না।

সিফাতের বরাত দিয়ে বণিক সমিতির নেতা সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সিফাতের বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা খুব কষ্টে সংসার চালিয়েছে। বছরখানিক ধরে সিফাত আমার এখানে কাজ করে। এখন তার তিন বোনসহ মাকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছেলেটির আর কেউ নেই এ পৃথিবীতে। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন কে আছে তা বলতে পারেননি তিনি।

রায়পুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়ি কুমিল্লায়। পরিবারের একমাত্র ছেলে বেঁচে আছে। স্বজনদেরকে খবর দিতে বলা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে আছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বজনরা এসে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বুঝে নেবেন। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রতন মজুমদার (২৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ক্ষুব্ধ জনতা। তার বাড়ি শুনেছি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তবে সঠিক ঠিকানা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

লক্ষ্মীপুরে মা’সহ ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত ঘাতক, বেঁচে থাকা সন্তান বাকরুদ্ধ

আপডেট সময় : ০৯:০৬:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীসহ লক্ষীপুরে একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে সন্দেহভাজন ঘাতকও স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে নিহত হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোড এলাকার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, পরিবারটির বাড়ি কুমল্লা জেলায়। তার বেশ কয়েক বছর ধরেই লক্ষীপুরে বসবাস করতো। পরিবারটির গৃহকর্তা বিদুৎ পিষ্ঠ হয়ে মারা যান। এরপর থেকে লক্ষীপুরের রায়পুরের ওই বাসাতেই বসবাস করে আসছেন পরিবারটি।

নিহতরা হলেন মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় মেয়ে ঢাবি শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার (২১), মেঝ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। গণপিটুনিতে নিহতের নাম অন্তর মজুমদার (৩৫)।  নিহত সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক জানান, পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এ সময় স্থানীয়দের হামলার মুখেও পড়তে হয় তাদেরকে। স্থানীয় লোকজনের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে ছয়-সাত জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

তবে কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে শাহীনুরের স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, আজ সকালে তিন মেয়েসহ শাহীনুরকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ সময় তাদের চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে আসেন। ঘাতক অন্তর মজুমদার পালানোর চেষ্টা করলে ধাওয়া দিয়ে তাকে আটক করে গণপিটুনি দেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

খবর পেয়ে রায়পুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাহারুল আলম বলেন, ‘হাসপাতালে মোট পাঁচজনকে আহত অবস্থায় আনা হয়েছিল। এর মধ্যে দুই মেয়ে ও তাদের মা মারা গেছেন। এক মেয়েকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদের সবার শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।’

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, ‘হাসপাতালে আনার আগেই দুই মেয়ের মৃত্যু হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মা। তাদের শরীরে বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত রয়েছে।’

রায়পুর থানার ওসি নিশ্চিত করেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে বিকেল ৫টার দিকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে পৌঁছানোর পরই মারা যান সায়মা।
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক  বলেন, নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা অন্তর মজুমদার নামের ওই যুবক ওই বাসায় যাতায়াত করতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

তিনি জানান, আজ বেলা পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে অন্তর মজুমদার ধারালো অস্ত্র নিয়ে ওই ঘরে প্রবেশ করেন এবং মা ও তিন মেয়েকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ঘাতক পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় এলাকাবাসী তাকে ধরে গণপিটুনি দিলে তিনি মারা যান।

পরিবারের সবাইকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ একমাত্র ছেলে সিফাত

সাত বছর আগে বাবাকে হারিয়েছিলেন। তখনো কোন কিছু ঠিক করে বুজে উঠতে পারেননি ছোট্ট সিফাত। বয়স তখন কতোই বা ছিলো, ১১ বছরের বালক। এবার কিনা হারাতে হলো মা এবং দুই বোনকে। সংসারের গ্লানি ধরতে অল্প বয়সেই সিফাত রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি ধরেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এখানে কর্মরত। সকালবেলা সিফাত তার বাসার অদূরেই কর্মস্থলে চলে যান।

সিফাতের বরাত দিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সকালে সিফাত দোকানে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। আমার দোকানের পেছনেই তাদের বাসা। লোকজন জড়ো হয়ে ঘাতক যুবককে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এদিকে একসঙ্গে মা ও তিনবোনের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সিফাত। প্রথমে ঘটনা শুনে বাসায় গিয়ে বুক চাপড়ে তিনি কান্নাকাটি করতে থাকেন। তার কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ধারণকৃত একটি ভিডিওতে তার গগনবিদারি কান্নার দৃশ্য দেখা যায়। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে বণিক সমিতির নেতার বাসায় নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে একবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে গাড়িতে নিয়ে এসে ফের বণিক সমিতির নেতার বাসায় রাখা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে সিফাতের বাবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তখন পরিবারের বড় মেয়ে রায়পুর মার্চেন্টস একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। অন্যরা বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ালেখা করতেন। এছাড়া ছোট মেয়ে শিফা প্রায় দুই বছর বয়সী ছিলেন। এর মধ্যে বড় মেয়ে সায়মা এসএসসি পাস করে আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তির জন্য চেষ্টা করেন। সর্বশেষ কোথাও ভর্তি হননি তিনি। মেজো মেয়ে স্থানীয় লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। আর ছোট মেয়েও স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল।

একমাত্র ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দোকানে চাকরি নেন। সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র।
নিহত সায়মার একসময়ের ক্লাসমেট প্রমি আক্তার বলেন, সাইমা মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বের হয়েছে। এর মধ্যে সে মেডিকেল ভর্তির জন্যও চেষ্টা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। তবে ভর্তি হয়েছে কিনা জানি না।

সিফাতের বরাত দিয়ে বণিক সমিতির নেতা সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সিফাতের বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা খুব কষ্টে সংসার চালিয়েছে। বছরখানিক ধরে সিফাত আমার এখানে কাজ করে। এখন তার তিন বোনসহ মাকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছেলেটির আর কেউ নেই এ পৃথিবীতে। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন কে আছে তা বলতে পারেননি তিনি।

রায়পুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়ি কুমিল্লায়। পরিবারের একমাত্র ছেলে বেঁচে আছে। স্বজনদেরকে খবর দিতে বলা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে আছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বজনরা এসে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বুঝে নেবেন। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রতন মজুমদার (২৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ক্ষুব্ধ জনতা। তার বাড়ি শুনেছি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তবে সঠিক ঠিকানা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।