অভাবাকে হারিয়ে এশিয়ান গেমসে ইতিহাস গড়া কয়েক নারীর সফলতার গল্প
- আপডেট সময় : ০৪:১৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- / ৬৫ বার পড়া হয়েছে
জাপানের আইচি ও নাগোয়ায় ২০২৬ এশিয়ান গেমস শেষ৷ অ্যাথলেটরা ফিরে গেছেন নিজ নিজ দেশে৷ পদক জয়ীদের নিয়ে চলছে এখন ক্রমাগত উচ্ছাস৷ তবে কিছু কিছু সফলতা দাগ কেটে আছে সবার হ্দয়ে৷ যাদের সফলতার পিছনে ছিলো না কোন সরকারি অনুদান৷ আর্থিক অনটনের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা দেশের জন্য জিতেছেন পদক৷ জাঁকজমকপূর্ণ পোডিয়ামের পেছনে লুকিয়ে থাকা এই লড়াকু নারী খেলোয়াড়দের গল্প ডেইলি ঢাকা মেট্টোর পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো…
মীরাবাই চানু ( ভারোত্তোলন)
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসেছেন মীরাবাই চানু। ভারত্তোলনে ২৮ বছর পর ভারতকে এনে দিয়েছেন রৌপ্য পদক৷ বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়াতারকা হলেও শুরুর পথটা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
মণিপুরের নংপক কাকচিং গ্রামের বাসিন্দা মীরাবাইয়ের বাড়ি ইম্ফল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তিনি। বাবা সাইখোম কীর্তি সরকারি এক দফতরের শ্রমিক ছিলেন। সংসারের বাড়তি খরচ সামলাতে মা তোম্বি দেবী চালাতেন একটি চায়ের দোকান। বক্সার মেরি কমের মতো মীরাবাইকেও ছোটবেলায় জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ কুড়িয়ে আনতে হতো। মাকে সাহায্য করার পাশাপাশি এতে কিছু খরচও বাঁচত।
অনেকের মতে, সেখান থেকেই তার শক্তির পরিচয় মেলে। মাত্র ১২ বছর বয়সে একদিন ভাইয়ের সঙ্গে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি অনায়াসে এমন এক বোঝা তুলে নেন, যা তুলতে তার ভাইয়ের কষ্ট হচ্ছিল। সেই বোঝা কাঁধে নিয়েই প্রায় ২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার ওয়েটলিফটিংয়ের পথচলা।
পরে সাবেক ওয়েটলিফটার অনিতা চানুর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে কখনও বাসে, আবার কখনও ট্রাকে লিফট নিয়ে যাতায়াত করতেন মীরাবা৷
নিকিতা কুমারী ( কাবাডি)
ইরানের বিপক্ষে ফাইনালে চোট পেয়েছিলেন নিকিতা কুমারী। ভারতের কবাডিতে স্বর্ণপদক জেতায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ বছরের নিকিতা ফাইনালে যেমন ডিফেন্সে ভরসা জুগিয়েছেন, তেমনই রেইডার হিসেবে দলের জন্য ৫ পয়েন্টও আদায় করেছেন।
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার ও তার পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। হরিয়ানার হিসার জেলার হাসনগড় গ্রামের বাসিন্দা নিকিতার বাবা অনিল নায়ন একজন কৃষক এবং মা বিনোদ কুমারী গৃহিণী। সাত ভাইবোনের মধ্যে নিকিতা চতুর্থ। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও তার স্বপ্নপূরণে সবসময় পাশে থেকেছেন বাবা-মা।
এক আত্মীয়াকে খেলতে দেখে আট বছর বয়সে কাবাডির প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। হরিয়ানার হয়ে খেলতে নেমে ১৭ পয়েন্ট সংগ্রহ করে নজর কাড়েন এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন।
মনপ্রীত কৌর (শটপুট)
২০০৬ সালে প্রথম জুনিয়র জাতীয় শিরোপা জিতেছিলেন মনপ্রীত কৌর। ৩৬ বছর বয়সে এসে শট পুটে ব্রোঞ্জ জিতে সবাইকে চমকে দিয়েছেন তিনি। আরও বিশেষ বিষয় হলো, জাপানের স্টেডিয়ামে বসেই তার স্বামী ও ১৪ বছরের মেয়ে সেই মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন।
পাঞ্জাবের সহৌলি গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম মনপ্রীতের। ১২ বছর বয়সেই বাবাকে হারান। পরে তার মা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন এবং আজও সেই শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন। এত প্রতিকূলতার পরও খেলাধুলার প্রতি তার একাগ্রতা কখনও কমেনি।
রোশিবিনা দেবী (উশু)
চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যেও নিজের খেলা চালিয়ে গেছেন রোশিবিনা দেবী। মীরাবাই চানুর মতো তিনিও মণিপুরের বাসিন্দা। বিষ্ণুপুর জেলায় তার বাড়ি। সাধারণ কৃষক পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। বাবা দামু সিং মেয়ের প্রতিভা চিনতে পেরে এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
মেয়ের প্রশিক্ষণ ও যাতায়াতের খরচ জোগাতে তিনি নিজের জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দেন। তার বদলে রোশিবিনা জাপানে জিতে নিয়েছেন তার তৃতীয় এশিয়ান গেমস পদক। এর আগে তিনি ২০১৮ সালে জাকার্তায় ব্রোঞ্জ এবং ২০২২ সালে হাংঝৌতে রুপোর পদক জিতেছিলেন।
হাংঝৌ গেমসের সময় মণিপুরে অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। রোশিবিনার ভাষ্য অনুযায়ী, দাঙ্গার জেরে তার বাবা মাঠেও যেতে পারতেন না। সংসারের আর্থিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল, তবু বাবা-মা কখনও তার মনোবল ভেঙে পড়তে দেননি।
পাটিয়ালার প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে সেখানে পৌঁছতে হয়েছিল তাকে।
সীমা কুমারী (অ্যাথলেটিক্স)
এক হাজার মিটার দৌড়ে ব্রোঞ্জজয়ী সীমা কুমারীর গল্পও যেন আরেক অনুপ্রেরণার কাহিনি। হিমাচল প্রদেশের চাম্বায় ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা জীবনের গতি বদলে দেয়। কিন্তু সীমা হাল ছাড়েননি। তার মা বলেন, ছোটবেলা থেকেই সীমা ছিলেন দৃঢ় এবং সাহসী। খেলাধুলার প্রতি তার টানও ছিল প্রবল।
সাত ভাইবোনের পরিবারে বাবাকে হারানোর পর সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতিতে খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হতে পারত। কিন্তু সীমা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।
চম্বার রেতা গ্রামের সীমা মাত্র ১১ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে ধর্মশালার স্পোর্টস অথরিটি হোস্টেলে থেকে অ্যাথলেটিক্সের প্রশিক্ষণ শুরু করেন।
জাপানে তিনি প্রিজা শ্রীধরন ও কবিতা রাউতের পর এশিয়ান গেমসের ১০,০০০ মিটার দৌড়ে পদকজয়ী তৃতীয় ভারতীয় নারী হন। দৌড়ের সময়ে তার জুতোর স্পাইকে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও দমে যাননি তিনি।
মজার বিষয় হলো, এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপান যাচ্ছেন, সেই খবর আগে নিজের মাকে জানাননি সীমা। তার আশঙ্কা ছিল, হৃদরোগে আক্রান্ত মা অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারেন। তবে তিনি জানতেন না, টেলিভিশনের পর্দায় মেয়ের দৌড় দেখেছেন তার মা। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, সীমার বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন তিনিই৷
চিকিতা তানিপার্তি (তিরন্দাজি – জোড়া সোনা)
কম্পাউন্ড আর্চারিতে ডাবল গোল্ড জিতে ইতিহাস গড়েছেন চিকিতা। কিন্তু তাঁর এই ব্যয়বহুল খেলা সচল রাখতে তাঁর কৃষক বাবা ট্র্যাক্টরের হার্ভেস্টার মেশিন বিক্রি করেন এবং আবাদি জমি বন্ধক রেখে লাখ লাখ টাকা ঋণ নেন। টুর্নামেন্টের ঠিক দুই দিন আগে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে তিনি ভারতকে জোড়া স্বর্ণ এনে দেন।
কীর্তি শর্মা (তিরন্দাজি – সোনা)
রিকার্ভ আর্চারি ইভেন্টে ভারতের ঐতিহাসিক সোনা জয়ের অন্যতম কারিগর ১৯ বছর বয়সী কীর্তি শর্মা। তাঁর অনুশীলনের জন্য ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ধনুক (রিকার্ভ বো) কিনে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা।
নীরু ধান্দা (শুটিং – সোনা)
হরিয়ানার ট্র্যাপ শুটার নীরু ধান্দা ব্যক্তিগত ইভেন্টে সোনা জিতে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। যেদিন তিনি এশিয়ান গেমসের মঞ্চে ইতিহাস গড়ছিলেন, সেদিনও তাঁর মা গ্রামে বিপিএল (দারিদ্র্যসীমার নিচে) রেশন তুলতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। নীরু অন্যের থেকে ধার করা বন্দুক দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের অনুশীলন চালিয়েছিলেন৷
সোনাম মাস্কার ( শ্যূটিং)
শুটিংয়ের মতো ব্যয়বহুল খেলায় সোনামের রাইফেল কেনা ও ভ্রমণের খরচ জোগাতে তাঁর বাবা নিজের একমাত্র জমিও দোকানটি পর্যন্ত বিক্রি করে দেন। বাবার সেই চরম আত্মত্যাগের মূল্য সোনাম দিয়েছেন রুপার পদক৷
মীরাবাই চানু, মনপ্রীত কৌরদের মতো কন্যারা প্রমাণ করেছেন যে, অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো বাধাই স্থায়ী নয়। অভাবকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে তেরঙা পতাকা ওড়ানো ভারতের এই নারীরা আজ কোটি যুবকের অনুপ্রেরণা৷ তাদের জীবনে জড়িয়ে ছিলো দারিদ্রতা, পারিবারিক ঋণ আর পৈতৃক জমি বিক্রির মতো বুকভাঙা সব সংগ্রামের গল্প।
















