বিশ্বকাপে নতুন চমক কেপভার্দের ফুটবলে সুসংগঠিত হওয়ার গল্প
- আপডেট সময় : ০৮:৪৭:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
- / ৪৭ বার পড়া হয়েছে
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে আছে ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। যে দ্বীপরাষ্ট্রটির জনসংখ্যা ছয় লাখেরও কম। যা কিনা ঢাকার একটি আসনের চেয়েও অনেক কম জনসংখ্যা। সেই দ্বীপরাষ্ট্রটিই কিনা খেলছে বিশ্বকাপে। শুধু তাই নয় এবারের বিশ্বকাপের নতুন চমকের নামটিও কেপ ভার্দে। গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে তারা খেলছে নক আউটে। এই পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। যাদের প্রতিরোধ অতিক্রম করা নিয়ে আর্জেন্টাইন কোচের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ভেসে উঠছে।
ফুটবল বিশ্বে সবার মুখে মুখে ক্যাপ ভার্দে। অথচ কয়েকদিন আগেও ছিলো অচেনা। এক বিশ্বকাপের চমকেই তারা গোটা দুনিয়ার কাছে পরিচিত। তাদের নিয়ে ফুটবল অনুরাগীদের জানার আগ্রহ এখন আকাশ ছোঁয়া। কৌতুহল সবার, ছোট্ট এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি কিভাবে ফুটবলে সুসংগঠিত হলো !
ফুটবলের মানচিত্রে কেপ ভার্দের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। তবে ১৯৮৬ সালে ফিফার সদস্য হওয়ার পর দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব একটা পরিচিত ছিল না দলটি। কিন্তু গত এক যুগে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক কোচিং, বয়সভিত্তিক দল গঠন এবং ইউরোপে বেড়ে ওঠা কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বদলে যেতে থাকে দেশটির ফুটবলের চিত্র।
দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী। পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও স্পেনে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ান পরিবারগুলোর সন্তানদের অনেকেই ইউরোপের উন্নত একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে পরে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপান। ফলে ছোট জনসংখ্যার দেশ হলেও কার্যত তাদের প্রতিভার ভাণ্ডার অনেক বড়। ইউরোপীয় কৌশল ও আফ্রিকান শারীরিক সক্ষমতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল।
আফ্রিকান নেশনস কাপেও ধাপে ধাপে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে কেপ ভার্দে। ২০১৩ ও ২০২৩ সালে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে শক্তিশালী ক্যামেরুনকে পিছনে ফেলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় তারা। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো রূপকথা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ফুটবলার তৈরির সুস্পষ্ট রোডম্যাপের সফল বাস্তবায়ন।
দ্বীপরাষ্ট্রটি আটলান্টিক মহাসাগরে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১০টি আগ্নেয় দ্বীপের এই ছোট্ট রাষ্ট্রটির আয়তন মাত্র ৪ হাজার ৩৩ বর্গকিলোমিটার। স্বাধীনতা লাভের আগে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এটি পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। বর্তমানে আফ্রিকার অন্যতম স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত কেপ ভার্দের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি পর্যটন, সেবা খাত এবং প্রবাসী নাগরিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের (ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট) আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদন এবং কেপ ভার্দের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৩ জন। এর মধ্যে প্রায় ২ শতাংশ মুসলিম। অর্থাৎ কেপ ভার্দেতে বর্তমানে মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার ৩৬৭।
দেশটির মুসলিমদের বড় একটি অংশ সেনেগাল ও পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে আসা অভিবাসী। জীবিকা ও ব্যবসার খোঁজে তারা ধীরে ধীরে কেপ ভার্দেতে স্থায়ী হয়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটকদের কাছে স্মারকপণ্য বিক্রি, নির্মাণশিল্প, হোটেল, পরিবহন ও হস্তশিল্প-এসব খাতেই তাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। সংখ্যায় কম হলেও দেশের অর্থনীতিতে মুসলিমদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
সময়ের সঙ্গে কেপ ভার্দেতে মুসলিম সম্প্রদায় আরও সুসংগঠিত হয়েছে। রাজধানী প্রাইয়া ছাড়াও মিনদেলো, সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে তাদের বসবাস বেশি। এখানকার অধিকাংশ মুসলিম সুন্নি মতাবলম্বী। পশ্চিম আফ্রিকার তিজানিয়া ও মুরিদ সুফি তরিকার প্রভাব তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর আগে, ১৫শ শতকে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপনের পর সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আসা মুসলিম ব্যবসায়ী ও ক্রীতদাসদের হাত ধরে সেখানে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় ওলোফ, মান্দিঙ্কা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখের খেত ও গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
ইতিহাসের সেই ক্ষুদ্র সূচনা আজ একটি প্রতিষ্ঠিত সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। আর বিশ্বকাপের আলোয় যখন কেপ ভার্দে নতুন করে বিশ্বের নজরে, তখন দেশটির মুসলিম সমাজও স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলের অংশ হয়ে উঠেছে। ফুটবলের এই রূপকথা তাই শুধু মাঠের সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি দেশের মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে নতুন করে জানারও উপলক্ষ।










