ঢাকা ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ফাতিমা আল মানসুর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৫১ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
 মরক্কোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ গত মঙ্গলবার মারাকেশের মেয়র ফাতিমা এজাহরা আল মানসুরিকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আরব বিশ্বের ইতিহাসে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়া দ্বিতীয় নারী।
রাজধানী রাবাত থেকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মরক্কোর পার্লামেন্ট (প্রতিনিধি পরিষদ) নির্বাচনে আল মানসুরির মধ্য-ডানপন্থী দল ‘অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি’ (পিএএম) সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছে। ৩৯৫টি আসনের মধ্যে পিএএম একাই ৯৭টি আসন লাভ করেছে, যা তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দলের চেয়ে ৩১টি বেশি। তবে এই নির্বাচনটিতে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। 
মরক্কোর রাজকীয় মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ ৫০ বছর বয়সী আল মানসুরিকে রাজপ্রাসাদে স্বাগত জানান এবং তাঁকে ‘নতুন সরকার গঠনের’ আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দেন। আল মানসুরি এর আগে দেশটির আবাসনমন্ত্রী হিসেবেও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 
নিয়োগ পাওয়ার পর টেলিভিশনে দেওয়া এক আবেগঘন ভাষণে আল মানসুরি বলেন, “আমার এই নিয়োগ সত্যিই ঐতিহাসিক। আমাদের দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো নারী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন। এটি শুধু আমার একার জন্য নয়, বরং গোটা মরক্কোর নারীদের জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়।”
মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী প্রতিনিধি সভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় পিএএম-কে একটি শক্তিশালী জোট সরকার গঠন করতে হবে। তবে মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেকোনো বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশটির রাজার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “আমাদের কাজ আজ থেকেই শুরু হচ্ছে। আমরা প্রথমে নিজেদের দলের অভ্যন্তরে আলোচনা করব এবং এরপর অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে কথা বলব।”
কে এই ফাতিমা আল মানসুরি?
২০০৮ সালে পিএএম (PAM) প্রতিষ্ঠার বছরই আল মানসুরি এই দলটিতে যোগ দেন। মরক্কোর ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের মোকাবিলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প তৈরির উদ্দেশ্যে রাজকীয় উপদেষ্টা ফুয়াদ আলি আল হিম্মা এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আল মানসুরি মরক্কোর প্রথম নারী হিসেবে মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। ছয় বছর পর ২০১৫ সালে তিনি পদটি হারালেও, ২০২১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে আবারও মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন।
নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জসমূহ:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শুরুতেই বেশ কিছু জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। মরক্কোয় বর্তমানে তীব্র বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বৈষম্য চলছে, যা দেশটির তরুণ সমাজকে চরম হতাশায় ফেলেছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেই স্পেনের ছিটমহল সেউতায় হাজার হাজার মরক্কোর তরুণ অভিবাসীর হঠাৎ অনুপ্রবেশের চেষ্টা দেশটিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর এক বছর আগে দেশটির ‘জেন-জি’ (Gen-Z) প্রজন্মের তরুণরা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার দাবিতে রাজপথে নেমে ব্যাপক প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
এই তরুণদের প্রসঙ্গে আল মানসুরি বলেন, “আমরা পুরোপুরি সচেতন যে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আমাদের ওপর অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। এ কারণেই আমরা এমন একটি সরকারি কর্মসূচি গ্রহণ করব, যা নাগরিকদের বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান দিতে পারবে।” নির্বাচনী ইশতেহারে পিএএম আগামী পাঁচ বছরে গড়ে বার্ষিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অন্তত ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল:
এবারের নির্বাচনে বিদায়ী জোট সরকারের নেতৃত্বে থাকা মধ্য-ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র‌্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস’ (आरएनआई) ৬৬টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ডানপন্থী ‘ইস্তিকলাল পার্টি’ ৬৫টি আসন নিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে।
অন্যদিকে, ইসলামপন্থী বিরোধী দল ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ (পিজেডি) ৫৪টি আসন পেয়ে চমক দেখিয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে মাত্র ১৩টি আসন পাওয়া এই দলটি এবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে মূল এজেন্ডা করে এই বড় সাফল্য পায়। দলটির প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবদেলিলাহ বেনকিরানে এই ফলাফলকে তাদের ‘বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে বিজয়ী দল পিএএম-এর বিরুদ্ধে ‘নির্বাচনী জালিয়াতির’ ইঙ্গিত এনে তিনি তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ফাতিমা আল মানসুর

আপডেট সময় : ১১:০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 মরক্কোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ গত মঙ্গলবার মারাকেশের মেয়র ফাতিমা এজাহরা আল মানসুরিকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আরব বিশ্বের ইতিহাসে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়া দ্বিতীয় নারী।
রাজধানী রাবাত থেকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মরক্কোর পার্লামেন্ট (প্রতিনিধি পরিষদ) নির্বাচনে আল মানসুরির মধ্য-ডানপন্থী দল ‘অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি’ (পিএএম) সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছে। ৩৯৫টি আসনের মধ্যে পিএএম একাই ৯৭টি আসন লাভ করেছে, যা তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দলের চেয়ে ৩১টি বেশি। তবে এই নির্বাচনটিতে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। 
মরক্কোর রাজকীয় মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ ৫০ বছর বয়সী আল মানসুরিকে রাজপ্রাসাদে স্বাগত জানান এবং তাঁকে ‘নতুন সরকার গঠনের’ আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দেন। আল মানসুরি এর আগে দেশটির আবাসনমন্ত্রী হিসেবেও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 
নিয়োগ পাওয়ার পর টেলিভিশনে দেওয়া এক আবেগঘন ভাষণে আল মানসুরি বলেন, “আমার এই নিয়োগ সত্যিই ঐতিহাসিক। আমাদের দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো নারী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন। এটি শুধু আমার একার জন্য নয়, বরং গোটা মরক্কোর নারীদের জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়।”
মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী প্রতিনিধি সভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় পিএএম-কে একটি শক্তিশালী জোট সরকার গঠন করতে হবে। তবে মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেকোনো বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশটির রাজার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “আমাদের কাজ আজ থেকেই শুরু হচ্ছে। আমরা প্রথমে নিজেদের দলের অভ্যন্তরে আলোচনা করব এবং এরপর অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে কথা বলব।”
কে এই ফাতিমা আল মানসুরি?
২০০৮ সালে পিএএম (PAM) প্রতিষ্ঠার বছরই আল মানসুরি এই দলটিতে যোগ দেন। মরক্কোর ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের মোকাবিলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প তৈরির উদ্দেশ্যে রাজকীয় উপদেষ্টা ফুয়াদ আলি আল হিম্মা এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আল মানসুরি মরক্কোর প্রথম নারী হিসেবে মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। ছয় বছর পর ২০১৫ সালে তিনি পদটি হারালেও, ২০২১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে আবারও মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন।
নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জসমূহ:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শুরুতেই বেশ কিছু জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। মরক্কোয় বর্তমানে তীব্র বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বৈষম্য চলছে, যা দেশটির তরুণ সমাজকে চরম হতাশায় ফেলেছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেই স্পেনের ছিটমহল সেউতায় হাজার হাজার মরক্কোর তরুণ অভিবাসীর হঠাৎ অনুপ্রবেশের চেষ্টা দেশটিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর এক বছর আগে দেশটির ‘জেন-জি’ (Gen-Z) প্রজন্মের তরুণরা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার দাবিতে রাজপথে নেমে ব্যাপক প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
এই তরুণদের প্রসঙ্গে আল মানসুরি বলেন, “আমরা পুরোপুরি সচেতন যে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আমাদের ওপর অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। এ কারণেই আমরা এমন একটি সরকারি কর্মসূচি গ্রহণ করব, যা নাগরিকদের বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান দিতে পারবে।” নির্বাচনী ইশতেহারে পিএএম আগামী পাঁচ বছরে গড়ে বার্ষিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অন্তত ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল:
এবারের নির্বাচনে বিদায়ী জোট সরকারের নেতৃত্বে থাকা মধ্য-ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র‌্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস’ (आरएनआई) ৬৬টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ডানপন্থী ‘ইস্তিকলাল পার্টি’ ৬৫টি আসন নিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে।
অন্যদিকে, ইসলামপন্থী বিরোধী দল ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ (পিজেডি) ৫৪টি আসন পেয়ে চমক দেখিয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে মাত্র ১৩টি আসন পাওয়া এই দলটি এবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে মূল এজেন্ডা করে এই বড় সাফল্য পায়। দলটির প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবদেলিলাহ বেনকিরানে এই ফলাফলকে তাদের ‘বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে বিজয়ী দল পিএএম-এর বিরুদ্ধে ‘নির্বাচনী জালিয়াতির’ ইঙ্গিত এনে তিনি তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন।