সাইবার সুরক্ষা আইন চূড়ান্তের আগে আরও পরামর্শের আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
- আপডেট সময় : ০৬:২২:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৪৮ বার পড়া হয়েছে
সাইবার সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কোনো লক্ষ্য সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ যেন নিপীড়নমূলক না হয় এবং কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করেই আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ সভার পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে এই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোনো সাংবাদিক যাতে আইনের শিকার না হন বা এর অপপ্রয়োগের মুখে না পড়েন, সেটিই সরকারের অন্যতম বিবেচনা। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে খসড়াটি আরও পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
সাংবাদিক গ্রেপ্তারে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব
গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সুরক্ষায় সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া বা তাঁকে গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, এ বিষয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অংশীজনদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ নেওয়া হবে। এরপর প্রস্তাবটি সংশোধিত খসড়ায় যুক্ত করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি যাতে বছরের পর বছর মামলা বা আপিলের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকেন, সে জন্য মামলা ও আপিল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সম্পাদকদের আরও সংশোধনের দাবি
সভায় গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা বলেন, কিছু বিধানের ভাষা ও প্রয়োগের সুযোগ স্পষ্ট না হলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার কাজে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁরা আরও পরামর্শের মাধ্যমে খসড়ায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও ‘সেভিং ক্লজ’ যুক্ত করার দাবি জানান।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম আইনটি নিয়ে গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের আরও আলোচনার প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গণমাধ্যমের ওপর আইনের বিরূপ প্রভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীও খসড়াটি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা কিছু ধারার স্পষ্ট সংজ্ঞা ও প্রয়োগের সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
খসড়ায় কী নিয়ে বিতর্ক
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল মানহানি, অপমান, বুলিং, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, গুজব ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো বিষয়কে অপরাধের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের এখতিয়ার বাড়ানোর প্রস্তাব এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর বিষয়ও খসড়ায় রয়েছে।
এসব বিধান নিয়ে গণমাধ্যমের অংশীজনদের একটি বড় উদ্বেগ হলো—অস্পষ্ট বা বিস্তৃত সংজ্ঞার কারণে আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন সম্পাদক।
আবারও জনমত নেওয়া হবে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, অংশীজনদের সুপারিশ পাওয়ার পর খসড়াটি সংশোধন করা হবে। এরপর সংশোধিত খসড়া আবার সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হবে। গ্রহণযোগ্য সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর খসড়াটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে তা বিল হিসেবে জাতীয় সংসদে যাবে।
সরকার আইনটি তাড়াহুড়ো করে সংসদে পাস করতে চায় না বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের আলোচনার পাশাপাশি সংসদের বাইরেও সেমিনার ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে পাওয়া মতামত বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত আইনের মূল লক্ষ্য সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, শিশু-কিশোরসহ নাগরিকদের সুরক্ষা, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা এবং অনলাইনে হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলা। একই সঙ্গে মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও খসড়া চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত আইনটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশসংক্রান্ত বিতর্কিত বিধানগুলো পরামর্শ ও পর্যালোচনার পর কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিই পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।




















