দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ব্রিকসের কু-প্রভাবের আশঙ্কা
- আপডেট সময় : ০১:২০:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৪৪ বার পড়া হয়েছে
দুইশ কোটির কাছাকাছি মানুষের আবাসস্থল দক্ষিণ এশিয়া, বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। একই সঙ্গে এটি এমন এক অঞ্চল, যেখানে উন্নয়ন, অর্থায়ন, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও জোরালো প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন রয়েছে। সেই অর্থে ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণ দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তব চিত্র আলাদা। এই অঞ্চলের জোটটির একমাত্র পূর্ণ সদস্য ভারত। পাকিস্তান ২০২৩ সালে সদস্য হওয়ার আবেদন করেও এখনো ব্রিকসের বাইরে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিকসের বিস্তারে ভারতের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্রিকস এখন ১১ সদস্যের একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। ২০২৪ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া এতে যুক্ত হয়েছে। সম্প্রসারণের ফলে জোটটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে সদস্যদের স্বার্থের পার্থক্যও বেড়েছে। ভারতের নেতৃত্বে ২০২৬ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা।
এদিকে, দক্ষিণ এশিয়া ঘিরে এই জোটের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা পাকিস্তানের সদস্য হওয়ার চেষ্টা। ইসলামাবাদ ২০২৩ সালে আবেদন করে। চীন ও রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করলেও পাকিস্তানের আবেদন এখনো সফল হয়নি। ব্রিকসে নতুন সদস্য নেয়ার ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে ভারতের অবস্থানকে পাকিস্তানের সদস্যপথের প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিকসের সম্প্রসারণ শুধু অর্থনীতি বা উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশ্ন নয়; ভারত-পাকিস্তানের ভূরাজনীতিও সেখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
এখানে ভারতের অবস্থানকে শুধু ‘বাধা’ হিসেবে দেখলে অবশ্য পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। ভারত নিজেই ব্রিকসকে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। চলতি বছর ভারত ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে এবং ডিজিটাল অর্থ লেনদেন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতায় জোর দিচ্ছে। ভারত আন্তঃদেশীয় ডিজিটাল অর্থ লেনদেন সহজ করতে সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার মধ্যে সংযোগ তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর জন্য এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে একাধিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ও জোটের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চায়। দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানও মনে করেন, ছোট দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য বিভিন্ন শক্তিধরের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ব্রিকসের উত্থান বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করছে। তবে তিনি এটাও মনে করেন, ব্রিকস এখনো অনেকটা আলোচনার মঞ্চ; বাস্তব প্রতিশ্রুতি ও কার্যকর সহযোগিতা বাড়াতে হলে জোটকে আরও এগোতে হবে।
ভারতের ভূমিকা বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক। ব্রিকসের সম্প্রসারণে চীন আগ্রহী হলেও ভারত জোটটির ভবিষ্যৎকে চীন-নির্ভর কোনো কাঠামোয় দেখতে চায় না। গবেষক দেবেন্দ্র কুমারের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, ব্রিকসের সম্প্রসারণে ভারত ও চীনের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থা নিয়ে তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জোটটির ভবিষ্যৎ গতিপথকে প্রভাবিত করছে। ফলে নয়াদিল্লি একদিকে ব্রিকসকে বড় করতে চায়, অন্যদিকে সম্প্রসারণের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি নিয়েও সতর্ক।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও এই দ্বৈত বাস্তবতার একটি উদাহরণ। নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে ভারত স্পষ্ট করে যে তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পরে ঢাকা জানায়, এমন আমন্ত্রণের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হবে না।
এই ঘটনাকে শুধু একটি আমন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখলে এর কূটনৈতিক তাৎপর্য কমে যায়। কারণ বিমসটেকও দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। বাংলাদেশ বর্তমানে এর চেয়ার। ফলে ব্রিকসের মতো বৃহত্তর বৈশ্বিক দক্ষিণের মঞ্চ এবং বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক মঞ্চ-দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যপদ বা অংশীদারত্বের দরজা এখনো বাংলাদেশের জন্য স্পষ্টভাবে খোলেনি। ব্রিকসের বর্তমান অংশীদার দেশগুলোর তালিকাতেও দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ নেই।
বাংলাদেশের জন্য তাই ভারতের ভূমিকা একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে বাস্তবতা। ভারত ব্রিকসের ভেতরে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিকসের সম্পর্ক বাড়াতে ভারতের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আবার পাকিস্তানের সদস্যপদ নিয়ে ভারতের অবস্থান দেখিয়ে দিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ব্রিকসের দরজায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ভারত ব্রিকসকে কতটা সম্প্রসারণ করতে চায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো, ব্রিকস কি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর স্বার্থকে তার সম্প্রসারণের অংশ করতে পারবে? ভারত যদি ব্রিকসকে কেবল নিজের কৌশলগত স্বার্থের প্ল্যাটফর্ম না বানিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন, বাণিজ্য ও অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তার ভূমিকা হবে সহায়ক। আর যদি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সদস্যপদের সিদ্ধান্তে প্রাধান্য পায়, তাহলে ব্রিকসের ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতিনিধিত্বের দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিকস সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ তাই অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতের ওপর। তবে শুধু নয়াদিল্লির ওপর নয়। ব্রিকসকে শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে হবে, এটি কেবল বড় অর্থনীতির জোট নয়; বঞ্চিত দক্ষিণের দেশগুলোর জন্যও এটি সত্যিকারের একটি খোলা দরজা।



















