ঢাকা ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

সরকারের ৬ মাসে স্বস্তি কম, শঙ্কা বেশি

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৭:০৪:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৪৬ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

তারেক রহমানের সরকার ছয়মাস অতিক্রম করলো৷ এই ছয়মাসে রাষ্ট্র কেমন চালালেন সরকার, দেশজুড়ে চলছে সেই হিসেব- নিকেষ৷ নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাব মতে গত ছয় মাসে সূচকে স্বস্তি কম, গভীর শঙ্কা বেশি৷ চলতি হিসেব মতে, ১২ সূচকে স্বস্তির কথা বলা হয়েছে, শঙ্কায় আছে ১৯ টি৷

চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। একই সময়ে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারিয়েছে।

রাজধানীতে আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে সিপিডির আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি কাঠামোগত নানা সমস্যার মধ্যে ছিল এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল তৈরি না করায় এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিও খুব ইতিবাচক ছিল না। ফলে অর্থনীতির উত্তরণের ধারা দুর্বল অবস্থায় ছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে সরকারের একটি বড় দুর্বলতা দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সমন্বিত দলিল তৈরি না করা।

সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সিপিডি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়।

আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও মব সহিংসতা, নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি। এ ঘাটতি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯–২০ শতাংশ।

শিল্প খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে সিপিডি। জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ সময়ে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।

এর প্রভাবে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।

সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে চলে গেছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সিপিডির মূল্যায়নে সরকারের কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক হিসেবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আরএমজির বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সরকারকে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে সিপিডি। একই সঙ্গে জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশনসহ একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুত ও উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনেরও পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

সরকারের ৬ মাসে স্বস্তি কম, শঙ্কা বেশি

আপডেট সময় : ০৭:০৪:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

তারেক রহমানের সরকার ছয়মাস অতিক্রম করলো৷ এই ছয়মাসে রাষ্ট্র কেমন চালালেন সরকার, দেশজুড়ে চলছে সেই হিসেব- নিকেষ৷ নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাব মতে গত ছয় মাসে সূচকে স্বস্তি কম, গভীর শঙ্কা বেশি৷ চলতি হিসেব মতে, ১২ সূচকে স্বস্তির কথা বলা হয়েছে, শঙ্কায় আছে ১৯ টি৷

চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। একই সময়ে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারিয়েছে।

রাজধানীতে আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে সিপিডির আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি কাঠামোগত নানা সমস্যার মধ্যে ছিল এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল তৈরি না করায় এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিও খুব ইতিবাচক ছিল না। ফলে অর্থনীতির উত্তরণের ধারা দুর্বল অবস্থায় ছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে সরকারের একটি বড় দুর্বলতা দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সমন্বিত দলিল তৈরি না করা।

সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সিপিডি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়।

আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও মব সহিংসতা, নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি। এ ঘাটতি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯–২০ শতাংশ।

শিল্প খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে সিপিডি। জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ সময়ে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।

এর প্রভাবে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।

সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে চলে গেছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সিপিডির মূল্যায়নে সরকারের কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক হিসেবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আরএমজির বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সরকারকে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে সিপিডি। একই সঙ্গে জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশনসহ একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুত ও উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনেরও পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।