ঢাকা ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মুক্তাদির স্টুডিও ভাঙ্গচুর ও হাসপাতাল গুড়িয়ে ফেলায় বিস্মিত নগরবাসি, ৮ মাসে ৭২৩ চাঁদাবাজি মামলা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:১৪:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৪২ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাষ্ট্র সকল যান-মালের নিরাপত্তার দাযিত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তখনি শুরু হয়ে যায় ব্যাপক সমালোনা। মব থেকে  ‍থেকে শুরু করে প্রতিনিয়ত দেশের কোন না কোন প্রান্তে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। যা নিয়ে সাধারণ নাগরিক আতঙ্কিত।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে ৭২৩টি। এসব মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশেই তদন্তে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঢাকার সিএমএম কোর্টের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। এরপর রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। ৭২৩টি মামলার মধ্যে ৪২৫টির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এখনো তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা।

সম্প্রতি রাজধানীতে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনায় হতবাক রাজধানী বাসি।  রাজাধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউ গিনি প্রপার্টিজে  কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর, এবং  মিরপুর ১ নম্বরে ৫০ বছরের পুরোনো একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতাল রাতের আঁধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে ফেলার দৃশ্য।

এমন একটি ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না সাধারণ জনগন। সবার একটাই কথা এ কারণেই কি ৩৬ জুলাই আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাহলে কি এক দল গেলো আরেক এলো? তা না হয় গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাবি রাখা একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীণ কেনই বা ঘটবে এমন ঘটনা? এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করছেন সাধারণ নাগরিক।

যেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটারের দিকে সরকার প্রধানের প্রচন্ড আগ্রহ থাকা স্বত্বেও কেন একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙ্গচুর করা হবে? এ সব প্রশ্নের উত্তর তাড়া করে বেড়াচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। এদিকে রাতের আধারে পুলিশ ভ্যানের উপস্থিতিতে একটি বিল্ডিং ভেঙ্গে ফেলার দৃশ্যে সাধারণ মানুষ হতবাক। এ কেমন ঘটনা, স্বাধীন দেশে এও সম্ভব? এলাকা বাসীর কন্ঠ ক্ষোভের বহিপ্রকাশের পাশাপাশি ভীতিভাবটাও প্রকাশ পাচ্ছে। কারন কোন দিন আবার কি কারণে কে আবার তাদের বাড়িটিও ভেঙ্গে ফেলে কিনা।

এই ঘটনাটি স্থানীয়দের হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছে। যা কিনা টেলিভিশনগুলোতে স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়। সবার বক্তব্য একজন সুচতুর, বুদ্ধিদ্বীপ্ত, আইন বিশেষজ্ঞ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতেও কেন এমন ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়রা ক্ষোভের রেখে বলেন, দেশ রক্ষা,দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রণালয়ের কাজ। উনার কাজ শুধু সংসদে বকবক করা নয়।

তবে বিষয়টি  নজরে আসতেই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিন কড়া হুশিয়ারী দিয়ে বলেছেন, আইন অমান্যকারীদের ক্ষমা করা হবে না। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জড়িতদের আটক করা এবং তাদের যথাযথ শাস্তির ব্যাপারে স্থানীয়দের আশ্বস্থ্য করেছেন।

যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রীকে এ নিয়ে মিডিয়ায় বলতে দেখা গেছে, এ ঘটনার সাথে জড়িত ৯জনকে আটক করা হয়েছে। সেখানে  বিএনপি’র কোন লোকজন দেখতে পান নি তিনি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আর যদি থেকে থাকেন তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনান। এমন কি সেখানকার স্থানীয় সাংসদ জড়িত আছেন কিনা, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও—এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এটি ঢালাও অভিযোগ।

তিনি বলেন, মানিকদী নামাপাড়া এলাকার বিতর্কিত ওই জমি ক্যান্টনমেন্ট থানার আওতাধীন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সেখানে ‘নিউ গিনি প্রপার্টিজ’ নামে একটি বিল্ডার্স প্রতিষ্ঠান ও একজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার পক্ষের মধ্যে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ওই সামরিক কর্মকর্তার পক্ষে কিছু লোক রাতের অন্ধকারে জমিটি দখল করতে যায়। সেখানে গিয়ে তারা প্রাঙ্গণে ভাঙচুর চালায়। ওই স্থাপনার মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের একটি টিনশেডও ছিল, যেখানে কনটেন্ট তৈরির কাজ হতো। সেটিতেও ভাঙচুর হয়েছে।

পুলিশ বলছে, জমি নিয়ে একজন আবাসন নির্মাতা এবং এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার বিরোধের জেরে এই হামলা হয়ে থাকতে পারে। ওই ঘটনা নিয়ে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, যে ভদ্রলোক ফেইসবুকে লাইভে এসে অভিযোগটি করছেন, তিনি কি কোনো মামলা দায়ের করেছেন? করেননি। এই লাইভ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সালমান ঢালাওভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছেন বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর আরেকটি কনটেইন্ট তৈরি করে স্যোসাল মিডিয়ায় ছেড়েছেন মুক্তাদির। সেখানে তিনি প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ত আশ্বস্ত করবেন অপরাধীদের আটক/গ্রেফতার করার মধ্য দিয়ে নজির সৃষ্টি করা। সেটা না করে ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে বিষয়টি অন্যদিকে প্রবাহিত করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মুক্তাদির বলেন, জমি কার আমার তা দেখার বিষয় না। যদি অন্য কারো হয়েও থাকে তাহলে তো আগে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিলো এটা তুমি যাদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছো, এটি তাদের নয়। আগামী এতোদিনের মধ্যে তুমি জায়গা ছেড়ে দাও।

সালমান মুক্তাদির বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুরো বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার হাতে। কিন্তু আপনি এত দায়িত্বশীল জায়গায় থেকেও মন্তব্যে বললেন, সালমান মুক্তাদির মামলা দায়ের করেন নাই। এমন কথা বলে এখানে আপনি সরকারকে ছোট করে ফেলেছেন।

এটা ঠিক যে পুলিশের সহায়তা এখনো দেশজুড়ে অহরহ চাঁদাবাজি হচ্ছে।  নারায়নগঞ্জ ফতুল্লায় এক জাপান প্রবাসী বাঙালী বড় অঙ্কের চাাঁদা না দেওয়ায় তার গার্মেন্টস বন্ধ করে দেয় স্থানীয় চাাঁদাবাজরা। বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ করার পরেও কোন সুরাহা হয়নি। ফতুল্লায় থানায় অভিযোগ করেও কোন লাভ হয়নি। উল্টো প্রতারককে দিয়ে জাপান প্রবাসীর বিরুদ্ধে জমি দখলের ভুয়া মামলা দায়ের করে।

এভাবেই চাঁদাবাজ গোষ্ঠী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা দিব্যি অবৈধ কাজ করে চলেছে, আর ভোগান্তিতে পড়ছেন উদ্যোক্তরা। এভাবেই সারা দেশেই চলছে চাাঁদাবাজির মহড়া।

সবচে অবাক করা হচ্ছে, চাঁদাবাজি হয়, মামলা হয়, তদন্ত শেষে চার্জশিটও জমা পড়ে। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক মামলার বিচার শুরু হয় না। সম্প্রতি ঢাকার ৫০টি থানার চাঁদাবাজি ও দখলসংক্রান্ত মামলার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে ৭২৩টি। এসব মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশেই তদন্তে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঢাকার সিএমএম কোর্টের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। এরপর রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। ৭২৩টি মামলার মধ্যে ৪২৫টির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এখনো তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা।

সরকারি নথি পর্যালোচনা করে আরও দেখা গেছে, গত ২০ মাসে মহানগরে চাঁদাবাজির ৩৬৫টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ মামলায় আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়। আর ১৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, চার্জশিট জমা পড়ার পরও এসব মামলার অনেকগুলোর বিচার এখনো শুরু হয়নি। এরই মধ্যে কোনো কোনো আসামি জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আবার কিছু মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে।

রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ নতুন নয়। সরকার বা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পরও বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। সম্প্রতি মিরপুরের আড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাতেও চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ পাওয়া যায়।

এ অবস্থায় চাঁদাবাজির মামলায় জামিন দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কাজল।

তিনি বলেন, যেসব পেটি অফেন্সের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে বিচারকরা তুলনামূলকভাবে নমনীয় ছিলেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় সে অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত আসামিদের কারাগারে রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা দরকার বলে আমি মনে করি।

যেসব চাঁদাবাজির মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে, সেগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি জানান, ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ রাখার যেকোনো প্রক্রিয়া গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে, যাতে স্থগিতাদেশের বাধা দূর করে বিচারিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যায়।

আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান মনে করেন, চাঁদাবাজির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে এ ধরনের অপরাধ কমানো কঠিন। তিনি বলেন, চাঁদাবাজির মামলাগুলোতে চার্জশিট দেয়ার পরেও যেহেতু কোনো এভিডেন্স লাগে না, কোর্টে গিয়ে আর প্রমাণ করা যায় না এবং এই ঘটনাগুলোতে সাজাও হয় না, যে কারণে প্রকৃত যারা চাঁদাবাজ থাকে তারা সুযোগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

দেশের আইনে চাঁদাবাজির সাজা সর্বোচ্চ তিন বছর জেল, তবে মৃত্যুর হুমকি থাকলে তা বাড়তে পারে ১৪ বছর পর্যন্ত। তবে এই আইনেরও সংশোধন চান আইনজীবীরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মুক্তাদির স্টুডিও ভাঙ্গচুর ও হাসপাতাল গুড়িয়ে ফেলায় বিস্মিত নগরবাসি, ৮ মাসে ৭২৩ চাঁদাবাজি মামলা

আপডেট সময় : ০২:১৪:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্র সকল যান-মালের নিরাপত্তার দাযিত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তখনি শুরু হয়ে যায় ব্যাপক সমালোনা। মব থেকে  ‍থেকে শুরু করে প্রতিনিয়ত দেশের কোন না কোন প্রান্তে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। যা নিয়ে সাধারণ নাগরিক আতঙ্কিত।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে ৭২৩টি। এসব মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশেই তদন্তে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঢাকার সিএমএম কোর্টের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। এরপর রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। ৭২৩টি মামলার মধ্যে ৪২৫টির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এখনো তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা।

সম্প্রতি রাজধানীতে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনায় হতবাক রাজধানী বাসি।  রাজাধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউ গিনি প্রপার্টিজে  কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর, এবং  মিরপুর ১ নম্বরে ৫০ বছরের পুরোনো একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতাল রাতের আঁধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে ফেলার দৃশ্য।

এমন একটি ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না সাধারণ জনগন। সবার একটাই কথা এ কারণেই কি ৩৬ জুলাই আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাহলে কি এক দল গেলো আরেক এলো? তা না হয় গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাবি রাখা একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীণ কেনই বা ঘটবে এমন ঘটনা? এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করছেন সাধারণ নাগরিক।

যেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটারের দিকে সরকার প্রধানের প্রচন্ড আগ্রহ থাকা স্বত্বেও কেন একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙ্গচুর করা হবে? এ সব প্রশ্নের উত্তর তাড়া করে বেড়াচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। এদিকে রাতের আধারে পুলিশ ভ্যানের উপস্থিতিতে একটি বিল্ডিং ভেঙ্গে ফেলার দৃশ্যে সাধারণ মানুষ হতবাক। এ কেমন ঘটনা, স্বাধীন দেশে এও সম্ভব? এলাকা বাসীর কন্ঠ ক্ষোভের বহিপ্রকাশের পাশাপাশি ভীতিভাবটাও প্রকাশ পাচ্ছে। কারন কোন দিন আবার কি কারণে কে আবার তাদের বাড়িটিও ভেঙ্গে ফেলে কিনা।

এই ঘটনাটি স্থানীয়দের হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছে। যা কিনা টেলিভিশনগুলোতে স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়। সবার বক্তব্য একজন সুচতুর, বুদ্ধিদ্বীপ্ত, আইন বিশেষজ্ঞ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতেও কেন এমন ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়রা ক্ষোভের রেখে বলেন, দেশ রক্ষা,দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রণালয়ের কাজ। উনার কাজ শুধু সংসদে বকবক করা নয়।

তবে বিষয়টি  নজরে আসতেই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিন কড়া হুশিয়ারী দিয়ে বলেছেন, আইন অমান্যকারীদের ক্ষমা করা হবে না। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জড়িতদের আটক করা এবং তাদের যথাযথ শাস্তির ব্যাপারে স্থানীয়দের আশ্বস্থ্য করেছেন।

যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রীকে এ নিয়ে মিডিয়ায় বলতে দেখা গেছে, এ ঘটনার সাথে জড়িত ৯জনকে আটক করা হয়েছে। সেখানে  বিএনপি’র কোন লোকজন দেখতে পান নি তিনি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আর যদি থেকে থাকেন তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনান। এমন কি সেখানকার স্থানীয় সাংসদ জড়িত আছেন কিনা, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও—এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এটি ঢালাও অভিযোগ।

তিনি বলেন, মানিকদী নামাপাড়া এলাকার বিতর্কিত ওই জমি ক্যান্টনমেন্ট থানার আওতাধীন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সেখানে ‘নিউ গিনি প্রপার্টিজ’ নামে একটি বিল্ডার্স প্রতিষ্ঠান ও একজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার পক্ষের মধ্যে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ওই সামরিক কর্মকর্তার পক্ষে কিছু লোক রাতের অন্ধকারে জমিটি দখল করতে যায়। সেখানে গিয়ে তারা প্রাঙ্গণে ভাঙচুর চালায়। ওই স্থাপনার মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের একটি টিনশেডও ছিল, যেখানে কনটেন্ট তৈরির কাজ হতো। সেটিতেও ভাঙচুর হয়েছে।

পুলিশ বলছে, জমি নিয়ে একজন আবাসন নির্মাতা এবং এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার বিরোধের জেরে এই হামলা হয়ে থাকতে পারে। ওই ঘটনা নিয়ে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, যে ভদ্রলোক ফেইসবুকে লাইভে এসে অভিযোগটি করছেন, তিনি কি কোনো মামলা দায়ের করেছেন? করেননি। এই লাইভ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সালমান ঢালাওভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছেন বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর আরেকটি কনটেইন্ট তৈরি করে স্যোসাল মিডিয়ায় ছেড়েছেন মুক্তাদির। সেখানে তিনি প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ত আশ্বস্ত করবেন অপরাধীদের আটক/গ্রেফতার করার মধ্য দিয়ে নজির সৃষ্টি করা। সেটা না করে ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে বিষয়টি অন্যদিকে প্রবাহিত করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মুক্তাদির বলেন, জমি কার আমার তা দেখার বিষয় না। যদি অন্য কারো হয়েও থাকে তাহলে তো আগে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিলো এটা তুমি যাদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছো, এটি তাদের নয়। আগামী এতোদিনের মধ্যে তুমি জায়গা ছেড়ে দাও।

সালমান মুক্তাদির বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুরো বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার হাতে। কিন্তু আপনি এত দায়িত্বশীল জায়গায় থেকেও মন্তব্যে বললেন, সালমান মুক্তাদির মামলা দায়ের করেন নাই। এমন কথা বলে এখানে আপনি সরকারকে ছোট করে ফেলেছেন।

এটা ঠিক যে পুলিশের সহায়তা এখনো দেশজুড়ে অহরহ চাঁদাবাজি হচ্ছে।  নারায়নগঞ্জ ফতুল্লায় এক জাপান প্রবাসী বাঙালী বড় অঙ্কের চাাঁদা না দেওয়ায় তার গার্মেন্টস বন্ধ করে দেয় স্থানীয় চাাঁদাবাজরা। বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ করার পরেও কোন সুরাহা হয়নি। ফতুল্লায় থানায় অভিযোগ করেও কোন লাভ হয়নি। উল্টো প্রতারককে দিয়ে জাপান প্রবাসীর বিরুদ্ধে জমি দখলের ভুয়া মামলা দায়ের করে।

এভাবেই চাঁদাবাজ গোষ্ঠী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা দিব্যি অবৈধ কাজ করে চলেছে, আর ভোগান্তিতে পড়ছেন উদ্যোক্তরা। এভাবেই সারা দেশেই চলছে চাাঁদাবাজির মহড়া।

সবচে অবাক করা হচ্ছে, চাঁদাবাজি হয়, মামলা হয়, তদন্ত শেষে চার্জশিটও জমা পড়ে। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক মামলার বিচার শুরু হয় না। সম্প্রতি ঢাকার ৫০টি থানার চাঁদাবাজি ও দখলসংক্রান্ত মামলার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে ৭২৩টি। এসব মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশেই তদন্তে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঢাকার সিএমএম কোর্টের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে মোহাম্মদপুর থানায়। এরপর রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। ৭২৩টি মামলার মধ্যে ৪২৫টির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এখনো তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা।

সরকারি নথি পর্যালোচনা করে আরও দেখা গেছে, গত ২০ মাসে মহানগরে চাঁদাবাজির ৩৬৫টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ মামলায় আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়। আর ১৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, চার্জশিট জমা পড়ার পরও এসব মামলার অনেকগুলোর বিচার এখনো শুরু হয়নি। এরই মধ্যে কোনো কোনো আসামি জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আবার কিছু মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে।

রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ নতুন নয়। সরকার বা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পরও বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। সম্প্রতি মিরপুরের আড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাতেও চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ পাওয়া যায়।

এ অবস্থায় চাঁদাবাজির মামলায় জামিন দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কাজল।

তিনি বলেন, যেসব পেটি অফেন্সের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে বিচারকরা তুলনামূলকভাবে নমনীয় ছিলেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় সে অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত আসামিদের কারাগারে রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা দরকার বলে আমি মনে করি।

যেসব চাঁদাবাজির মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে, সেগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি জানান, ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ রাখার যেকোনো প্রক্রিয়া গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে, যাতে স্থগিতাদেশের বাধা দূর করে বিচারিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যায়।

আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান মনে করেন, চাঁদাবাজির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে এ ধরনের অপরাধ কমানো কঠিন। তিনি বলেন, চাঁদাবাজির মামলাগুলোতে চার্জশিট দেয়ার পরেও যেহেতু কোনো এভিডেন্স লাগে না, কোর্টে গিয়ে আর প্রমাণ করা যায় না এবং এই ঘটনাগুলোতে সাজাও হয় না, যে কারণে প্রকৃত যারা চাঁদাবাজ থাকে তারা সুযোগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

দেশের আইনে চাঁদাবাজির সাজা সর্বোচ্চ তিন বছর জেল, তবে মৃত্যুর হুমকি থাকলে তা বাড়তে পারে ১৪ বছর পর্যন্ত। তবে এই আইনেরও সংশোধন চান আইনজীবীরা।