ঢাকা ০১:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

কঠোর শাস্তির বার্তা দিয়ে জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন–২০২৬ পাশ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:০৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
  • / ৪৫ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জাতীয় সংসদে কঠোর শাস্তির বার্তা দিয়ে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬’ পাশ হয়েছে। দেশে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় সংসদে এই আইন পাস করা হয়। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ বাতিল করে নতুন এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, ডিজিটাল যুগের বাস্তবতায় অনলাইন জুয়া, আন্তর্জাতিক বেটিং নেটওয়ার্ক এবং ম্যাচ পাতানোর মতো অপরাধ দমনে আধুনিক ও সমন্বিত আইনগত কাঠামো গড়ে তোলাই হচ্ছে এ আইনের মূল উদ্দেশ্য।

আইনটিতে জুয়া, অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, বাজি, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, জুয়ার অর্থায়ন, জুয়ার বিজ্ঞাপন, জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানসহ মোট ২৪ ধরনের অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১৪ ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে অনলাইন জুয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় সহযোগিতা বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। একইভাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত প্রয়োজনে দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিংবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলায় অংশগ্রহণে অযোগ্যও ঘোষণা করতে পারবেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি শুধু জুয়া খেলাকেই নয়, বরং জুয়ার পুরো অবকাঠামোকে আইনের আওতায় এনেছে। অর্থাৎ ওয়েবসাইট পরিচালনা, অর্থ লেনদেন, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বিজ্ঞাপন প্রচার কিংবা অন্যকে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন জানান, বিলের বাহ্যিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে তিনি একমত। তবে কয়েকটি ধারায় ভবিষ্যতে অপব্যবহারের আশঙ্কা আছে।

তল্লাশি, জব্দ, জুয়ার স্থান সিলগালা, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন ও আইপি অ্যাড্রেস ব্লক করার ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, আদালতের অনুমতি ছাড়া এসব ক্ষমতা দিলে তা নাগরিক অধিকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

আখতার বলেন, শুরুতে অনলাইন অপরাধ দমনের কথা বলা হলেও পরে সেই আইন রাজনৈতিক বিরোধীমত দমনে ব্যবহার করা হয়েছিল। জুয়া প্রতিরোধের কথা বলে সরকারের সমালোচনাকারী কোনো ওয়েবসাইট, নিউজ পোর্টাল বা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়া হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আখতার হোসেনের আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন জুয়া সাইবার স্পেস, অনলাইন ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হয়। আদালতের অনুমতি নিতে গেলে অপরাধের আলামত বা স্থান দ্রুত সরিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে। বিভিন্ন আইনে পুলিশের তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে; এই বিলেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, পুলিশকে আদালতের অনুমতি ছাড়া মালামাল জব্দের ক্ষমতা দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার। এই আইনে পুলিশকে একেবারে ‘আনকন্ডিশনাল’ ক্ষমতা দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিলের বিদ্যমান ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আইনটি যুগোপযোগী হলেও অপব্যবহার ঠেকাতে জব্দের পর দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নেয়ার বিধান যুক্ত করা উচিত।

আলোচনা শেষে স্পিকার প্রথমে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবগুলো ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে তা নাকচ হয়। পরে বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবও নাকচ হয়। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
জুয়া প্রতিরোধ বিল পাসের পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আইনটির পক্ষে আমরা আছি, সরকারের প্রতি সাধুবাদও জানিয়েছি। কিছু সুনির্দিষ্ট ধারায় বিরোধী দলের সংশোধনী ছিল, সেগুলো সরকার গ্রহণ করলে আমরা সাদরে সমর্থন করতে পারতাম। আমরা আশা করব, যাতে এই আইনে সংশোধনীগুলো সরকার পরে বিবেচনা করে। কারণ, আইনটি প্রয়োগে গেলে ভালো করে বুঝতে পারব। এই আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

বিশ্বজুড়ে রয়েছে নিয়ন্ত্রণের নানা মডেল

বিশ্বের বিভিন্ন দেশও নিজ নিজ বাস্তবতায় জুয়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন অনুসরণ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েতব্রুনেই-এর মতো দেশে ধর্মীয় ও ফৌজদারি আইনের আওতায় অধিকাংশ ধরনের জুয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব দেশে জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং বিদেশিদের ক্ষেত্রে বহিষ্কারের মতো শাস্তির বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে সিঙ্গাপুর অনলাইন জুয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে Remote Gambling Act প্রণয়ন করেছে। অনুমোদন ছাড়া অনলাইন বেটিং পরিচালনা, অর্থ লেনদেন বা প্রচারণা চালানো সেখানে দণ্ডনীয় অপরাধ। চীন মূল ভূখণ্ডে প্রায় সব ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ রেখেছে; কেবল বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল ম্যাকাও-তে লাইসেন্সের মাধ্যমে ক্যাসিনো পরিচালনার অনুমতি রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ জুয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে লাইসেন্স, কর, বয়সসীমা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত এখনো মূলত ১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক আইনের ভিত্তিতে জুয়া নিয়ন্ত্রণ করে, যদিও বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা আইন রয়েছে। পাকিস্তানে অধিকাংশ ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ এবং ধর্মীয় ও দণ্ডবিধির আওতায় শাস্তির বিধান রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কঠোর আইন করলেই অনলাইন জুয়া নির্মূল করা সম্ভব নয়। আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারি, আন্তর্জাতিক অর্থপাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমানে অধিকাংশ অনলাইন জুয়ার সার্ভার বিদেশে পরিচালিত হয় এবং অর্থ লেনদেনও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অনলাইন বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং ও প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে খেলাধুলার স্বচ্ছতা রক্ষা, তরুণ সমাজকে জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক ও আইন বিশেষজ্ঞরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

কঠোর শাস্তির বার্তা দিয়ে জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন–২০২৬ পাশ

আপডেট সময় : ০৯:০৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

জাতীয় সংসদে কঠোর শাস্তির বার্তা দিয়ে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬’ পাশ হয়েছে। দেশে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় সংসদে এই আইন পাস করা হয়। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ বাতিল করে নতুন এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, ডিজিটাল যুগের বাস্তবতায় অনলাইন জুয়া, আন্তর্জাতিক বেটিং নেটওয়ার্ক এবং ম্যাচ পাতানোর মতো অপরাধ দমনে আধুনিক ও সমন্বিত আইনগত কাঠামো গড়ে তোলাই হচ্ছে এ আইনের মূল উদ্দেশ্য।

আইনটিতে জুয়া, অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, বাজি, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, জুয়ার অর্থায়ন, জুয়ার বিজ্ঞাপন, জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানসহ মোট ২৪ ধরনের অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১৪ ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে অনলাইন জুয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় সহযোগিতা বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। একইভাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত প্রয়োজনে দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিংবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলায় অংশগ্রহণে অযোগ্যও ঘোষণা করতে পারবেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি শুধু জুয়া খেলাকেই নয়, বরং জুয়ার পুরো অবকাঠামোকে আইনের আওতায় এনেছে। অর্থাৎ ওয়েবসাইট পরিচালনা, অর্থ লেনদেন, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বিজ্ঞাপন প্রচার কিংবা অন্যকে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন জানান, বিলের বাহ্যিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে তিনি একমত। তবে কয়েকটি ধারায় ভবিষ্যতে অপব্যবহারের আশঙ্কা আছে।

তল্লাশি, জব্দ, জুয়ার স্থান সিলগালা, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন ও আইপি অ্যাড্রেস ব্লক করার ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, আদালতের অনুমতি ছাড়া এসব ক্ষমতা দিলে তা নাগরিক অধিকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

আখতার বলেন, শুরুতে অনলাইন অপরাধ দমনের কথা বলা হলেও পরে সেই আইন রাজনৈতিক বিরোধীমত দমনে ব্যবহার করা হয়েছিল। জুয়া প্রতিরোধের কথা বলে সরকারের সমালোচনাকারী কোনো ওয়েবসাইট, নিউজ পোর্টাল বা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়া হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আখতার হোসেনের আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন জুয়া সাইবার স্পেস, অনলাইন ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হয়। আদালতের অনুমতি নিতে গেলে অপরাধের আলামত বা স্থান দ্রুত সরিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে। বিভিন্ন আইনে পুলিশের তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে; এই বিলেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, পুলিশকে আদালতের অনুমতি ছাড়া মালামাল জব্দের ক্ষমতা দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার। এই আইনে পুলিশকে একেবারে ‘আনকন্ডিশনাল’ ক্ষমতা দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিলের বিদ্যমান ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আইনটি যুগোপযোগী হলেও অপব্যবহার ঠেকাতে জব্দের পর দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নেয়ার বিধান যুক্ত করা উচিত।

আলোচনা শেষে স্পিকার প্রথমে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবগুলো ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে তা নাকচ হয়। পরে বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবও নাকচ হয়। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
জুয়া প্রতিরোধ বিল পাসের পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আইনটির পক্ষে আমরা আছি, সরকারের প্রতি সাধুবাদও জানিয়েছি। কিছু সুনির্দিষ্ট ধারায় বিরোধী দলের সংশোধনী ছিল, সেগুলো সরকার গ্রহণ করলে আমরা সাদরে সমর্থন করতে পারতাম। আমরা আশা করব, যাতে এই আইনে সংশোধনীগুলো সরকার পরে বিবেচনা করে। কারণ, আইনটি প্রয়োগে গেলে ভালো করে বুঝতে পারব। এই আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

বিশ্বজুড়ে রয়েছে নিয়ন্ত্রণের নানা মডেল

বিশ্বের বিভিন্ন দেশও নিজ নিজ বাস্তবতায় জুয়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন অনুসরণ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েতব্রুনেই-এর মতো দেশে ধর্মীয় ও ফৌজদারি আইনের আওতায় অধিকাংশ ধরনের জুয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব দেশে জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং বিদেশিদের ক্ষেত্রে বহিষ্কারের মতো শাস্তির বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে সিঙ্গাপুর অনলাইন জুয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে Remote Gambling Act প্রণয়ন করেছে। অনুমোদন ছাড়া অনলাইন বেটিং পরিচালনা, অর্থ লেনদেন বা প্রচারণা চালানো সেখানে দণ্ডনীয় অপরাধ। চীন মূল ভূখণ্ডে প্রায় সব ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ রেখেছে; কেবল বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল ম্যাকাও-তে লাইসেন্সের মাধ্যমে ক্যাসিনো পরিচালনার অনুমতি রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ জুয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে লাইসেন্স, কর, বয়সসীমা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত এখনো মূলত ১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক আইনের ভিত্তিতে জুয়া নিয়ন্ত্রণ করে, যদিও বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা আইন রয়েছে। পাকিস্তানে অধিকাংশ ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ এবং ধর্মীয় ও দণ্ডবিধির আওতায় শাস্তির বিধান রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কঠোর আইন করলেই অনলাইন জুয়া নির্মূল করা সম্ভব নয়। আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারি, আন্তর্জাতিক অর্থপাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমানে অধিকাংশ অনলাইন জুয়ার সার্ভার বিদেশে পরিচালিত হয় এবং অর্থ লেনদেনও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অনলাইন বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং ও প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে খেলাধুলার স্বচ্ছতা রক্ষা, তরুণ সমাজকে জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক ও আইন বিশেষজ্ঞরা।