ঢাকা ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৪২:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৪৬ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

হলো, আমাদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো হলো। আমাদের পক্ষে আইনজীবি ছিলেন ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব। সেখানে সালাউদ্দিন ভাই ইংরেজিতে যে বক্তব্য রেখেছিলেন তা শুনে সবাই স্তব্ধ, আমাদের আইন জীবি মুগ্ধ হয়ে বললেন, ওরা তো আমার চেয়েও বড় আইন জীবি।

মিন্টুরোডের আদালতের বিচারে আমাদের বিপক্ষে যে রায় হয়েছে তাতে আটজন বেখসুর খালাস পেয়ে যান। আমাদের চারজনের জেল হয়। আমার (গোলাম রাব্বানি হেলাল) ৬ মাস, কাজী সালাউদ্দিনের ৩ মাস, আশরাফ হোসেন চুন্নুর ১ বছরও মোহাম্মদ আনোয়ারের ৩ মাস জেল হয়।

আমাদের আপাতত সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। প্রত্যেকের আসামী নম্বর হয়ে যায়। আমার নম্বর ছিলো ২৬২। জেলে কয়েদীদের নাম ধরে ডাকা হয় না। জীবনে ওই প্রথম জেলে প্রবেশ করলাম, প্রথম রাতেই ফ্লোরে শুয়ে রাত কাটাতে হলো। সকালে ঘুম ভাঙলো, নাস্তার জন্য আমার নম্বর ধরে ডাক দেয়া হলো। যেই ডাক দেওয়া লোকটি আমাদের দেখতে পেলো নিজ থেকেই লজ্জায় ভেঙ্গে পড়লো। এরপর তো আমাদের জন্য স্পেশাল নাস্তা।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের যখন হ্যান্ডক্যাপ এবং কোমরে দড়ি বেধে ঢাকার বাহিরের জেল হাজতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, ঠিক তখনি মহা বিপত্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। আমি আর আনোয়ার রাজশাহী জেলে এবং সালাউদ্দিন ভাইও চুন্নুকে রাজশাহীর জেলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো।

কিন্ত পরিস্থিতি এমন যে তারা আমাদের কি করে জেলে নিবে, চারিদিকে ফুটবল ভক্তদের ভিড়ে পুলিশ দিশেহারা। ভক্তদের ভিড়ে কমলাপুর স্টেশানের ট্রেনেই ওঠাতে পারেনি। সেখান থেকে পুনরায় রমনা থানায় ফেরত আনতে বাধ্য হয় পুলিশ। ওখানে দেখেছি ফুটবল ভক্তদের সে কি কান্নার রোল। ওই দৃশ্যটা সত্যি আমার কাছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। বুজতে পারলাম সত্যিকার অর্থে নিজের মূল্যায়ন। এতোদিন ফুটবল মাঠের ভালো বাসা দেখেছিলাম। সেটা খেলেছিলাম বলেই। কিন্তু মাঠের বাহিরে দেখলাম ওই প্রথম। নিজেকে অন্যরকম ভাবে চিনতে পারলাম, বুজতে শিখলাম। আমদের ওই দিনকার ছবিগুলো ধরা পড়ে প্রয়াত ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক আলম ভাইয়ের ক্যামেরায়। তার সুবাদেই পরের দিন পত্রিকাগুলোতে আমাদের হ্যান্ডক্যাপও কোমরবাধা ছবিগুলো ছাপানো হয়। যা কিনা সারা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছিলো। ম্যারাডোনা তো এক ইন্টারভিউতে তখনকার সরকারকে পাগল সরকার বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

পুলিশ দিনের আলোতে ট্রেনে ওঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদের রাতের বেলায় ট্রেনে করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। নিরাপত্তার কারনে আসামী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের জন্য কেবিন বরাদ্দ করা হয়। এরপর তো প্রতিটি স্টেশানে রাখা হয়েছিলো পুলিশ।

পথে পথে নতুন অভিজ্ঞতা। মনের ভিতর নানা আতঙ্ক ঘুরপাক। এরই মধ্যে দুষ্টমিটাও মিস ছিলো না। কখনো পুলিশের সঙ্গে কখনো নিজেদের মধ্যে। বাহাদুরাবাদ ঘাটে কৌশল করে পুলিশের কাছ থেকে হ্যান্ডক্যাপটা খোলার ব্যবস্থা করি। ওখানে সাধারন মানুষ আমাদের কাছে পেয়ে বেশ আনন্দ পেয়েছিলো। ওরা সবাই আমাদের ভক্ত ছিলেন। মজার ব্যাপার আমরা যখন ঘাটে পৌছালাম ওই পাড়ে বিশ থেকে ত্রিশ পুলিশ আমাদের রিসিভ করেছিলো। কিন্তু রিসিভ করতে এসে তারা আসামী খুজে পাচ্ছিলো না। হ্যান্ডক্যাপ পরা না দেখে তারা অবাক। এ জন্য সেখানকার পুলিশ অফিসারের কতোগুলো কড়া কথাও শুনতে হয়েছিলো সঙ্গে থাকা পুলিশদের।

সেখান থেকে আবারো ট্রেনে। কিন্তু এখানের পুলিশ অফিসারটি ছিলো কিছু খিটখিটে। পুলিশদের কড়া চার্জ, আসামীদের আবার কিসের কেবিন। বিরক্ত এবং খারাপ লেগেছিলো ওই পুলিশ অফিসারের আজে-বাজে কথা শুনে। কিন্তু ট্রেনে আমাদের এই খারাপ সময়টা বেশিক্ষন থাকেনি। একটা ছোট মেয়ে আমাদের দেখেই অটোগ্রাফ নিতে হাত বাড়িয়ে দিলো কলম আর প্যাড নিয়ে। তারা পত্রিকা দেখে আমদের চিনতে পেরেছিলো। এছাড়া ওই মেয়েটিও ফুটবল সম্পর্কে ভালো খোঁজখবর রাখতো। পরে ওর সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারলাম ডিআইজি’র মেয়ে। আমি তাৎক্ষনিক সুযোগটা কাজে লাগিয়ে খিটখিটে পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগটা তার কাছে দিলাম। শুনেই সে ক্ষুদ্ধ মেয়েটি তার মায়ের কাছে কি যেন বলতেই পরক্ষনে একটি বারের জন্যও পুলিশ অফিসারটিকে দেখিনি।

এরপর ঈশ্বরদি স্টেশান থেকে আমরা চারজন বিভক্ত হয়ে পড়ি। সেখানে নেমে এসেছিলো কিছুটা বিষাদের ছায়া। একটা জার্নিতে আমরা এক সঙ্গে ছিলাম এখন আলাদা হয়ে গেলাম। সত্যিই খারাপ লেগে উঠেছিলো। ঠিক সন্ধ্যায় জেলে পৌছালাম আমরা। সেখানে যেন আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করেছিলো আমাদের জন্য। প্রথমে আমাদের সেলে রাখা হয় (যেখানে ক্রিমিনাল আসামীদের রাখা হয়)। লোহার দরজা,সব দিক খোলা। এক কোনায় পটের মতো বাথরুম। উল্টো দিক থেকে একজন কয়েদি বলে ওঠলো ভাই বিবিসি থেকে তো আপনাদের কথা বলা হচ্ছে। এভাবে সাতদিন কেটে যায়। এর কিছুদিন পর জেলে আমাদের ডিভিশান দেয়া হয়। যারা ডিভিশানে থাকেন তাদের সেবার জন্য ফালতু (সেবক) নিয়োগ থাকে। আমার আবার দাতের ব্যথা ছিলো। বাহিরে থেকে ডাক্তার আনা হয়। ডাক্তার বললো দাঁত উঠিয়ে ফেলতে হবে। আমি তাতে রাজি হইনি। পরের দিন আবারো ডাক্তার এলো। কিন্তু পরক্ষনে দেখলাম কি সে ডাক্তার না, আবাহনীর পেডী ভাই। কম্পাউন্ডার সেজে সে জেলের ভিতর প্রবেশ করেছিলো।

জেলের এ কদিনে ফালতুর সঙ্গে বেশ ভাব হলো। কিছুটা দূর্বলও হয়ে পড়েছিলাম তাদের গল্প শুনে। তার কি ভাবে জেলে আসা হলো। শুনে অবাক লাগলো, যে দোষ করেছে সে জেল খাটছে না উল্টো যার দোষ করা হয়েছে সেই কিনা জেলে। শুনে খুব খারাপ লেগেছিলো। সে আরেক কাহিনী। আরেকদিন না হয় বলা যাবে। নাম ঠিক মনে আসছে না ফালতুর (সেবকের)। তবে তার অসহায়ত্বের কথা শুনে তাকে কিছু আর্থিক ভাবে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিই। তাকে বলেছি তুমি জেল থেকে মুক্তি পেলে ঢাকায় আবাহনী ক্লাবে  গিয়ে দেখা করবা। এরই মধ্যে রাজশাহীর জেলে সেকি জামাই আদর। কখনো ওমুক কখনো তমুক আমাদের খাবার নিয়ে হাজির। প্রয়াত সংগঠকও বিওএ’র মহাসচিব জাফর ইমাম প্রতিদিন আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। এরই মধ্যে এরশাদের হস্তক্ষেপে সতের দিন পর আমাদের জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। একটি ঈদও ইতিমধ্যে জেলে উযদযাপন করেছি আমরা। জেলের ঈদ, কোরবানীর ঈদ। ভিন্ন এক ঈদ।

জেল থেকে মুক্তির পর আমাদের ফুলদিয়ে বরণ করা হলো। ঠিক একই সময় সালাউদ্দিনও চুন্নু ভাইকেও ফুলদিয়ে বরন করা হয়েছে। এখানেও পেয়েছিলাম ভিন্ন আমেজ। শেষের দিকের ঘটনাটা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়। যে ফালতুকে সাহায্য করবো বলে কথা দিয়ে ছিলাম। সে একদিন সন্ধ্যায়  ক্লাবে এসে হাজির। তাকে জিজ্ঞেস করলাম কখন ঢাকায় এসেছিলে। সে উত্তরে বললো সকালে। আমি তো অবাক! তাহলে এতো দেরি কেন? কমলাপুর থেকে জিজ্ঞেস করতে করতেই হেটে এসে পড়লাম। পরের কথা শুনেই তো সে কি হাসি- রাজাশাহীর ভাষায় ‘ লাল বাতি দেখেছি, গাড়ি থেমে গেছে, আমিও থেমে গেছি।’

 

 

ট্রেনে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চার তারকা ফুটবলারকে সৌজন্য ছবি

সবুজ মাঠের চৌহদ্দিতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা বিলীন করে দেওয়া খেলার জগতের মানুষ কি সরকার উত্খাত করতে পারে? আজ থেকে ৩১ বছর আগে, বাংলাদেশের শীর্ষ চার ফুটবল তারকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগই আনা হয়েছিল। সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট তিন দশক আগে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরে জেলহাজতে যেতে হয়েছিল দেশের চার তারকা ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল আর কাজী আনোয়ারকে। আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথে রেফারির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ থেকে সৃষ্ট গোলযোগের সম্পূর্ণ দায়ভার এই চার খেলোয়াড়ের ঘাড়ে দিয়ে সামরিক আদালত সংক্ষিপ্ত বিচারের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাঁদের দণ্ডিত করেছেন বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে। তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্রে লেখা হয়েছিল, তাঁরা নাকি সামরিক সরকারকে উত্খাতের প্রাথমিক ষড়যন্ত্র করেছেন! বাংলাদেশের ফুটবল তো বটেই, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরিয়ে আটকের ঘটনা বিশ্ব ফুটবলেও এক ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে অভিহিত হয়ে আছে।
নিরন্তর লজ্জার এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দেশে তখন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন সবে ছয় মাস অতিক্রম করেছে। গোটা দেশই তখন পরিণত হয়েছে সুবিশাল এক কারাগারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত বসিয়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আর বিভিন্ন পেশার মানুষের দোষ-গুণ খোঁজা শুরু হয়। বিভিন্ন অভিযোগে সামরিক আইনের অধীনেই তাঁদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয় বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ডের নির্দেশনা। শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিস্থিতির শিকার যে ওই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলোয়াড়েরাও হবেন, সেটা কিন্তু ছিল কল্পনারও অতীত।

 

 

 

ফুটবলের ‘ব্ল্যাক সেপ্

 

ট্রেনে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চার তারকা ফুটবলারকে সৌজন্য ছবি

সবুজ মাঠের চৌহদ্দিতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা বিলীন করে দেওয়া খেলার জগতের মানুষ কি সরকার উত্খাত করতে পারে? আজ থেকে ৩১ বছর আগে, বাংলাদেশের শীর্ষ চার ফুটবল তারকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগই আনা হয়েছিল। সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট তিন দশক আগে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরে জেলহাজতে যেতে হয়েছিল দেশের চার তারকা ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল আর কাজী আনোয়ারকে। আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথে রেফারির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ থেকে সৃষ্ট গোলযোগের সম্পূর্ণ দায়ভার এই চার খেলোয়াড়ের ঘাড়ে দিয়ে সামরিক আদালত সংক্ষিপ্ত বিচারের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাঁদের দণ্ডিত করেছেন বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে। তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্রে লেখা হয়েছিল, তাঁরা নাকি সামরিক সরকারকে উত্খাতের প্রাথমিক ষড়যন্ত্র করেছেন! বাংলাদেশের ফুটবল তো বটেই, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরিয়ে আটকের ঘটনা বিশ্ব ফুটবলেও এক ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে অভিহিত হয়ে আছে।
নিরন্তর লজ্জার এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দেশে তখন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন সবে ছয় মাস অতিক্রম করেছে। গোটা দেশই তখন পরিণত হয়েছে সুবিশাল এক কারাগারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত বসিয়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আর বিভিন্ন পেশার মানুষের দোষ-গুণ খোঁজা শুরু হয়। বিভিন্ন অভিযোগে সামরিক আইনের অধীনেই তাঁদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয় বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ডের নির্দেশনা। শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিস্থিতির শিকার যে ওই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলোয়াড়েরাও হবেন, সেটা কিন্তু ছিল কল্পনারও অতীত।

সামরিক শাসনের অধীনে দেশের খেলাধুলা থেমে ছিল না। পূর্ণোদ্যমেই এগিয়ে চলছিল সিনিয়ন ডিভিশন ফুটবল লিগ। সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গে যাঁদের সখ্য ছিল, যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন ওই সময়ের ফুটবল উন্মাদনা, তাঁদের পক্ষেই কেবল অনুধাবন করা সম্ভব ওই সময়টাকে।

যা-ই হোক, লিগের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডান। দেশের সেরা ফুটবলাররাও একই সঙ্গে মুখোমুখি নিজেদের ক্রীড়াশৈলী উজাড় করে দিয়ে নিজ নিজ দলকে শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে জায়গা করে দিতে। পুরো দেশ বিভক্ত দুই শিবিরে। ঢাকা স্টেডিয়াম পরিপূর্ণ কানায় কানায়। রেডিওতে কান রেখে, টেলিভিশনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেশের মানুষ ব্যাকুল প্রিয় দলের সাফল্যের সঙ্গী হতে। টান টান উত্তেজনার এই ম্যাচের একপর্যায়ে মোহামেডান এগিয়ে গেল এক গোলে। আবাহনীর খেলোয়াড়েরা তখন মরিয়া নীল-হলুদ জার্সির মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে। এমনই একটি পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টেডিয়ামে ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা। আবাহনীর অধিনায়ক কাজী আনোয়ারের একটি ক্রস বাঁক খেয়ে গোলে প্রবেশের মুখে তা রুখে দেন মোহামেডানের তরুণ গোলরক্ষক মোহাম্মদ মহসীন। মহসীন ওই ম্যাচে দেশের ফুটবলের মহাতারকা কাজী সালাউদ্দিনের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দারুণ উজ্জীবিত। মহসীন আনোয়ারের ক্রসটি ফিরিয়ে দিলেও তা মুহূর্তের জন্য গোললাইন স্পর্শ করেছিল। আবাহনীর খেলোয়াড়েরা মরিয়া হয়ে দাবি জানাতে থাকেন গোলের। কিন্তু রেফারি মুনীর হোসেন আর লাইন্সম্যান অনড় থাকেন তাঁদের সিদ্ধান্তে। খেলায় সৃষ্টি হয় নিদারুণ অচলাবস্থার। মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। কাঁদানে গ্যাস ছোড়া শুরু করে পুলিশ সংঘর্ষরত সাপে-নেউলে আবাহনী আর মোহামেডান-সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে।উত্তেজিত সমর্থকেরা স্টেডিয়ামের বাইরে পল্টন-জিপিও, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, বিজয়নগর প্রভৃতি এলাকায়ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অগ্নস্ফুিলিঙ্গের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সেই সন্ধ্যার ঢাকা। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধে ঢেকে যায় ঢাকার আকাশ-বাতাস। বলাবাহুল্য, খেলাটি আর সমাপ্তির মুখ দেখেনি। লিগের আইন অনুযায়ী মোহামেডানকে ওই ম্যাচে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় ২-০ গোলে।

খেলার মাঠে সংঘর্ষ নতুন কোনো ঘটনা নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময় খেলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচের গোলযোগকে কেন্দ্র করে ৩১ বছর আগে এই বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা।

মাঠের গোলযোগ একটু কমলে খেলোয়াড়েরা ফিরে যান যাঁর যাঁর অবস্থানে। ওই সময় স্টেডিয়ামসংলগ্ন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনে ছিল জাতীয় ফুটবল দলের ক্যাম্প। লিগের ফাঁক-ফোকরে জাতীয় দলে ডাক পাওয়া ফুটবলাররা ক্যাম্পে অবস্থান করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দিল্লি এশিয়ান গেমসের। আবাহনী-মোহামেডানের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় ছিলেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। সেদিন মাঠে উপস্থিত কয়েকজন খেলোয়াড়ই ক্যাম্পে গিয়ে গা এলিয়ে দেন বিছানায়। অনেকেই চলে যান যাঁর যাঁর বাড়িতে। কেউ কেউ চলে যান নিজ ক্লাবে। কিন্তু তাঁরা তখনো জানতেন না, কী ভয়ংকর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে তাঁদের সামনে।

এভাবেই হাতে হাতকড়া পরিয়ে সেদিন বসিয়ে রাখা হয়েছিল দেশসেরা চার ফুটবলারকে। বাঁ দিক থেকে হেলাল, সালাউদ্দিন, চুন্নু ও আনোয়ার

রাত গভীর হলে সেনাবাহিনী, বিডিআর আর পুলিশের একটি যৌথবাহিনী অভিযান চালায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জাতীয় দলের ক্যাম্পে। তাঁদের আরও একটি দল অভিযান চালায় ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাবে। কাজী সালাউদ্দিনকে ধরতে যৌথবাহিনী অভিযান চালায় তাঁর গুলশানের বাড়িতে।
গোলাম রব্বানী হেলালসহ আবাহনীর প্রায় বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে আটক করা হয় আবাহনী ক্লাব থেকে। জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় কাজী আনোয়ার আর আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নুকে। আগেই বলা হয়েছে, সালাউদ্দিনকে আটক করা হয় তাঁর গুলশানের বাসা থেকে।
প্রথম আলো ডটকমের কাছে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন গোলাম রব্বানী হেলাল। আবাহনী ক্লাবে খেলোয়াড়দের গ্রেপ্তার করতে যৌথবাহিনী ছিল রীতিমতো যুদ্ধসাজে, ‘আমি খেলার পর আবাহনী ক্লাবে ফিরে নিজের ঘরে শুয়ে ছিলাম। শরীরে বড় ম্যাচের ক্লান্তি। মনটাও খারাপ। গোলযোগের কারণে খেলা পণ্ড হয়ে যাওয়ায় লিগে আবাহনীর ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবছিলাম। হঠাত্ ক্লাবের আশপাশে বেশ কয়েকটা সামরিক ট্রাক, জিপ ইত্যাদির আওয়াজ শুনতে পাই। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, এলাহী অবস্থা! ক্লাবের চারপাশ পুলিশ আর সেনাসদস্যরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। তাঁরা এমন একটা ভাব করছিলেন, যেন ভয়ংকর কোনো অপরাধীকে ধরতে এসেছেন। তাঁরা যে আমাদেরই ধরতে এসেছেন, এটা বুঝতে অনেকটা সময় লেগেছিল। সেদিন রাতে আমিসহ আবাহনীর খেলোয়াড়দের নিয়ে যাওয়া হয় রমনা থানায়।’

পরদিন সকালে তাঁদের শাহবাগ পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষে এনে জড়ো করা হয়। হেলাল জানান, পুরো সময়টাতেই খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরানো ছিল। আবাহনীতে ওই সময় খেলতেন দুই শ্রীলঙ্কান ফুটবলার—অশোকা রবীন্দ্র আর পাকির আলী। যৌথবাহিনীর হাতে নাকাল হতে হয় তাঁদেরও। শাহবাগ পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকেই সালাউদ্দিন, আনোয়ার, হেলাল ও চুন্নুকে আলাদা করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। শুরু হয় তাঁদের জেলজীবন।

সামরিক আদালতের বিচারে সালাউদ্দিন ও চুন্নুকে তিন মাসের জেল দেওয়া হয়। হেলালকে ছয় মাস আর কাজী আনোয়ারকে দেওয়া হয় এক বছরের কারাদণ্ড। ঢাকার বাইরে জেল খাটতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশের এই শীর্ষ ফুটবলারদের।

হেলাল বলেন, ‘সামরিক আদালতে আমাদের বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, আমরা নাকি সামরিক সরকার উত্খাতের প্রথম ষড়যন্ত্রকারী। কী হাস্যকর অভিযোগ, ভেবে দেখুন।’

ওই সময় খেলোয়াড়দের মনের অবস্থা কী ছিল, সেটা নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। হেলাল বলেন, ‘ওপর দিয়ে হাসি-খুশি থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ভেতর দিয়ে আমরা সবাই একেবারেই ভেঙে পড়েছিলাম। সালাউদ্দিন ভাই খুব বড় ঘরের ছেলে। তাঁর মতো মানুষকে থানায় সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে থাকতে হয়েছে। আনোয়ার, চুন্নু, আমি—কেউই এ ধরনের কষ্টকর জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম না। সবচেয়ে অবাক লাগত যা, তা হলো, আমাদের বিরুদ্ধে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল। আমরা সবাই ফুটবল নিয়েই থাকতাম। সারাক্ষণ ওটা নিয়েই ভাবতাম। আমরা কী করে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্র করি!’

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

আপডেট সময় : ১১:৪২:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

হলো, আমাদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো হলো। আমাদের পক্ষে আইনজীবি ছিলেন ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব। সেখানে সালাউদ্দিন ভাই ইংরেজিতে যে বক্তব্য রেখেছিলেন তা শুনে সবাই স্তব্ধ, আমাদের আইন জীবি মুগ্ধ হয়ে বললেন, ওরা তো আমার চেয়েও বড় আইন জীবি।

মিন্টুরোডের আদালতের বিচারে আমাদের বিপক্ষে যে রায় হয়েছে তাতে আটজন বেখসুর খালাস পেয়ে যান। আমাদের চারজনের জেল হয়। আমার (গোলাম রাব্বানি হেলাল) ৬ মাস, কাজী সালাউদ্দিনের ৩ মাস, আশরাফ হোসেন চুন্নুর ১ বছরও মোহাম্মদ আনোয়ারের ৩ মাস জেল হয়।

আমাদের আপাতত সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। প্রত্যেকের আসামী নম্বর হয়ে যায়। আমার নম্বর ছিলো ২৬২। জেলে কয়েদীদের নাম ধরে ডাকা হয় না। জীবনে ওই প্রথম জেলে প্রবেশ করলাম, প্রথম রাতেই ফ্লোরে শুয়ে রাত কাটাতে হলো। সকালে ঘুম ভাঙলো, নাস্তার জন্য আমার নম্বর ধরে ডাক দেয়া হলো। যেই ডাক দেওয়া লোকটি আমাদের দেখতে পেলো নিজ থেকেই লজ্জায় ভেঙ্গে পড়লো। এরপর তো আমাদের জন্য স্পেশাল নাস্তা।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের যখন হ্যান্ডক্যাপ এবং কোমরে দড়ি বেধে ঢাকার বাহিরের জেল হাজতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, ঠিক তখনি মহা বিপত্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। আমি আর আনোয়ার রাজশাহী জেলে এবং সালাউদ্দিন ভাইও চুন্নুকে রাজশাহীর জেলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো।

কিন্ত পরিস্থিতি এমন যে তারা আমাদের কি করে জেলে নিবে, চারিদিকে ফুটবল ভক্তদের ভিড়ে পুলিশ দিশেহারা। ভক্তদের ভিড়ে কমলাপুর স্টেশানের ট্রেনেই ওঠাতে পারেনি। সেখান থেকে পুনরায় রমনা থানায় ফেরত আনতে বাধ্য হয় পুলিশ। ওখানে দেখেছি ফুটবল ভক্তদের সে কি কান্নার রোল। ওই দৃশ্যটা সত্যি আমার কাছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। বুজতে পারলাম সত্যিকার অর্থে নিজের মূল্যায়ন। এতোদিন ফুটবল মাঠের ভালো বাসা দেখেছিলাম। সেটা খেলেছিলাম বলেই। কিন্তু মাঠের বাহিরে দেখলাম ওই প্রথম। নিজেকে অন্যরকম ভাবে চিনতে পারলাম, বুজতে শিখলাম। আমদের ওই দিনকার ছবিগুলো ধরা পড়ে প্রয়াত ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক আলম ভাইয়ের ক্যামেরায়। তার সুবাদেই পরের দিন পত্রিকাগুলোতে আমাদের হ্যান্ডক্যাপও কোমরবাধা ছবিগুলো ছাপানো হয়। যা কিনা সারা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছিলো। ম্যারাডোনা তো এক ইন্টারভিউতে তখনকার সরকারকে পাগল সরকার বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

পুলিশ দিনের আলোতে ট্রেনে ওঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদের রাতের বেলায় ট্রেনে করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। নিরাপত্তার কারনে আসামী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের জন্য কেবিন বরাদ্দ করা হয়। এরপর তো প্রতিটি স্টেশানে রাখা হয়েছিলো পুলিশ।

পথে পথে নতুন অভিজ্ঞতা। মনের ভিতর নানা আতঙ্ক ঘুরপাক। এরই মধ্যে দুষ্টমিটাও মিস ছিলো না। কখনো পুলিশের সঙ্গে কখনো নিজেদের মধ্যে। বাহাদুরাবাদ ঘাটে কৌশল করে পুলিশের কাছ থেকে হ্যান্ডক্যাপটা খোলার ব্যবস্থা করি। ওখানে সাধারন মানুষ আমাদের কাছে পেয়ে বেশ আনন্দ পেয়েছিলো। ওরা সবাই আমাদের ভক্ত ছিলেন। মজার ব্যাপার আমরা যখন ঘাটে পৌছালাম ওই পাড়ে বিশ থেকে ত্রিশ পুলিশ আমাদের রিসিভ করেছিলো। কিন্তু রিসিভ করতে এসে তারা আসামী খুজে পাচ্ছিলো না। হ্যান্ডক্যাপ পরা না দেখে তারা অবাক। এ জন্য সেখানকার পুলিশ অফিসারের কতোগুলো কড়া কথাও শুনতে হয়েছিলো সঙ্গে থাকা পুলিশদের।

সেখান থেকে আবারো ট্রেনে। কিন্তু এখানের পুলিশ অফিসারটি ছিলো কিছু খিটখিটে। পুলিশদের কড়া চার্জ, আসামীদের আবার কিসের কেবিন। বিরক্ত এবং খারাপ লেগেছিলো ওই পুলিশ অফিসারের আজে-বাজে কথা শুনে। কিন্তু ট্রেনে আমাদের এই খারাপ সময়টা বেশিক্ষন থাকেনি। একটা ছোট মেয়ে আমাদের দেখেই অটোগ্রাফ নিতে হাত বাড়িয়ে দিলো কলম আর প্যাড নিয়ে। তারা পত্রিকা দেখে আমদের চিনতে পেরেছিলো। এছাড়া ওই মেয়েটিও ফুটবল সম্পর্কে ভালো খোঁজখবর রাখতো। পরে ওর সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারলাম ডিআইজি’র মেয়ে। আমি তাৎক্ষনিক সুযোগটা কাজে লাগিয়ে খিটখিটে পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগটা তার কাছে দিলাম। শুনেই সে ক্ষুদ্ধ মেয়েটি তার মায়ের কাছে কি যেন বলতেই পরক্ষনে একটি বারের জন্যও পুলিশ অফিসারটিকে দেখিনি।

এরপর ঈশ্বরদি স্টেশান থেকে আমরা চারজন বিভক্ত হয়ে পড়ি। সেখানে নেমে এসেছিলো কিছুটা বিষাদের ছায়া। একটা জার্নিতে আমরা এক সঙ্গে ছিলাম এখন আলাদা হয়ে গেলাম। সত্যিই খারাপ লেগে উঠেছিলো। ঠিক সন্ধ্যায় জেলে পৌছালাম আমরা। সেখানে যেন আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করেছিলো আমাদের জন্য। প্রথমে আমাদের সেলে রাখা হয় (যেখানে ক্রিমিনাল আসামীদের রাখা হয়)। লোহার দরজা,সব দিক খোলা। এক কোনায় পটের মতো বাথরুম। উল্টো দিক থেকে একজন কয়েদি বলে ওঠলো ভাই বিবিসি থেকে তো আপনাদের কথা বলা হচ্ছে। এভাবে সাতদিন কেটে যায়। এর কিছুদিন পর জেলে আমাদের ডিভিশান দেয়া হয়। যারা ডিভিশানে থাকেন তাদের সেবার জন্য ফালতু (সেবক) নিয়োগ থাকে। আমার আবার দাতের ব্যথা ছিলো। বাহিরে থেকে ডাক্তার আনা হয়। ডাক্তার বললো দাঁত উঠিয়ে ফেলতে হবে। আমি তাতে রাজি হইনি। পরের দিন আবারো ডাক্তার এলো। কিন্তু পরক্ষনে দেখলাম কি সে ডাক্তার না, আবাহনীর পেডী ভাই। কম্পাউন্ডার সেজে সে জেলের ভিতর প্রবেশ করেছিলো।

জেলের এ কদিনে ফালতুর সঙ্গে বেশ ভাব হলো। কিছুটা দূর্বলও হয়ে পড়েছিলাম তাদের গল্প শুনে। তার কি ভাবে জেলে আসা হলো। শুনে অবাক লাগলো, যে দোষ করেছে সে জেল খাটছে না উল্টো যার দোষ করা হয়েছে সেই কিনা জেলে। শুনে খুব খারাপ লেগেছিলো। সে আরেক কাহিনী। আরেকদিন না হয় বলা যাবে। নাম ঠিক মনে আসছে না ফালতুর (সেবকের)। তবে তার অসহায়ত্বের কথা শুনে তাকে কিছু আর্থিক ভাবে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিই। তাকে বলেছি তুমি জেল থেকে মুক্তি পেলে ঢাকায় আবাহনী ক্লাবে  গিয়ে দেখা করবা। এরই মধ্যে রাজশাহীর জেলে সেকি জামাই আদর। কখনো ওমুক কখনো তমুক আমাদের খাবার নিয়ে হাজির। প্রয়াত সংগঠকও বিওএ’র মহাসচিব জাফর ইমাম প্রতিদিন আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। এরই মধ্যে এরশাদের হস্তক্ষেপে সতের দিন পর আমাদের জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। একটি ঈদও ইতিমধ্যে জেলে উযদযাপন করেছি আমরা। জেলের ঈদ, কোরবানীর ঈদ। ভিন্ন এক ঈদ।

জেল থেকে মুক্তির পর আমাদের ফুলদিয়ে বরণ করা হলো। ঠিক একই সময় সালাউদ্দিনও চুন্নু ভাইকেও ফুলদিয়ে বরন করা হয়েছে। এখানেও পেয়েছিলাম ভিন্ন আমেজ। শেষের দিকের ঘটনাটা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়। যে ফালতুকে সাহায্য করবো বলে কথা দিয়ে ছিলাম। সে একদিন সন্ধ্যায়  ক্লাবে এসে হাজির। তাকে জিজ্ঞেস করলাম কখন ঢাকায় এসেছিলে। সে উত্তরে বললো সকালে। আমি তো অবাক! তাহলে এতো দেরি কেন? কমলাপুর থেকে জিজ্ঞেস করতে করতেই হেটে এসে পড়লাম। পরের কথা শুনেই তো সে কি হাসি- রাজাশাহীর ভাষায় ‘ লাল বাতি দেখেছি, গাড়ি থেমে গেছে, আমিও থেমে গেছি।’

 

 

ট্রেনে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চার তারকা ফুটবলারকে সৌজন্য ছবি

সবুজ মাঠের চৌহদ্দিতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা বিলীন করে দেওয়া খেলার জগতের মানুষ কি সরকার উত্খাত করতে পারে? আজ থেকে ৩১ বছর আগে, বাংলাদেশের শীর্ষ চার ফুটবল তারকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগই আনা হয়েছিল। সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট তিন দশক আগে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরে জেলহাজতে যেতে হয়েছিল দেশের চার তারকা ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল আর কাজী আনোয়ারকে। আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথে রেফারির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ থেকে সৃষ্ট গোলযোগের সম্পূর্ণ দায়ভার এই চার খেলোয়াড়ের ঘাড়ে দিয়ে সামরিক আদালত সংক্ষিপ্ত বিচারের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাঁদের দণ্ডিত করেছেন বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে। তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্রে লেখা হয়েছিল, তাঁরা নাকি সামরিক সরকারকে উত্খাতের প্রাথমিক ষড়যন্ত্র করেছেন! বাংলাদেশের ফুটবল তো বটেই, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরিয়ে আটকের ঘটনা বিশ্ব ফুটবলেও এক ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে অভিহিত হয়ে আছে।
নিরন্তর লজ্জার এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দেশে তখন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন সবে ছয় মাস অতিক্রম করেছে। গোটা দেশই তখন পরিণত হয়েছে সুবিশাল এক কারাগারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত বসিয়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আর বিভিন্ন পেশার মানুষের দোষ-গুণ খোঁজা শুরু হয়। বিভিন্ন অভিযোগে সামরিক আইনের অধীনেই তাঁদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয় বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ডের নির্দেশনা। শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিস্থিতির শিকার যে ওই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলোয়াড়েরাও হবেন, সেটা কিন্তু ছিল কল্পনারও অতীত।

 

 

 

ফুটবলের ‘ব্ল্যাক সেপ্

 

ট্রেনে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চার তারকা ফুটবলারকে সৌজন্য ছবি

সবুজ মাঠের চৌহদ্দিতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা বিলীন করে দেওয়া খেলার জগতের মানুষ কি সরকার উত্খাত করতে পারে? আজ থেকে ৩১ বছর আগে, বাংলাদেশের শীর্ষ চার ফুটবল তারকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগই আনা হয়েছিল। সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট তিন দশক আগে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরে জেলহাজতে যেতে হয়েছিল দেশের চার তারকা ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল আর কাজী আনোয়ারকে। আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথে রেফারির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ থেকে সৃষ্ট গোলযোগের সম্পূর্ণ দায়ভার এই চার খেলোয়াড়ের ঘাড়ে দিয়ে সামরিক আদালত সংক্ষিপ্ত বিচারের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাঁদের দণ্ডিত করেছেন বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে। তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্রে লেখা হয়েছিল, তাঁরা নাকি সামরিক সরকারকে উত্খাতের প্রাথমিক ষড়যন্ত্র করেছেন! বাংলাদেশের ফুটবল তো বটেই, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরিয়ে আটকের ঘটনা বিশ্ব ফুটবলেও এক ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে অভিহিত হয়ে আছে।
নিরন্তর লজ্জার এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দেশে তখন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন সবে ছয় মাস অতিক্রম করেছে। গোটা দেশই তখন পরিণত হয়েছে সুবিশাল এক কারাগারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত বসিয়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আর বিভিন্ন পেশার মানুষের দোষ-গুণ খোঁজা শুরু হয়। বিভিন্ন অভিযোগে সামরিক আইনের অধীনেই তাঁদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয় বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ডের নির্দেশনা। শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিস্থিতির শিকার যে ওই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলোয়াড়েরাও হবেন, সেটা কিন্তু ছিল কল্পনারও অতীত।

সামরিক শাসনের অধীনে দেশের খেলাধুলা থেমে ছিল না। পূর্ণোদ্যমেই এগিয়ে চলছিল সিনিয়ন ডিভিশন ফুটবল লিগ। সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গে যাঁদের সখ্য ছিল, যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন ওই সময়ের ফুটবল উন্মাদনা, তাঁদের পক্ষেই কেবল অনুধাবন করা সম্ভব ওই সময়টাকে।

যা-ই হোক, লিগের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডান। দেশের সেরা ফুটবলাররাও একই সঙ্গে মুখোমুখি নিজেদের ক্রীড়াশৈলী উজাড় করে দিয়ে নিজ নিজ দলকে শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে জায়গা করে দিতে। পুরো দেশ বিভক্ত দুই শিবিরে। ঢাকা স্টেডিয়াম পরিপূর্ণ কানায় কানায়। রেডিওতে কান রেখে, টেলিভিশনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেশের মানুষ ব্যাকুল প্রিয় দলের সাফল্যের সঙ্গী হতে। টান টান উত্তেজনার এই ম্যাচের একপর্যায়ে মোহামেডান এগিয়ে গেল এক গোলে। আবাহনীর খেলোয়াড়েরা তখন মরিয়া নীল-হলুদ জার্সির মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে। এমনই একটি পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টেডিয়ামে ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা। আবাহনীর অধিনায়ক কাজী আনোয়ারের একটি ক্রস বাঁক খেয়ে গোলে প্রবেশের মুখে তা রুখে দেন মোহামেডানের তরুণ গোলরক্ষক মোহাম্মদ মহসীন। মহসীন ওই ম্যাচে দেশের ফুটবলের মহাতারকা কাজী সালাউদ্দিনের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দারুণ উজ্জীবিত। মহসীন আনোয়ারের ক্রসটি ফিরিয়ে দিলেও তা মুহূর্তের জন্য গোললাইন স্পর্শ করেছিল। আবাহনীর খেলোয়াড়েরা মরিয়া হয়ে দাবি জানাতে থাকেন গোলের। কিন্তু রেফারি মুনীর হোসেন আর লাইন্সম্যান অনড় থাকেন তাঁদের সিদ্ধান্তে। খেলায় সৃষ্টি হয় নিদারুণ অচলাবস্থার। মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। কাঁদানে গ্যাস ছোড়া শুরু করে পুলিশ সংঘর্ষরত সাপে-নেউলে আবাহনী আর মোহামেডান-সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে।উত্তেজিত সমর্থকেরা স্টেডিয়ামের বাইরে পল্টন-জিপিও, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, বিজয়নগর প্রভৃতি এলাকায়ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অগ্নস্ফুিলিঙ্গের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সেই সন্ধ্যার ঢাকা। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধে ঢেকে যায় ঢাকার আকাশ-বাতাস। বলাবাহুল্য, খেলাটি আর সমাপ্তির মুখ দেখেনি। লিগের আইন অনুযায়ী মোহামেডানকে ওই ম্যাচে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় ২-০ গোলে।

খেলার মাঠে সংঘর্ষ নতুন কোনো ঘটনা নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময় খেলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচের গোলযোগকে কেন্দ্র করে ৩১ বছর আগে এই বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা।

মাঠের গোলযোগ একটু কমলে খেলোয়াড়েরা ফিরে যান যাঁর যাঁর অবস্থানে। ওই সময় স্টেডিয়ামসংলগ্ন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনে ছিল জাতীয় ফুটবল দলের ক্যাম্প। লিগের ফাঁক-ফোকরে জাতীয় দলে ডাক পাওয়া ফুটবলাররা ক্যাম্পে অবস্থান করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দিল্লি এশিয়ান গেমসের। আবাহনী-মোহামেডানের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় ছিলেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। সেদিন মাঠে উপস্থিত কয়েকজন খেলোয়াড়ই ক্যাম্পে গিয়ে গা এলিয়ে দেন বিছানায়। অনেকেই চলে যান যাঁর যাঁর বাড়িতে। কেউ কেউ চলে যান নিজ ক্লাবে। কিন্তু তাঁরা তখনো জানতেন না, কী ভয়ংকর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে তাঁদের সামনে।

এভাবেই হাতে হাতকড়া পরিয়ে সেদিন বসিয়ে রাখা হয়েছিল দেশসেরা চার ফুটবলারকে। বাঁ দিক থেকে হেলাল, সালাউদ্দিন, চুন্নু ও আনোয়ার

রাত গভীর হলে সেনাবাহিনী, বিডিআর আর পুলিশের একটি যৌথবাহিনী অভিযান চালায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জাতীয় দলের ক্যাম্পে। তাঁদের আরও একটি দল অভিযান চালায় ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাবে। কাজী সালাউদ্দিনকে ধরতে যৌথবাহিনী অভিযান চালায় তাঁর গুলশানের বাড়িতে।
গোলাম রব্বানী হেলালসহ আবাহনীর প্রায় বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে আটক করা হয় আবাহনী ক্লাব থেকে। জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় কাজী আনোয়ার আর আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নুকে। আগেই বলা হয়েছে, সালাউদ্দিনকে আটক করা হয় তাঁর গুলশানের বাসা থেকে।
প্রথম আলো ডটকমের কাছে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন গোলাম রব্বানী হেলাল। আবাহনী ক্লাবে খেলোয়াড়দের গ্রেপ্তার করতে যৌথবাহিনী ছিল রীতিমতো যুদ্ধসাজে, ‘আমি খেলার পর আবাহনী ক্লাবে ফিরে নিজের ঘরে শুয়ে ছিলাম। শরীরে বড় ম্যাচের ক্লান্তি। মনটাও খারাপ। গোলযোগের কারণে খেলা পণ্ড হয়ে যাওয়ায় লিগে আবাহনীর ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবছিলাম। হঠাত্ ক্লাবের আশপাশে বেশ কয়েকটা সামরিক ট্রাক, জিপ ইত্যাদির আওয়াজ শুনতে পাই। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, এলাহী অবস্থা! ক্লাবের চারপাশ পুলিশ আর সেনাসদস্যরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। তাঁরা এমন একটা ভাব করছিলেন, যেন ভয়ংকর কোনো অপরাধীকে ধরতে এসেছেন। তাঁরা যে আমাদেরই ধরতে এসেছেন, এটা বুঝতে অনেকটা সময় লেগেছিল। সেদিন রাতে আমিসহ আবাহনীর খেলোয়াড়দের নিয়ে যাওয়া হয় রমনা থানায়।’

পরদিন সকালে তাঁদের শাহবাগ পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষে এনে জড়ো করা হয়। হেলাল জানান, পুরো সময়টাতেই খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরানো ছিল। আবাহনীতে ওই সময় খেলতেন দুই শ্রীলঙ্কান ফুটবলার—অশোকা রবীন্দ্র আর পাকির আলী। যৌথবাহিনীর হাতে নাকাল হতে হয় তাঁদেরও। শাহবাগ পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকেই সালাউদ্দিন, আনোয়ার, হেলাল ও চুন্নুকে আলাদা করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। শুরু হয় তাঁদের জেলজীবন।

সামরিক আদালতের বিচারে সালাউদ্দিন ও চুন্নুকে তিন মাসের জেল দেওয়া হয়। হেলালকে ছয় মাস আর কাজী আনোয়ারকে দেওয়া হয় এক বছরের কারাদণ্ড। ঢাকার বাইরে জেল খাটতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশের এই শীর্ষ ফুটবলারদের।

হেলাল বলেন, ‘সামরিক আদালতে আমাদের বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, আমরা নাকি সামরিক সরকার উত্খাতের প্রথম ষড়যন্ত্রকারী। কী হাস্যকর অভিযোগ, ভেবে দেখুন।’

ওই সময় খেলোয়াড়দের মনের অবস্থা কী ছিল, সেটা নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। হেলাল বলেন, ‘ওপর দিয়ে হাসি-খুশি থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ভেতর দিয়ে আমরা সবাই একেবারেই ভেঙে পড়েছিলাম। সালাউদ্দিন ভাই খুব বড় ঘরের ছেলে। তাঁর মতো মানুষকে থানায় সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে থাকতে হয়েছে। আনোয়ার, চুন্নু, আমি—কেউই এ ধরনের কষ্টকর জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম না। সবচেয়ে অবাক লাগত যা, তা হলো, আমাদের বিরুদ্ধে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল। আমরা সবাই ফুটবল নিয়েই থাকতাম। সারাক্ষণ ওটা নিয়েই ভাবতাম। আমরা কী করে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্র করি!’