ঢাকা ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের রেমিট্যান্স, বেড়েছে আগামীর চ্যালেঞ্চ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
  • / ৪৬ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। সমাপ্ত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর রেকর্ড দিয়ে শেষ হলো । বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা এবং নানামুখী অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে বৈধ পথে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের ক্ষয়িষ্ণু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে (Foreign Exchange Reserve) পুনরায় শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

এই অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (জুলাই-জুন) ১২ মাসে দেশে বৈধ চ্যানেলে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪ লাখ ৩৮ হাজার ১২৮ কোটি টাকার বেশি। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এত বেশি রেমিট্যান্স এর আগে কখনো আসেনি।

আগের অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

ব্যাঙ্ক কর্মকর্তাদের মতে,  ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার কারণে প্রবাসীরা হুন্ডির মতো অবৈধ পথ পরিহার করে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

এই প্রবিৃদ্ধির নেপথ্যে মূল অনুঘটক ছিলো মূলত : ক্রলিং পেগ (Crawling Peg) পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন এবং বাজারভিত্তিক ডলারের রেট নির্ধারণের ফলে ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলা বাজারের ডলারের মূল্যের ব্যবধান কমে এসেছে। এতে প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে বেশি আগ্রহী হয়েছেন। এছাড়া সরকারি আড়াই শতাংশ প্রণোদনার পাশাপাশি বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রবাসীদের জন্য অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা বিশেষ রেট অফার করেছে।

এমন কি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাস থেকে সরাসরি দেশে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠানোর সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে রেমিট্যান্স প্রাপ্তি সহজতর করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে নগদ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পাঠানোর সুযোগ বাড়ায় প্রবাসীরা আগের তুলনায় বেশি বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করছেন। ফলে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।

প্রতিবারের মতো এবারও রেমিট্যান্সের সিংহভাগ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ওমান থেকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের দেশগুলো থেকেও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই বছরে রেকর্ড সংখ্যক কর্মী বিদেশে পাড়ি জমানোর সুফল মিলতে শুরু করেছে এই অর্থবছরে।

এদিকে অর্থবছরের শেষ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা ভাটা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জুনে দেশে এসেছে ২৮০ কোটি ৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আগের বছরের জুনের তুলনায়ও রেমিট্যান্স কিছুটা কমেছে। তবে ব্যাংক হলিডের কারণে ১১টি ব্যাংকের তথ্য প্রাথমিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে এ অঙ্ক কিছুটা বাড়তে পারে। এর আগে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের অক্টোবরে, তখন আসে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠান। ঈদ-পরবর্তী সময়ে সেই চাপ কমে যাওয়ায় জুন মাসে রেমিট্যান্সেও কিছুটা স্বাভাবিক নিম্নগতি দেখা দিয়েছে।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্সের চিত্রে দেখা যায়, জুলাইয়ে এসেছে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলার, মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, মে মাসে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং জুনে ২৮০ কোটি ৬ লাখ ডলার।

রিজার্ভে স্বস্তি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব

রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।

টানা কয়েক বছর ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, এই অর্থবছরের রেমিট্যান্সের জোয়ারে তা অনেকটাই কেটে গেছে। রেমিট্যান্সের এই চাঙ্গা ভাব দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলাতে সরকারকে বড় ধরনের নীতিগত স্বস্তি দিয়েছে। একই সাথে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ সচল থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বজায় ছিল।

আগামীর চ্যালেঞ্জ 

তবে রেকর্ড গড়লেও রেমিট্যান্সের এই ধারা আগামীতে ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ থেকে এখনো সিংহভাগ কর্মী ‘অদক্ষ’ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন, যার ফলে বিপুল সংখ্যক জনশক্তি রপ্তানি হলেও সেই অনুপাতে আয় আসছে না।

তাদের মতে, আগামী দিনগুলোতে রেমিট্যান্সের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর জন্য দরকার দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। প্রথাগত শ্রমিক পাঠানোর মানসিকতা থেকে বের হয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন কারিগরি খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি ও রপ্তানি বাড়াতে হবে।

এরপর হুন্ডির মতো অবৈধ চক্রগুলোকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করতে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও আইনি কঠোরতা বজায় রাখতে হবে।এবং প্রবাসী বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ কেবল ভোগবিলাসে ব্যয় না করে যাতে বন্ড, শেয়ারবাজার বা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায়, সেজন্য আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের রেমিট্যান্স, বেড়েছে আগামীর চ্যালেঞ্চ

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। সমাপ্ত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর রেকর্ড দিয়ে শেষ হলো । বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা এবং নানামুখী অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে বৈধ পথে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের ক্ষয়িষ্ণু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে (Foreign Exchange Reserve) পুনরায় শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

এই অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (জুলাই-জুন) ১২ মাসে দেশে বৈধ চ্যানেলে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪ লাখ ৩৮ হাজার ১২৮ কোটি টাকার বেশি। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এত বেশি রেমিট্যান্স এর আগে কখনো আসেনি।

আগের অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

ব্যাঙ্ক কর্মকর্তাদের মতে,  ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার কারণে প্রবাসীরা হুন্ডির মতো অবৈধ পথ পরিহার করে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

এই প্রবিৃদ্ধির নেপথ্যে মূল অনুঘটক ছিলো মূলত : ক্রলিং পেগ (Crawling Peg) পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন এবং বাজারভিত্তিক ডলারের রেট নির্ধারণের ফলে ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলা বাজারের ডলারের মূল্যের ব্যবধান কমে এসেছে। এতে প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে বেশি আগ্রহী হয়েছেন। এছাড়া সরকারি আড়াই শতাংশ প্রণোদনার পাশাপাশি বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রবাসীদের জন্য অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা বিশেষ রেট অফার করেছে।

এমন কি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাস থেকে সরাসরি দেশে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠানোর সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে রেমিট্যান্স প্রাপ্তি সহজতর করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে নগদ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পাঠানোর সুযোগ বাড়ায় প্রবাসীরা আগের তুলনায় বেশি বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করছেন। ফলে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।

প্রতিবারের মতো এবারও রেমিট্যান্সের সিংহভাগ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ওমান থেকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের দেশগুলো থেকেও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই বছরে রেকর্ড সংখ্যক কর্মী বিদেশে পাড়ি জমানোর সুফল মিলতে শুরু করেছে এই অর্থবছরে।

এদিকে অর্থবছরের শেষ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা ভাটা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জুনে দেশে এসেছে ২৮০ কোটি ৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আগের বছরের জুনের তুলনায়ও রেমিট্যান্স কিছুটা কমেছে। তবে ব্যাংক হলিডের কারণে ১১টি ব্যাংকের তথ্য প্রাথমিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে এ অঙ্ক কিছুটা বাড়তে পারে। এর আগে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের অক্টোবরে, তখন আসে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠান। ঈদ-পরবর্তী সময়ে সেই চাপ কমে যাওয়ায় জুন মাসে রেমিট্যান্সেও কিছুটা স্বাভাবিক নিম্নগতি দেখা দিয়েছে।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্সের চিত্রে দেখা যায়, জুলাইয়ে এসেছে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলার, মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, মে মাসে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং জুনে ২৮০ কোটি ৬ লাখ ডলার।

রিজার্ভে স্বস্তি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব

রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।

টানা কয়েক বছর ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, এই অর্থবছরের রেমিট্যান্সের জোয়ারে তা অনেকটাই কেটে গেছে। রেমিট্যান্সের এই চাঙ্গা ভাব দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলাতে সরকারকে বড় ধরনের নীতিগত স্বস্তি দিয়েছে। একই সাথে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ সচল থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বজায় ছিল।

আগামীর চ্যালেঞ্জ 

তবে রেকর্ড গড়লেও রেমিট্যান্সের এই ধারা আগামীতে ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ থেকে এখনো সিংহভাগ কর্মী ‘অদক্ষ’ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন, যার ফলে বিপুল সংখ্যক জনশক্তি রপ্তানি হলেও সেই অনুপাতে আয় আসছে না।

তাদের মতে, আগামী দিনগুলোতে রেমিট্যান্সের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর জন্য দরকার দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। প্রথাগত শ্রমিক পাঠানোর মানসিকতা থেকে বের হয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন কারিগরি খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি ও রপ্তানি বাড়াতে হবে।

এরপর হুন্ডির মতো অবৈধ চক্রগুলোকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করতে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও আইনি কঠোরতা বজায় রাখতে হবে।এবং প্রবাসী বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ কেবল ভোগবিলাসে ব্যয় না করে যাতে বন্ড, শেয়ারবাজার বা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায়, সেজন্য আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে হবে।