রিজার্ভ চুরি ও অর্থ লোপাট: সাবেক ৩ গভর্নরের আমলের নথি তলব
- আপডেট সময় : ০৮:৫৯:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
- / ৪৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট এবং ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মে সহায়তার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নরের আমলের নথিপত্র তলব করা হয়েছে। দেশের ব্যাংক খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলো এই উদ্যোগ নিয়েছে।
বুধবার (১ জুলাই) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো আকতারুল ইসলাম জানান, রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং ব্যাংকিং খাতে নানা অনিয়মের অভিযোগে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এসব নথি চাওয়া হয়েছে। তলব করা নথিপত্র বিশ্লেষণের পর প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদসহ পরবর্তী অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করবে দুদক।
যে তিন সাবেক গভর্নরের আমলের ফাইল ও নথিপত্র স্ক্রিনারের আওতায় আনা হয়েছে, তারা হলেন— ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবির এবং আব্দুর রউফ তালুকদার। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই তিন গভর্নরের মেয়াদে নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, বিশেষ ঋণ সুবিধা, বড় বড় জালিয়াতির ফাইল এবং বোর্ড সভার কার্যবিবরণী (মিনিটস) যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, অভিযোগ অনুসন্ধানে উপ-পরিচালক মো. মোমিনুল ইসলাম, উপ-পরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার ও উপ-সহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লার সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়।
দুদকের তলবকৃত চিঠিতে বলা হয়েছে, সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিতে নীতিমালা প্রণয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে অনিয়ম ও জালিয়াতির সুযোগ সৃষ্টি করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের নাম, ঠিকানা, দায়িত্বকালসহ বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে দুদক। পাশাপাশি ওই সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথিও তলব করা হয়েছে।
চাওয়া নথির মধ্যে আরও রয়েছে, ২০১৬ এবং ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন (ডিওএস) ও ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (বিআরপিডি) থেকে সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট এবং বড় ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনসংক্রান্ত জারি করা সব অনাপত্তিপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি।
এ ছাড়া ২০২০ সালের বিআরপিডি সার্কুলার-৮ অনুযায়ী শিল্প ও সেবা খাতে বিতরণ করা প্রণোদনা ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা ও প্রণোদনার পরিমাণ চাওয়া হয়েছে।
কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানা দেওয়ার অনুমোদনপত্র, এ-সংক্রান্ত নোটশিটের সত্যায়িত অনুলিপি এবং সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময় বিশেষ গ্রুপের মালিকানাধীন কয়েকটি ব্যাংককে নগদ সহায়তা দেওয়ার অনুমোদনসংক্রান্ত নথিও তলব করেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর দোহার অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কপিও কমিশনে পাঠাতে বলা হয়েছে।
তদন্তের বিষয়
- এত বড় ডিজিটাল ডাকাতির ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও তা সরকারের উচ্চপর্যায় এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় এক মাস গোপন রাখা হয়েছিল। এই তথ্য গোপনের পেছনে সাবেক এই গভর্নরের নীতিগত কোনো ভুল বা ব্যাংকের ভেতরের কর্মকর্তাদের কোনো যোগসাজশ ছিল কি না, তা জানতে তৎকালীন তদন্ত প্রতিবেদন ও ফাইল তলব করা হয়েছে।
- প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) এবং তার সিন্ডিকেট কর্তৃক পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার ও লোপাটের ঘটনা ঘটে এই সময়ে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ (BFIU) ও পরিদর্শন টিম এই জালিয়াতি দেখেও রহস্যজনক কারণে নীরব ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন অডিট ও পরিদর্শন রিপোর্টগুলো এখন বিশদভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তার সাড়ে ছ’বছরের দীর্ঘ মেয়াদে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ছাড়ায়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (NBFI)।
- সামষ্টিক অর্থনীতির চরম সংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক খালি করার অভিযোগ রয়েছে তার আমলের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি পদত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান।
-
ইসলামী ব্যাংকসহ শরীয়াহ ভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপ এবং অন্যান্য প্রভাবশালী চক্রের নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম শিথিল করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে বিপুল পরিমাণ ‘তারল্য সহায়তা’ (Liquidity Support) দেওয়া হয়েছিল, তার আড়ালে অর্থ লোপাটের কোনো এজেন্ডা ছিল কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য: তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, “ব্যাংক খাতের আজকের এই ভঙ্গুর দশার জন্য শুধু ব্যবসায়ী বা পরিচালকরা দায়ী নন; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত আশ্রয়-প্রশ্রয়ও বড় ভূমিকা রেখেছে। কার নির্দেশে এবং কোন আইন লঙ্ঘন করে এসব অনিয়মকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, তা বের করতেই সাবেক তিন গভর্নরের আমলের নথিপত্র ও ফাইল পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
সাবেক এই তিন শীর্ষ কর্মকর্তার আমলের নথিপত্র বিশ্লেষণের পর দোষী সাব্যস্ত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধারে এই তদন্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।











