ঢাকা ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

বাজেট প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর যে আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৭:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
  • / ৪৪ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

তারেক রহমানের সরকার আগামী অর্থ বছরের জন্য (২০২৬-২০২৭) ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘো্ষনা করেছে। বাংলাদেশেরেইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ বাজেট। সাধারণত দেশের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জিডিপি, মুদ্রার মান এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এই বাজেট বরাদ্দ হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিশাল এই বাজেট সেই ভাবনায় হয়েছে কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নেতিবাচক কথা উঠছে। তাই এই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে খোদ দেশের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে। ডেইলি ঢাকা মেট্রো’র পাঠকদের সামনে তাদের মতামতগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো…   

ঋণ নির্ভর উচ্চভিলাষী ও লুটপাটের বাজেট : জামায়াত

সরকার কর্তৃক জাতীয় সংসদে পেশ করা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায়  আজ (শুক্রবার) দুপুরে মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটটি ব্যাংক ও বৈদেশিক বিরাট ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আর্থিক সংস্থান করতে গিয়ে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে, সেই রাজস্ব কিভাবে আদায় করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাজেটের ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা কোথা থেকে পূরণ করা হবে- সেটি স্পষ্ট নয়। যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে সেখানে যে কর কাঠামো, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন, সেগুলোর উল্লেখ নেই।

তিনি আরো বলেন, এবারের বড় ঘাটতি বাজেটের যে ব্যয় সংকুলান, তা ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি হলো উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি। এর মূল্য বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতির সবখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয়ত, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

দলটির সেক্রেটারি জেনারেল বলেন,  বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫৫তম জাতীয় বাজেটে জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়নি।

তিনি বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।

তিনি বলেন, বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে এডিপির আকার বৃদ্ধি করলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

জামায়াতের ছায়া বাজেট 

জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, জামায়াতের ছায়া বাজেটে আমরা অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দিয়েছি। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছর জুনে শেষ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই আমরা একটি অধিক কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ উন্নয়ন ব্যয় কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছি।

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, আর জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকার জামায়াতের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে বলে আমরা মনে করি, বলেন তিনি।

তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতির ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তাবিত ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ জামায়াতের বাজেটে ঘাটতি অনেক কম, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ; সেখানে সরকারের ঘাটতি ৩.৫ শতাংশ। সরকারি বাজেট ও জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটের মধ্যে পার্থক্য শুধু সংখ্যাগত নয়; অর্থনৈতিক দর্শন, নীতিগত অবস্থান এবং বাস্তবায়ন কৌশলেও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

তিনি বলেন, কর আদায় পদ্ধতি সহজ করা এবং করদাতাদের স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রেখেছে। কিন্তু আমরা প্রস্তাব করেছি এই সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার এবং পরবর্তী পর্যায়ে তা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার। ব্যয়ের অগ্রাধিকার, খাতভিত্তিক বরাদ্দ এবং কর কাঠামো সংস্কার নিয়ে আমাদের ছায়া বাজেটে বিস্তারিত প্রস্তাব রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটে মূলত একটি জনকল্যাণমুখী ও সংস্কারপন্থী অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। সরকারের বাজেটের তুলনায় এটি কম ঘাটতিনির্ভর এবং কম বৈদেশিক ঋণনির্ভর। জাতীয় সংসদে বাজেট নিয়ে অর্থবহ আলোচনা, বিরোধী মতামত গ্রহণ এবং বিভিন্ন সংশোধনী বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে বাজেট আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারে, বলেন তিনি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আমরা আশা করি, সরকার গঠনমূলক প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাজেট সংশোধন করবে এবং বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও অনিয়মের লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

 বাস্তবতা বিবর্জিত, অর্থনৈতিক সংস্কার হবে না: নাহিদ ইসলাম
এনসি অর্থা্ৎ জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক নাহিদ ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার ঘোষিত এই বাজেট বাস্তবতাবিবোর্জিত। তিনি বলেন, সরকার বাজেটে ৬ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, যা কিনা অসম্ভব। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান যে কর বা রাজস্ব আদায়ের কাঠামো রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে; কিন্তু বর্তমান বাজেটের যে রূপরেখা, তাতে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব হবে না।’

বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা কিছু সৃজনশীল জায়গা দেখিয়েছে। কিছু পণ্যের কর কমানো হয়েছে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে— তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।’

সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘটনাকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এত কম সময়ের ব্যবধানে আগে কখনো এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি, তার লাগাম টেনে ধরতেই আমরা প্রতিটি বিভাগে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কর্মসূচি পালন করছি।’

‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বাজেট কীভাবে দুর্নীতি বন্ধ করবে— তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বড় বাজেট মানেই তা নিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি করারও সুযোগ তৈরি হওয়া। এই যে বিভিন্ন কার্ড বিতরণ কিংবা খাল খনন কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে; সেখানে ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা বরাদ্দ পাচ্ছেন, কিন্তু বিরোধীদলীয় এমপিরা পাচ্ছেন না— তারা সেটি কীভাবে করছেন? অর্থাৎ কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। বাজেটে দুর্নীতি ও ঋণখেলাপিদের রুখতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি।’

 বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঝুঁকি ও শৃঙ্খলাহীনতা হতে পারে : মোস্তাফিজুর রহমান

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,প্রস্তাবিত বাজেটে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকার থাকলেও এর প্রাক্কলন বা অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলো বাস্তবসম্মত হয়নি। তার মতে, ‘বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে যে গাণিতিক ভিত্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সঠিক হয়নি। ফলে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি ও শৃঙ্খলাহীনতা তৈরি হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন— এই তিনটি মূল শক্তির ওপর ভিত্তি করে সরকার কাজ করতে চাচ্ছে।বাজেটে রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে শুল্ক হারের যে সমন্বয় করা হয়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে স্বাগত জানাই।’

তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তিনি বলেন, ‘প্রথম যে ঝুঁকিটি আমি দেখি, তা হলো চলতি অর্থবছরের যে ভিত্তি ধরে প্রবৃদ্ধি, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণ বা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, সেই ভিত্তিটিই দুর্বল।’

কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, গত ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যেখানে ১.৮ শতাংশ ঋণাত্মক (নেতিবাচক), সেখানে বাজেটে ৮.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে থাকলেও বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বাজেটের প্রাক্কলনগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন মনে হচ্ছে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (চতুর্থ কোয়ার্টারে) হঠাৎ করে অর্থনীতিতে একটি ‘চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি’ তৈরি হবে; যেখানে প্রবৃদ্ধি হঠাৎ বেড়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ও সম্পদ আহরণ আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা পেয়েছে। তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর মার্চ থেকে জুনের মধ্যে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুর্বলতাগুলোকে স্বীকার করে যদি ভিত্তিটি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হতো, তবে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাগুলো আরও টেকসই হতো।’

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, বাজেটের যাবতীয় প্রস্তাবনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সম্পদের সঠিক বণ্টন এবং বরাদ্দ দক্ষতার ওপর। সেপ্টেম্বরে যখন গত অর্থবছরের সব সূচক চূড়ান্তভাবে সামনে আসবে, তখন ভিত্তি নির্ধারণের এই ভুলগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা তখনই অর্জিত হবে, যখন আমরা এটি বাস্তবায়ন করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।’

বিনিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিনিয়োগকে চাঙ্গা করার জন্য আমদানির বিকল্প শিল্প ও রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বাজেটে বিভিন্ন রাজস্ব প্রণোদনা ও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, সঠিকভাবে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে আমরা যদি ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ করিও, তারপরও যদি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সুতরাং এই অবকাঠামোগত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বাজেটের এই প্রচেষ্টাটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘ডিপার্চার’ (নতুন যাত্রা) হিসেবে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। তবে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মতো অবকাঠামোগত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এগুলো নিশ্চিত করার জন্য এক বছর যথেষ্ট সময় নয়।

বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, নিট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড়। গত বছরও আমরা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো নিট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ (সার্ভিসিং) করেছি। এত বড় প্রাক্কলনের ফলে এবং সুদ পরিশোধের পরিমাণ এখনই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হওয়ায়, এটি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

বাজেট প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর যে আশঙ্কা

আপডেট সময় : ০৯:৪৭:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

তারেক রহমানের সরকার আগামী অর্থ বছরের জন্য (২০২৬-২০২৭) ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘো্ষনা করেছে। বাংলাদেশেরেইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ বাজেট। সাধারণত দেশের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জিডিপি, মুদ্রার মান এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এই বাজেট বরাদ্দ হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিশাল এই বাজেট সেই ভাবনায় হয়েছে কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নেতিবাচক কথা উঠছে। তাই এই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে খোদ দেশের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে। ডেইলি ঢাকা মেট্রো’র পাঠকদের সামনে তাদের মতামতগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো…   

ঋণ নির্ভর উচ্চভিলাষী ও লুটপাটের বাজেট : জামায়াত

সরকার কর্তৃক জাতীয় সংসদে পেশ করা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায়  আজ (শুক্রবার) দুপুরে মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটটি ব্যাংক ও বৈদেশিক বিরাট ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আর্থিক সংস্থান করতে গিয়ে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে, সেই রাজস্ব কিভাবে আদায় করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাজেটের ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা কোথা থেকে পূরণ করা হবে- সেটি স্পষ্ট নয়। যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে সেখানে যে কর কাঠামো, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন, সেগুলোর উল্লেখ নেই।

তিনি আরো বলেন, এবারের বড় ঘাটতি বাজেটের যে ব্যয় সংকুলান, তা ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি হলো উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি। এর মূল্য বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতির সবখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয়ত, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

দলটির সেক্রেটারি জেনারেল বলেন,  বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫৫তম জাতীয় বাজেটে জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়নি।

তিনি বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।

তিনি বলেন, বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে এডিপির আকার বৃদ্ধি করলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

জামায়াতের ছায়া বাজেট 

জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, জামায়াতের ছায়া বাজেটে আমরা অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দিয়েছি। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছর জুনে শেষ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই আমরা একটি অধিক কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ উন্নয়ন ব্যয় কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছি।

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, আর জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকার জামায়াতের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে বলে আমরা মনে করি, বলেন তিনি।

তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতির ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তাবিত ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ জামায়াতের বাজেটে ঘাটতি অনেক কম, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ; সেখানে সরকারের ঘাটতি ৩.৫ শতাংশ। সরকারি বাজেট ও জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটের মধ্যে পার্থক্য শুধু সংখ্যাগত নয়; অর্থনৈতিক দর্শন, নীতিগত অবস্থান এবং বাস্তবায়ন কৌশলেও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

তিনি বলেন, কর আদায় পদ্ধতি সহজ করা এবং করদাতাদের স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রেখেছে। কিন্তু আমরা প্রস্তাব করেছি এই সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার এবং পরবর্তী পর্যায়ে তা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার। ব্যয়ের অগ্রাধিকার, খাতভিত্তিক বরাদ্দ এবং কর কাঠামো সংস্কার নিয়ে আমাদের ছায়া বাজেটে বিস্তারিত প্রস্তাব রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটে মূলত একটি জনকল্যাণমুখী ও সংস্কারপন্থী অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। সরকারের বাজেটের তুলনায় এটি কম ঘাটতিনির্ভর এবং কম বৈদেশিক ঋণনির্ভর। জাতীয় সংসদে বাজেট নিয়ে অর্থবহ আলোচনা, বিরোধী মতামত গ্রহণ এবং বিভিন্ন সংশোধনী বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে বাজেট আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারে, বলেন তিনি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আমরা আশা করি, সরকার গঠনমূলক প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাজেট সংশোধন করবে এবং বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও অনিয়মের লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

 বাস্তবতা বিবর্জিত, অর্থনৈতিক সংস্কার হবে না: নাহিদ ইসলাম
এনসি অর্থা্ৎ জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক নাহিদ ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার ঘোষিত এই বাজেট বাস্তবতাবিবোর্জিত। তিনি বলেন, সরকার বাজেটে ৬ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, যা কিনা অসম্ভব। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান যে কর বা রাজস্ব আদায়ের কাঠামো রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে; কিন্তু বর্তমান বাজেটের যে রূপরেখা, তাতে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব হবে না।’

বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা কিছু সৃজনশীল জায়গা দেখিয়েছে। কিছু পণ্যের কর কমানো হয়েছে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে— তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।’

সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘটনাকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এত কম সময়ের ব্যবধানে আগে কখনো এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি, তার লাগাম টেনে ধরতেই আমরা প্রতিটি বিভাগে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কর্মসূচি পালন করছি।’

‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বাজেট কীভাবে দুর্নীতি বন্ধ করবে— তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বড় বাজেট মানেই তা নিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি করারও সুযোগ তৈরি হওয়া। এই যে বিভিন্ন কার্ড বিতরণ কিংবা খাল খনন কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে; সেখানে ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা বরাদ্দ পাচ্ছেন, কিন্তু বিরোধীদলীয় এমপিরা পাচ্ছেন না— তারা সেটি কীভাবে করছেন? অর্থাৎ কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। বাজেটে দুর্নীতি ও ঋণখেলাপিদের রুখতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি।’

 বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঝুঁকি ও শৃঙ্খলাহীনতা হতে পারে : মোস্তাফিজুর রহমান

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,প্রস্তাবিত বাজেটে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকার থাকলেও এর প্রাক্কলন বা অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলো বাস্তবসম্মত হয়নি। তার মতে, ‘বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে যে গাণিতিক ভিত্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা সঠিক হয়নি। ফলে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি ও শৃঙ্খলাহীনতা তৈরি হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন— এই তিনটি মূল শক্তির ওপর ভিত্তি করে সরকার কাজ করতে চাচ্ছে।বাজেটে রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে শুল্ক হারের যে সমন্বয় করা হয়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে স্বাগত জানাই।’

তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তিনি বলেন, ‘প্রথম যে ঝুঁকিটি আমি দেখি, তা হলো চলতি অর্থবছরের যে ভিত্তি ধরে প্রবৃদ্ধি, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণ বা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে, সেই ভিত্তিটিই দুর্বল।’

কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, গত ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যেখানে ১.৮ শতাংশ ঋণাত্মক (নেতিবাচক), সেখানে বাজেটে ৮.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে থাকলেও বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বাজেটের প্রাক্কলনগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন মনে হচ্ছে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (চতুর্থ কোয়ার্টারে) হঠাৎ করে অর্থনীতিতে একটি ‘চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি’ তৈরি হবে; যেখানে প্রবৃদ্ধি হঠাৎ বেড়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ও সম্পদ আহরণ আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা পেয়েছে। তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর মার্চ থেকে জুনের মধ্যে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুর্বলতাগুলোকে স্বীকার করে যদি ভিত্তিটি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হতো, তবে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাগুলো আরও টেকসই হতো।’

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, বাজেটের যাবতীয় প্রস্তাবনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সম্পদের সঠিক বণ্টন এবং বরাদ্দ দক্ষতার ওপর। সেপ্টেম্বরে যখন গত অর্থবছরের সব সূচক চূড়ান্তভাবে সামনে আসবে, তখন ভিত্তি নির্ধারণের এই ভুলগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা তখনই অর্জিত হবে, যখন আমরা এটি বাস্তবায়ন করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।’

বিনিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিনিয়োগকে চাঙ্গা করার জন্য আমদানির বিকল্প শিল্প ও রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বাজেটে বিভিন্ন রাজস্ব প্রণোদনা ও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, সঠিকভাবে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে আমরা যদি ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ করিও, তারপরও যদি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সুতরাং এই অবকাঠামোগত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বাজেটের এই প্রচেষ্টাটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘ডিপার্চার’ (নতুন যাত্রা) হিসেবে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। তবে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মতো অবকাঠামোগত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এগুলো নিশ্চিত করার জন্য এক বছর যথেষ্ট সময় নয়।

বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, নিট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড়। গত বছরও আমরা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো নিট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ (সার্ভিসিং) করেছি। এত বড় প্রাক্কলনের ফলে এবং সুদ পরিশোধের পরিমাণ এখনই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হওয়ায়, এটি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।