ঢাকা ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার: চাল-ডিম-মুরগির দাম চড়া, অস্বস্তি মাছের বাজারেও

মো. লুৎফুল আলম চৌধুরী (প্রত্যয়)
  • আপডেট সময় : ০৭:২০:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
রাজধানীর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা আরও প্রকট রূপ ধারণ করেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে চাল, ডিম ও মুরগির দাম নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মানুষ যখন মাছ বা ডিমের দিকে ঝুঁকছে, সেখানেও মিলছে না কোনো স্বস্তি। রেকর্ড জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে খুচরা বাজারে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণ ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।
আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর ও খিলগাঁওসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির সরবরাহ বাড়লেও ক্রেতাদের পকেট কাটার চিত্র বদলায়নি।
চালের বাজারে নতুন করে উত্তাপ
মিল পর্যায়ে ও পাইকারি বাজারে কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে গত কয়েকদিনে চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে ভালো মানের মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯৫ টাকায়। মাঝারি মানের পাইজাম ও লতা চালের কেজি ঠেকেছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায়। চালের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্নআয়ের মানুষের প্রধান খাদ্য সংগ্রহ করাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাগালের বাইরে আমিষ: ডিম ও মুরগির বাজারে আগুন
নিম্নবিত্তের আমিষের প্রধান ভরসা ফার্মের ডিমের বাজার এখন সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের লাল ডিম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হালি হিসেবে কিনতে গেলে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা। প্রান্তিক খামারিদের দাবি, পশুখাদ্য (ফিড) ও ওষুধের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়লেও, মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে ডিমের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
একই চিত্র মুরগির বাজারেও। সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে আরও ১০ টাকা বেড়ে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা কেজি হিসেবে আগে থেকেই সাধারণের নাগালের বাইরে থাকায় সাধারণ ভোক্তারা চড়া দামের মুরগি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন৷
মাছের বাজারে তীব্র অস্বস্তি
মাংসের বিকল্প হিসেবে মাছের বাজারে গিয়েও ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন না। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বিক্রেতারা চড়া দাম হাঁকছেন। আকারভেদে প্রতি কেজি রুই ও কাতলা মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৬০০ টাকায়। সাধারণ মানুষের মাছ হিসেবে পরিচিত তেলাপিয়া ও পাঙাশের কেজিও এখন ২২০ থেকে ৩৫০ টাকা। এছাড়া শিং মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং যেকোনো ছোট মাছ ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
খুচরা বাজারের দামের এক নজরে চিত্র:

পণ্যের নাম বর্তমান বাজার দর (প্রতি কেজি/ডজন)
মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল ৭০ – ৯৫ টাকা
ফার্মের লাল ডিম (ডজন) ১৫০ – ১৬০ টাকা
ব্রয়লার মুরগি ১৯০ – ২০০ টাকা
সোনালি মুরগি ৩১০ – ৩৪০ টাকা
রুই ও কাতলা মাছ ২৮০ – ৬০০ টাকা
তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ ২২০ – ৩৫০ টাকা

সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বাজার মনিটরিংয়ের দাবি
কারওয়ান বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. আরীফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বেতন বাড়েনি এক টাকাও, কিন্তু বাজারে প্রতি সপ্তাহে জিনিসের দাম বাড়ছে। ডিম-ভাত খেয়ে যে বেঁচে থাকব, এখন ডিমের ডজনও ১৬০ টাকা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।”
বাজার বিশ্লেষক ও ক্যাব (কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)-এর মতে, করছাড় ও নীতিগত সুবিধার সুফল ভোক্তা পর্যায়ে না পৌঁছানোর মূল কারণ দুর্বল বাজার তদারকি। তারা বলছেন, অবিলম্বে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত কঠোর মনিটরিং ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার: চাল-ডিম-মুরগির দাম চড়া, অস্বস্তি মাছের বাজারেও

আপডেট সময় : ০৭:২০:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানীর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা আরও প্রকট রূপ ধারণ করেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে চাল, ডিম ও মুরগির দাম নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মানুষ যখন মাছ বা ডিমের দিকে ঝুঁকছে, সেখানেও মিলছে না কোনো স্বস্তি। রেকর্ড জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে খুচরা বাজারে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণ ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।
আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর ও খিলগাঁওসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির সরবরাহ বাড়লেও ক্রেতাদের পকেট কাটার চিত্র বদলায়নি।
চালের বাজারে নতুন করে উত্তাপ
মিল পর্যায়ে ও পাইকারি বাজারে কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে গত কয়েকদিনে চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে ভালো মানের মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯৫ টাকায়। মাঝারি মানের পাইজাম ও লতা চালের কেজি ঠেকেছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায়। চালের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্নআয়ের মানুষের প্রধান খাদ্য সংগ্রহ করাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাগালের বাইরে আমিষ: ডিম ও মুরগির বাজারে আগুন
নিম্নবিত্তের আমিষের প্রধান ভরসা ফার্মের ডিমের বাজার এখন সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের লাল ডিম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হালি হিসেবে কিনতে গেলে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা। প্রান্তিক খামারিদের দাবি, পশুখাদ্য (ফিড) ও ওষুধের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়লেও, মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে ডিমের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
একই চিত্র মুরগির বাজারেও। সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে আরও ১০ টাকা বেড়ে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা কেজি হিসেবে আগে থেকেই সাধারণের নাগালের বাইরে থাকায় সাধারণ ভোক্তারা চড়া দামের মুরগি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন৷
মাছের বাজারে তীব্র অস্বস্তি
মাংসের বিকল্প হিসেবে মাছের বাজারে গিয়েও ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন না। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বিক্রেতারা চড়া দাম হাঁকছেন। আকারভেদে প্রতি কেজি রুই ও কাতলা মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৬০০ টাকায়। সাধারণ মানুষের মাছ হিসেবে পরিচিত তেলাপিয়া ও পাঙাশের কেজিও এখন ২২০ থেকে ৩৫০ টাকা। এছাড়া শিং মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং যেকোনো ছোট মাছ ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
খুচরা বাজারের দামের এক নজরে চিত্র:

পণ্যের নাম বর্তমান বাজার দর (প্রতি কেজি/ডজন)
মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল ৭০ – ৯৫ টাকা
ফার্মের লাল ডিম (ডজন) ১৫০ – ১৬০ টাকা
ব্রয়লার মুরগি ১৯০ – ২০০ টাকা
সোনালি মুরগি ৩১০ – ৩৪০ টাকা
রুই ও কাতলা মাছ ২৮০ – ৬০০ টাকা
তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ ২২০ – ৩৫০ টাকা

সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বাজার মনিটরিংয়ের দাবি
কারওয়ান বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. আরীফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বেতন বাড়েনি এক টাকাও, কিন্তু বাজারে প্রতি সপ্তাহে জিনিসের দাম বাড়ছে। ডিম-ভাত খেয়ে যে বেঁচে থাকব, এখন ডিমের ডজনও ১৬০ টাকা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।”
বাজার বিশ্লেষক ও ক্যাব (কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)-এর মতে, করছাড় ও নীতিগত সুবিধার সুফল ভোক্তা পর্যায়ে না পৌঁছানোর মূল কারণ দুর্বল বাজার তদারকি। তারা বলছেন, অবিলম্বে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত কঠোর মনিটরিং ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে।