আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন রোনালদো
- আপডেট সময় : ০৬:০৪:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
- ২৩ বছরের অধ্যায়ের সমাপ্তি, পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল
- ইউরো ও দুই নেশনস লিগ জয়ের স্মৃতি নিয়ে বিদায়
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মহাতারকা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক আবেগঘন ভিডিওবার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। আগামী নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির ম্যাচগুলো শেষ করেই জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখবেন তিনি।
এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু দলের অধিনায়ক ও গোলের প্রধান ভরসাই ছিলেন না, পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাসে নতুন এক যুগেরও সূচনা করেছেন। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোল এবং সর্বাধিক ম্যাচ খেলার বিশ্ব রেকর্ড—দুটিই এখন তাঁর দখলে। পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ১৪৬।
বিদায়ের ঘোষণা দিয়ে নিজের আইকনিক ৭ নম্বর জার্সির প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন রোনালদো। ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার দিন এসে গেছে। কখনো ভাবিনি, জার্সিটি শুধু আমারই। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব দুটিই পেয়েছি।’
রোনালদোর ভাষায়, সিদ্ধান্তটি নেওয়া সহজ ছিল না। কারণ, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর পথচলা কেবল ম্যাচ, গোল কিংবা ট্রফির হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, সমর্থন এবং ব্যক্তিগত আবেগ। পর্তুগিজ সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দল ছাড়লেও দেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট থাকবে।
অভিষেক থেকে বিশ্ব রেকর্ড
২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। শুরুতে লুইস ফিগোর মতো অভিজ্ঞ তারকাদের সঙ্গে খেললেও সময়ের সঙ্গে তিনিই হয়ে ওঠেন পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় তারকা। ২০০৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেন তিনি। সেবার ফাইনালে গ্রিসের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করেছিল পর্তুগাল।
এরপর ২০০৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রোনালদো। ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বের দায়িত্বও পান। ২০০৮ সালের ইউরোতে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
তবে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্য আসে ২০১৬ সালে। ফ্রান্সের মাটিতে অনুষ্ঠিত ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্বাগতিকদের বিপক্ষে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু বাইরে থেকে সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। অতিরিক্ত সময়ে এদেরের করা গোলে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপসেরার মুকুট জেতে পর্তুগাল। জাতীয় দলের হয়ে এটিই ছিল রোনালদোর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা।
এরপর ২০১৯ সালে উয়েফা নেশনস লিগের প্রথম আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয় পর্তুগাল। ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতে দলটি। ২০২৫ সালেও দ্বিতীয়বারের মতো নেশনস লিগ জয়ের স্বাদ পান রোনালদোরা। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ২-২ গোলে শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে জয় পায় পর্তুগাল। সেই ফাইনালেও গোল করেছিলেন রোনালদো।
গোল ও ম্যাচে অনন্য এক রেকর্ড
আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলের হিসাবে রোনালদোর ধারেকাছে নেই আর কোনো পুরুষ ফুটবলার। পর্তুগালের হয়ে তাঁর ১৪৬ গোলের রেকর্ডের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। তাঁর গোলসংখ্যা ১২৬। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক ২৩৪ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও রোনালদোর। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই এই রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেন তিনি।
শুধু গোলসংখ্যা কিংবা ম্যাচ খেলার রেকর্ড নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকতার দিক থেকেও অনন্য রোনালদো। ২০০৩ সালে অভিষেকের পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর ধরে পর্তুগালের হয়ে গোল করেছেন তিনি। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার কীর্তিও রয়েছে তাঁর। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—প্রতিটি বিশ্বকাপেই পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এই তারকা।
বিদায়ের আগে বিতর্ক
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষদিকে এসে অবশ্য কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে রোনালদোকে। পর্তুগালের কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয় গত সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে। নেশনস লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচে খেললেও পরের ম্যাচে তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন কোচ। পরবর্তী ম্যাচেও একাদশে না রাখার ইঙ্গিত পেয়ে দলের অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান পর্তুগিজ অধিনায়ক।
ঘটনাটি নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। কোচ জেসুস পরে জানান, রোনালদোর জন্য জাতীয় দলের দরজা খোলা রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই বিতর্কের রেশ কাটার আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন এই তারকা।
তবে জাতীয় দল ছাড়লেও এখনই ফুটবলকে বিদায় জানাচ্ছেন না রোনালদো। সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে খেলছেন তিনি। ক্লাব ফুটবলে ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যা এক হাজারে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে তাঁর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে শেষ ম্যাচটি তিনি খেলেছেন গত ২৪ সেপ্টেম্বর, ওয়েলসের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে। পর্তুগাল সেই ম্যাচে ১-০ গোলে জয় পেয়েছিল।
রোনালদোর বিদায়কে সম্মান জানিয়ে তাঁকে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। ফেডারেশনের ভাষায়, রোনালদো পর্তুগালের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাওয়া নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছেন।
২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল, একটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও দুটি নেশনস লিগ শিরোপা—পরিসংখ্যানের বাইরেও পর্তুগিজ ফুটবলে রোনালদোর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে একটি প্রজন্মের গল্প। পর্তুগালের ৭ নম্বর জার্সিতে এবার নতুন কারও আবির্ভাব ঘটবে, কিন্তু রোনালদোর রেখে যাওয়া ইতিহাস সহজে মুছে যাওয়ার নয়।




















