বন্ধ হয়নি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ,দুই মাসে চাকরি পেলেন ১২ জন
- আপডেট সময় : ০৯:৪০:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
- / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে অবসরের বয়স ৬০ বছর। তারপর চলে যান অবসরে। তবে ২০১৮ সালে আইন করে অবসরে যাওয়াদের চুক্তি ভিত্তিক চাকরিতে ফেরানোর সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসনের বিশেষায়িত বা কারিগরি পদে কর্মকর্তা সংকটের কারণে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া আশর দশক থেকে প্রচলন থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু হয় এই প্রক্রিয়া। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই বিধান চলমান থাকে। বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় এসেও প্রশাসন সাজাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই চুক্তির পথেই হাঁটছে। যদিও সরকার থেকে বলা হচ্ছে,অপরিহার্য না হলে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
এ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিষয়টি আমরা ভালো চোখে দেখছেন না। সাবেক আমলারা এ নিয়ে নিজেদের মতামতও ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে অবসর প্রাপ্তরা পুনরায় চাকরি পাওয়ার সুযোগ পেলেও বঞ্চিত হন চাকরিতে থাকা অনেক যোগ্য কর্মকর্তা। এখানে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃস্টি হতে দেখা যায় এবং কাজের ব্যাঘাত ঘটে থাকে।
এখন বর্তমান সরকারও প্রশাসন সাজাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই চুক্তির পথেই হাঁটছে। এখানে অবশ্য সাবেক আমলা বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন, নতুন সরকার গুছিয়ে উঠতে এই নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেয়া যেতে পারে । তবে এর ওপর নির্ভরশীল হওয়া ঠিক হবে না।
নিয়মিত ব্যাচের কর্মরত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এভাবে নিয়োগ দিলে কর্মকর্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাদের পেশাদারিত্বে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তারাও দলীয় আনুকু্ল্য অর্জনের চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়াটি রাজনীতিকরণের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সরকারগুলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের চাকরিতে রেখে দিচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
যে কারণে চলমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করে ২০১৪ সালের ১ মার্চ তখনকার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ওই সময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হলে এর জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেয়া হয়। কিন্তু আজও এর প্রতিফলন ঘটেনি। আগের পথেই থেকে গেছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া।
সচিবদের মতে, যোগ্যতার চেয়ে এখানে আস্থাভাজন এবং দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়ার জন্যই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ ব্যবহার করা হয়। যে কারণে রাখা হয়নি সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা।
মূলত ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ এর ৪৯ ধারার ক্ষমতাবলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আইনের ৪৯ ধারার ১-উপধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীকে চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের পর, সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করিতে পারিবেন।’ উপধারা-২ এ বলা হয়েছে ‘উপ-ধারা (১) এর অধীন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটি ভোগরত থাকিলে, উক্ত ছুটি স্থগিত থাকিবে এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সমাপ্তির পর উক্ত অবশিষ্ট অবসর-উত্তর ছুটি ও তদ্সংশ্লিষ্ট সুবিধা ভোগ করা যাইবে।’
মূলত বিগত সরকারের সময় এই প্রক্রিয়াটি যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে তাতে পুরোটাই দলীয়করণে গিয়ে দাড়িয়েছে। এতে বিগত সময় বিরোধীমতবাদের আমলারা ছিলেন কোনঠাসা। তাদের অনেককেই চলে যেতে হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরে।
এক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিছুটা গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচ্য বলে মনে করছেন সাবেক আমলারা। তাদের মতে, এই চুক্তিতে একটি বিষয় ভালো যে এখানে সরকার কাউকে এক বছরের বেশি চুক্তি দিচ্ছে না। যদি দেখা যায় এক বছর তার পারফরম্যান্স ভালো, তাহলে তার মেয়াদ বাড়বে। না হয় এক বছর পরই বিদায় করে দেওয়া উচিত হবে।’
বর্তমান সরকারও অনেকটা সেই পথ ধরেই হাঁটছে। জনপ্রশাসন আব্দুল বারীর বক্তব অনুযায়ী বর্তমান সরকারও কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে। এ পর্যন্ত ১২জন আমলাকে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে তারেক রহমানের বিএনপি সরকার।
যেহেতু দেশ পরিচালনায় প্রত্যেক সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত থাকে। কাকে নিয়োগ দিলে কোথায় নিয়োগ দিলে সেই সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় সুবিধা হবে। নিজেদের পলিসি, মেনিফেস্টো বাস্তবায়নে দু-চারজন যোগ্যসম্পন্ন ব্যক্তিকে যে কারণে নিয়োগ দেয়া হয়। যা কিনা সাময়িক।
যদিও আওয়ামী লীগের আমলে ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার প্রয়োজন ছাড়া কাউকে নিয়োগ দিচ্ছে না বলে সরকারের এই প্রতিমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন। যাদের দেয়া হচ্ছে তাদের মেয়াদ হবে এক বছরের।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত দুই মাসে ১৮ ফেব্রুয়ারিতে অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার।১ মার্চ চুক্তিতে ধর্ম সচিব নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনিও এক বছরের জন্য চুক্তিতে এ নিয়োগ পান।
৩ মার্চ চুক্তিভিত্তিতে চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চারজন সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। তারা সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর মধ্যে মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, রফিকুল আই মোহাম্মদকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, আবদুল খালেককে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এবং মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবাইকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
গত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে চুক্তিতে নিয়োগ পান পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল। ২৫ মার্চ এস এম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়।
২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ২৮ মার্চ তার সেই নিয়োগ আদেশ আবার বাতিলও হয়।


















