সাফ বিজয়ী যুবাদের ফুল দিয়ে বরণ করলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, প্রংসায় সুলিভান ব্রাদার্স
- আপডেট সময় : ০৯:২১:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৩৩ বার পড়া হয়েছে
সন্ধ্যায় দেশে ফিরেছেন সাফফুটবলের শিরোপা বিজয়ী বাংলাদেশের যুবারা। তাদের ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। বিজয়ের ট্রফি আর আনন্দের স্মৃতি নিয়ে ফেরা যুব ফুটবলারদের চোখে মুখে ছিলো উচ্ছ্বাস। বিমান বন্দর থেকে তাদের নিয়ে আসা হয় খোলা বাসে করে। সুলিভান ব্রাদার্সের কাছে যা কিনা নতুন এক অভিজ্ঞতা।

একদিন আগে শিরোপা জেতার পর সাফ চ্যাম্পিয়নদের পুরস্কার দেওয়ার তাৎক্ষণিক ঘোষণা দেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। সাফজয়ী যুবাদের অভিনন্দন জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন,‘সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ে বাংলাদেশ দলকে প্রাণঢালা অভিনন্দন।’
এই ফুটবল তুর্কীদের বিমানবন্দরে ফুল দিয়ে বরণ করার পর হাতিরঝিল এম্ফিথিয়েটারে নেওয়ার কথা ঘোষনা করা হয়। যেই কথা সেই কাজ। বিমানবন্দরে যুব ফুটবলারদের খোলা বাসে করে বহন করে নিয়ে আনা হয়। হাতির ঝিলে আলো ঝলমলে পরিবেশে সম্মাননা প্রদানের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ নারী দল এশিয়া কাপে উঠার পরও এখানে গভীর রাতে অনুষ্ঠান করেছিল ফুটবল ফেডারেশন।

একদিন আগে মালদ্বীপের মালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে হারিয়ে সাফ অনুর্ধ্ব ২০ শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। দলটির সদস্যদের মধ্যে সেই আনন্দ এখনো বইছে। নির্ধারিত নব্বই মিনিটের খেলা গোল শুন্যভাবে শেষ হলে টাইব্রেকারে বাংলাদেশ জয় পায় ৪-৩ গোলে। যদিও ওখানেও ছিলো নাটকীয়তা। শুরুতেই ভারতের নেয়া শূটআপ রুখে দেয় বাংলাদেশ গোলকিপার মাহি। যে কিনা টুর্নামেন্ট সেরা গোলকিপারের স্বীকৃতি পান। এভাবে চলতে থাকা শ্যূটআপে বাংলাদেশেওে একটি শ্যূট মিস হয়ে যায় গোল পোষ্টে লেগে। তবে ভাগ্যটা বদলে যায় ভারতেরও দ্বিতীয় মিসটি। সামনে তখন সমীকরণ হয়ে দাড়িয়ে রোনান সুলিভানের শেষ শ্যূটআপ। মিস হলে ম্যাচটি আবারো দীর্ঘায়িত হতো। ভাগ্যের দিকে ফের তাকিয়ে থাকতে হতো। তবে সেটা হতে দেননি রোনান সুলিভান। ফাস্টবার দিয়ে অসাধারণ গোল। ভারতীয় গোলকিপার চেষ্টা করেও রুখতে পারেন নি। রোনান সুলেভিনের নেয়া সে শ্যূটআপটি নিয়ে এখনো চলছে চুলছেরা বিশ্লেষন। নি:সন্দেহে সুপার ক্লাশশর্ট। মূল দলের কোন খেলোয়াড়কেও এখনো দেখা যায়নি এমন শ্যূট নিতে। দক্ষতার প্রমান যেন এখানেই অনেক পরিস্কার হয়ে উঠলো। আগামীতে জাতীয় দলের হয়ে খেলার অপার সুযোগ যে তার জন্য অপেক্ষা করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলা বলতে পারেন না সুলিভান ব্রাদার্স। এই ক’দিনে একটা,দুইটা শব্দ সতীর্থদের কাছ থেকে রপ্ত করেছেন। বাংলাদেশের উত্তরাধীকারী হয়েছেন নানীর মাধ্যমে। এমন কি এই দেশের হয়ে খেলার জন্যও উদ্ভুদ্ধ হয়েছেন তারা নানী সুলতানা আলমের কাছ থেকে। নাতীদের খেলা দেখতে তিনি রীতিমতো মালদ্বীপেও ছুটে যান। খুব কাছ থেকে গ্যালারিতে বসে দেখেছেন খেলা। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম দর্শনেই নাতিদের শিরোপা বিজয়ে মহাখুশি তিনি। তাদের খেলা দেখে শুধু নানিই নন,উপস্থিত প্রবাসী বাঙালী দর্শকদেরও মন ছুয়ে যায় সোলাইমনা ব্রাদার্সের খেলায়।

অথচ ফাইনালের আগে ভারতের জাতীয় দলের সাবেক তারকা ফুটবলার বলেছিলেন, বাংলাদেশ তাদের এই দলটির সঙ্গে কয়েক গোল হজম করবে। পাত্তাই পাবেনা। কিন্তু সেটি হয়নি। বাংলাদেশের যুবারা তাদের সেই গর্ব চুরমার করে দিয়েছেন ফাইনালে। মালদ্বীপ জয় করে নিয়েছেন বাংলাদেশের ছেলেরা।

যেখানে সুলিভন ব্রাদার্সদের নিয়ে অতিমাত্রায় উৎসাহী ছিলেন সবাই। উন্নত দেশের সকল সুযোগ সুবিধা ফেলে এই বয়সেই বাংলাদেশের হয়ে খেলতে রাজি হওয়া অতপর খেলেও ফেলেছেন তারা। এটা যে অনেক বড় ত্যাগেৰ সে সম্মানটাই যেন সমর্থকদের দিতে মুখিয়ে ছিলেন। তাই তো তাদের দৈনন্দিন গল্প এখন সবার কাছে মুখরোচক সংবাদ হয়ে ওঠেছে। সবচে বড় বিষয় তাদের আরো দুই ভাই আছেন যারা মেজর লীগের খেলোয়াড়। আরেকজন নাকি ম্যানচেস্টারও সুযোগ পেয়েছেন। মালদ্বীপের রোনান সুলিভানদের প্রতিটি খেলা তাদের উপভোগ করেছেন। এমন কি ফাইনাল ম্যাচে রোনানের গোল করার পর সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা গেছে তাদের উচ্ছাসের বহিপ্রকাশ। সিট ছিড়ে আনন্দে নেচে উঠেছিলেন সূদূর আমেরিকায় বসে।

এবার শোনা যাক সুলিভান ব্রাদাস্যের বাংলাদেশে আসার গল্প – যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় বেড়ে ওঠেন কুইন সুলিভান। সুলিভান ভাইদের মধ্যে এখন কুইন সবচেয়ে জনপ্রিয়। এমনকি অনেকে আশা করছেন তিনি এবারে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলেও খেলতে পারেন। ইতোমধ্যে তিনি যুব বিশ্বকাপ খেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এবং নিয়মিত ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে মেজর সকার লিগে খেলছেন, যেই লিগে খেলছেন লিওনেল মেসি।
ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকেই এই তরুণ ফুটবলারের গল্পে হঠাৎ করেই উঠে এসেছে বাংলাদেশের কথা।
স্থানীয় ক্লাব ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের একটি ভিডিওতে খাবারের স্বাদ নিতে গিয়ে নিজেদের পারিবারিক শিকড়ের কথা বলতে গিয়ে আলোচনায় আসে তাদের বাংলাদেশি বংশসূত্র। এরপরই শুরু হয় অনুসন্ধান, যা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন পর্যন্ত।
সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ফিলাডেলফিয়ার এক প্রবাসী বাংলাদেশির পরিচালিত লবঙ্গ কাবাব অ্যান্ড ক্যাফেতে বসে আছেন কুইন। সামনে ধোঁয়া ওঠা নান, সঙ্গে গরু ও খাসির ঝোল। খেতে খেতেই তিনি গল্প করছিলেন নিজের শিকড় নিয়ে, বাংলাদেশের সঙ্গে তার নাড়ির টান নিয়ে। সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও পরে প্রকাশ করে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
কুইন তখন সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও ভালোবেসে তার নানীর কথা বলেছিলেন। তিনি জানান, তার নানী ঢাকার মেয়ে। সেখান থেকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে, ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় এবং সেখান থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি জাতিসংঘেও কাজ করেছেন।
পরে জানা যায়, কুইনের সেই নানীর নাম সুলতানা আলম। তিনি বিয়ে করেন ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ার জার্মান অধ্যাপক ক্লাউস ক্রিপেনডর্ফকে।
সুলিভানরা চার ভাই- রোনান ও ডেক্ল্যান এখন বাংলাদেশ বয়সভিত্তিক দলের সাথে, আর কুইন ও ক্যাভান সুলিভান যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল খেলছেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ডিজিটাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য অমিত হাসান জানান, এই চার ভাইয়ের নানী সুলতানা আলম একজন মুক্তিযোদ্ধা।
তিনি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় পড়াশোনা করতে গিয়ে এক জার্মান প্রফেসরকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির মেয়ের ঘরে জন্ম চার ভাইয়ের, যারা এখন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল খেলায় নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলছেন।
একটি সূত্রে জানা যায়, একটি ভিডিওতে খাবারের স্বাদ নিতে গিয়ে নিজেদের পারিবারিক শিকড়ের কথা তুলে আনার বিষয়টি একটি অনলাইন পেইজ সেইভ বাংলাদেশ ফুটবল প্রথমে খেয়াল করে। ক্লাবের ভিডিওতে তাদের বাঙালি পরিচয়ের ইঙ্গিত পাওয়ার পর পেইজটি সুলতানা আলমের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। সেখান থেকেই এই ফুটবলারদের সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের যোগাযোগের পথ তৈরি হয়।
সুলিভান পরিবারে ফুটবল যেন রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। তাদের বাবা ব্রেন্ডান সুলিভান অস্ট্রেলিয়ার এ লিগে ছয় বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে পাঁচটি ক্লাবে খেলেছেন। এর আগে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় খেলেছেন এবং পরে কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মা হেইকে ডিভিশন ওয়ান পর্যায়ে ফুটবল খেলেছেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী দলের অধিনায়ক ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে কুইন সুলিভান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুব দলে খেলেছেন এবং ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে মাঠে নামছেন। তার ছোট ভাই ক্যাভানও যুক্তরাষ্ট্রের যুব আন্তর্জাতিক দলে খেলেন, বলা হয়ে থাকে এই ক্যাভান নাকি এই চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান।
বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন যমজ ভাই ডেকলান ও রোনান, তারা আমেরিকায় বর্তমানে ওয়াইএসসি একাডেমিতে পড়াশোনা করছেন এবং এমএলএস নেক্সটের সহযোগী ক্লাব এফসি ডেলকোর হয়ে খেলছেন। এই পরিবারটি ফুটবল পরিববার। তাদের পরিবারের ফুটবল ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত।
তাদের চাচাতো ভাই ক্রিস অলব্রাইট যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ফুটবলার ছিলেন এবং ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলেছেন। এছাড়া তাদের নানা ল্যারি সুলিভান ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।















