আসিসি’রি দ্বিচারিতায় ক্রিকেট বিশ্বে সমালোচনা ঝড়
- আপডেট সময় : ১০:০৭:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৭৬ বার পড়া হয়েছে
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহনের যোগ্যতা অর্জন করা সত্বেও বাংলাদেশ ভারত-শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে পারছে না। তাদের স্থলে স্কটল্যান্ডকে সুযোগ দিয়ে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারী আইসিসি শুরু করতে যাচ্ছে সংক্ষিপ্ত ভার্সনের এই বিশ্বকাপ। নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ তাদের ভেন্যু ভারতকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কার স্থানান্তরের জন্য আইসিসি’র কাছে আবেদন করেছিলো। কিন্তু ক্রিকেটের এই সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি’র পূর্ণ সদস্যপ্রাপ্ত বাংলাদেশের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উল্টো খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে তাদের ছাড়াই বিশ্বকাপ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অথচ নিরাপত্তার কারণে পাকিস্তানে গিয়ে কখনোই ভারত ক্রিকেট খেলতে রাজি হয়নি, নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে তাদের ম্যাচগুলো বরাবরই দুবাইয়ে হয়ে আসছে। তাহলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন এই দ্বিচারিতা? তাহলে কি ভারত-বাংলাদেশের রাজনীতির অশুভ ছায়া এসে পড়েছে বিশ্বকাপের মতো ক্রিকেটেও! পাশবর্তী এই দুটি দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বৈরি সম্পর্ক শুরু হওয়ার পর থেকেই ভারত ক্রিকেটকে অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগানো শুরু করেছে। পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের সঙ্গেও তাদের ক্রিকেটীয় শক্তি প্রয়োগ করা শুরু হয়ে যায়। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ভারত গিয়ে আশ্রয় নেয়। ভারতের আশ্রয়ে শেখ হাসিনা সেখান থেকে বাংলাদেশকে অশান্ত রাখার ক্রমাগত পরিকল্পনা করে আসছে। সর্বশেষ ক্রিকেটে পড়েছে এর প্রভাব।
প্রথমত নিরাপত্তার কথা তুলে আইপিএল খেলা থেকে বাংলাদেশ পেসার মুস্তাফিজকে বাদ দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। পরবর্তীতে বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। মুস্তাফিজকেই যদি ভারত নিরাপত্তা দিতে না পারে তাহলে বাংলাদেশের জাতীয় দলকে কি করে নিরাপত্তা দিবে ভারত এমন প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক। এমন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচগুলোর ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানায় এবং ভেন্যু পরিবর্তন না হলে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ কোন ম্যাচ খেলতে রাজি নয়। ব্যস্ সেই সুযোগেই আইসিসিকে ব্যবহার করে ভারতীয় সরকার বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয়ার ফন্দি এ্যাটে সফল হয়। বিষয়টি এখন বিশ্বের ক্রিকেট অনুরাগীদের কাছে আয়নার মুতো পরিস্কার হয়ে যায়। ক্রিকেট বানিজ্যকে কাজে লাগিয়ে ভারত সরকার আইসিসিতে নিজেদের প্রভাব বিভিন্নভাবে প্রয়োগ করে আসছে। জানা যায় আইসিসি’র প্রায় সত্তরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারি যারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। এমন কি আইসিসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান হলেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সেক্রেটারি অমিত শাহ। তিনি আবার ভারতের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র ছেলে।
তারাই এখন শাসন করছে বিশ্বের ক্রিকেট। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে এখানেই ভারতের প্রতিহিংসা শিকার হতে হয় বাংলাদেশ। ভারতের দাবার চালে বিশ্বকাপ খেলা থেকে ছিটকে পড়েন টাইগাররা। ক্রিকেটে আইসিসি’র এমন দ্বিচারিতায় ক্রিকেট বিশ্বে ঝড় বইছে।
ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন(ডব্লিউসিএ) :
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ডব্লিউসিএ’র সিইও টম মোফাতের দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে একটি মূল্যবান ক্রিকেটিং জাতির অনুপস্থিতি আমাদের খেলাধুলার জন্য, বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের জন্য এক দুঃখজনক মুহূর্ত।… ক্রিকেট তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী থাকে, যখন প্রতিটি দল ও প্রতিটি খেলোয়াড়কে সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, যথাযথ ও ধারাবাহিকভাবে সমর্থন দেয়া হয় এবং ন্যায্য শর্তে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। সব অংশগ্রহণকারী যখন খেলাটির সাফল্যে প্রকৃত অবদানকারী হতে পারে, তখনই খেলাটি তার সেরা রূপে পৌঁছে।’
সংগঠনটি আরও যোগ করে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে খেলাটির কিছু বিস্তৃত প্রবণতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এর মধ্যে রয়েছে চুক্তি রক্ষা না করা, অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া এবং খেলোয়াড় ও তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শের অভাব। এসবই মানুষের প্রতি এক ধরনের উদাসীন মনোভাবের প্রতিফলন, যা ক্রিকেটে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক পর্যায়ে খেলাটির বিদ্যমান কাঠামোর গুরুতর সমস্যাগুলোকেও সামনে আনে। এসব সমস্যা যদি অব্যাহতভাবে উপেক্ষিত থাকে, তবে তা আস্থা, ঐক্য এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রিয় খেলাটির স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতকে দুর্বল করে দেবে।’
‘আমরা খেলাটির নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাই, বিভাজন বা বর্জনকে জায়গা করে দেওয়ার পরিবর্তে তারা যেন গভর্নিং বডি, লিগ এবং খেলোয়াড়সহ সব অংশীজনের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেন, খেলাটিকে বিভক্ত নয় বরং ঐক্যবদ্ধ করেন, এবং খেলাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও সাফল্যের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখেন।’
আইসিসির দ্বিমুখী নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অজি কিংবদন্তি জেসন গিলেস্পি :
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারত ও অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে আইসিসির ভিন্ন ভিন্ন নীতি বা ‘দ্বিমুখী আচরণ’ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার ও বর্তমান কোচ জেসন গিলেস্পি। বাংলাদেশ দলের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে সরিয়ে না নেয়া এবং চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তিনি।
২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অজুহাতে ভারত সেখানে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে আইসিসি ভারতের জন্য ‘হাইব্রিড মডেল’ গ্রহণ করে, যেখানে ভারতের ম্যাচগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্য কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। তার আগে এশিয়া কাপও একইভাবে হাইব্রিড মডেলে খেলে ভারত।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফায়েড এক্স একাউন্টে এক পোস্টে গিলেস্পি লেখেন, “আইসিসি কি কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছে যে কেন বাংলাদেশ তাদের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে খেলতে পারল না? আমার মনে পড়ছে, ভারত পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং তাদের সেই ম্যাচগুলো পাকিস্তানের বাইরে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কেউ কি এটার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন?”
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর না করায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতেই রাজি হয়নি। ফলে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে নিয়েছে ভারতের জয় শাহর নেতৃত্বাধীন আইসিসি।
আইসিসিতে অসঙ্গতির অভিযোগ তুললেন আফ্রিদি-ইউসুফ :
বাংলাদেশ ইস্যুতে আইসিসিতে অসংগতির অভিযোগ তুললেন পাকিস্তানের দুই সাবেক অধিনায়ক শহিদ আফ্রিদি এবং মোহাম্মদ ইউসুফ। এই সিদ্ধান্তকে অসঙ্গত ও বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। সূত্র- জিও সুপারের।
আফ্রিদি লেখেন, ‘বাংলাদেশে এবং আইসিসি ইভেন্টে খেলা একজন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে আজ আইসিসির এই অসঙ্গত আচরণে আমি গভীরভাবে হতাশ। ২০২৫ সালে পাকিস্তান সফরে না যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আইসিসি মেনে নিয়েছে, অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের বোঝাপড়া দেখানো হচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি (মানুষের) আস্থা ধরে রাখতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমতা ও একই অবস্থান অত্যন্ত জরুরি। ন্যায্যতাই বৈশ্বিক ক্রিকেট পরিচালনার ভিত্তি। বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও তাদের কোটি কোটি সমর্থক সম্মান পাওয়ার যোগ্য, দ্বৈত মানদণ্ড নয়। আইসিসির উচিত সেতুবন্ধন তৈরি করা, বিভাজন নয়।’
পাকিস্তানের আরেক সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ ইউসুফও বাংলাদেশের বর্তমান ক্রিকেট পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তার কারণে একটি ক্রিকেটপ্রেমী দেশ ক্রিকেট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দুঃখজনক।
ইউসুফ বলেন, ‘খুবই দুঃখজনক যে ক্রিকেটপ্রেমী একটি দেশ বাংলাদেশ নিরাপত্তা উদ্বেগ সমাধান না হওয়ায় ক্রিকেট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অতীতে যখন এ ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তখন নিরপেক্ষ ভেন্যু অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। দেশভেদে মানদণ্ড বদলানো যায় না।’
তিনি আরো বলেন, আইসিসির উচিত নিরপেক্ষ ও ন্যায্য ভূমিকা পালন করা, কোনো একক বোর্ডের স্বার্থ রক্ষা করা নয়। ইউসুফের ভাষ্য, ‘আইসিসিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের মতো আচরণ করতে হবে, কোনো নির্দিষ্ট বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে নয়। ন্যায্যতা ও একই মনোভব বজায় রাখাই বৈশ্বিক ক্রিকেটের ভিত্তি।’
আইসিসিকে পিসিবি সভাপতির কড়া সমালোচনা :
বাংলাদেশকে বাদ দেয়ার পর আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের অংশগ্রহণও অনিশ্চিত। এরই মধ্যে দল ঘোষণা করলেও সরকারের পরামর্শের পর দলটি জানাবে তারা বিশ্বকাপে অংশ নেবে কি না। সরকারের পরামর্শে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) যে সিদ্ধান্তই নেবে, সেটা মেনে নেবেন বিশ্বকাপে থাকা পাকিস্তানের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটাররা। খবর সামা টিভির।
বাংলাদেশকে বাদ দেয়া আইসিসির ‘ডাবল স্টান্ডার্ড’ বলে এই সিদ্ধান্তকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে পিসিবি। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে এক বৈঠকে পিসিবি চেয়ারম্যান সৈয়দ মহসিন রাজা নকভি বিশ্বকাপ ইস্যুতে বোর্ডের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই বিষয়ে দলকে আগেই অবগত করা হয়েছে। বৈঠকে খেলোয়াড়রা পিসিবির নীতিগত অবস্থানকে স্বাগত জানান এবং এতে পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
নকভি বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অবস্থান নৈতিকভাবে সঠিক এবং ক্রিকেটের মূল মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই কারণেই পাকিস্তান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।’
পিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ক্রিকেটকে রাজনৈতিক রঙে রাঙানো কারও স্বার্থ রক্ষা করে না। বিশ্বকাপ–সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের যে সিদ্ধান্ত হবে, পিসিবি তা অক্ষরে অক্ষরে ও পূর্ণভাবে অনুসরণ করবে।’













