মানুষের ভালোবাসায় চির বিদায় খালেদা জিয়া,নজির হয়ে থাকলেন দেশের রাজনীতিতে
- আপডেট সময় : ০৮:১৩:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৬৬ বার পড়া হয়েছে
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর দিয়েই শেষ হলো ইংরেজি বছর ২০২৫ সাল। গত এক বছরে রাজনীতির উত্তাল ঢেউ থমকে দাড়ায় এই একটি মৃত্যুর সংবাদে। শোকাহত হয়ে পড়েন গোটা জাতি। ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বরণ করেন। বছরের শেষ দিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা। স্মরণকালের সর্বোচ্চ মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠেয় সেই জানাজায় কতোজন লোক ছিলেন সেটা নিয়ে এখনো চলছে আলোচনা। খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের আবেগ অনুভুতির বহিপ্রকাশ যে এতোটা গভীরে সেটা দেখা মিলেছে ৩১ ডিসেম্বরের জানাজায়। মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে যে তার প্রতিদান পাওয়া এটিই যেন তারই প্রমান।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন ব্যক্তির জানাজায় এতো লোকের সমাগম আগে কখনোই হয়নি। ধারনা করা হচ্ছে জানাজায় অংশগ্রহনের সংখ্যা বিশ্বের টপ টেনের তালিকায় রয়েছে। কেউ বলছেন দেড় কোটি লোকের সমাগম হয়েছে, কেউ আবার পরিসংখ্যান করে বলছেন কমপক্ষে পঞ্চাশ লাখ লোকের সমাগত হয়েছে। তবে সংখ্যা যাই হোক কেন একটি দৃশ্য অবাক করার মতো। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সোবহান বাগ থেকে মিরপুর রোড, ২৭ নং ধানমন্ডি রোড, আবার পূর্বদিকে ফার্মগেইট, রোকেয়া স্মরণী, এমন কি মেট্রোরেল ভিতর এবং বাসার ছাদে দাড়িয়ে জানাজায় অংশ নিতে দেখা গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল। একজন গৃহিনী থেকে পরিপক্ক রাজনীতিবিদের এতোটা ভালোবাসা সত্যিই ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজার পর ছাত্র নেতা শরিফ ওসমান হাদির জানাজাতেও অসংখ্য লোকের সমাগম হয়েছিলো। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় লোক সমাগম ছিলো তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি।
আওয়ামী দূ:শাসনের সময় কারাবন্দি, অসুস্থ্যতা, মা এবং এক ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারানো ব্যাদনা, বড় ছেলে তারেক রহমানকে অনেকটা পঙ্গুত্ব নিয়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা খালেদা জিয়াকে অসহায় করে তোলে। তবে তিনি মন ভাঙ্গেন নি। দেশেরবলে জনগনের মুক্তির জন্য শেখ হাসিনা কুটক্তি ও দু:শাসন সহ্য করেছেন। বলেছিলেন, আমি আল্লাহর উপর ভরসা রাখছি, আমার ঠিকানা এই দেশ এবং এই দেশেই আমি থাকবো কোথাও যাবো না, এই দেশের মানুষই আমার সব। সে প্রতিদান দেশের মানুষ দিয়েছেন তার জানাজায় অংশ নিয়ে। উপাধি দিয়েছেন গণতন্ত্রের ‘মা’ হিসেবে। এমন মৃত্যুটাও অনেক বড় ভাগ্যের।
দেশ পরিচালনায় শোষনে নয়, সঠিক ও ন্যায় পরায়ন শাসনেই মানুষের মন জয় করা যায়। সতের বছর দেশ শাসন করে এক নেত্রী দেশ থেকে পালিয়েছে আরেক নেত্রী ত্যাগ স্বীকার করে হয়েছেন দেশের মানুষের ভালোবাসার প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার এই মৃত্যু এবং তার জানাজায় মানুষের ঢল বিএনপি’র আগামীর নেতৃত্বকে জানিয়ে দিয়েছে মানুষকে ভালোবাসার বিকল্প কিছু নেই। দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। বায়তুল মোকারমের খতীব পড়ান জানাজা। এতে অংশ নেন ইসমালিকা স্কলাররা। এই সময়ের সবচে পরিচিত হুজুররা বিশেষ করে আহামদ উল্লাহ, আজাহারিরা বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিয়েছেন। এমন কি আজাহারি হুজুর কাঁধে বহন করেছিলেন খালেদা জিয়ার কফিন। তার একটাই কারণ ইসলামের প্রতি বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন প্রচন্ড দূর্বল। ইসলামীক চিন্তা চেতনায় তিনি কখনোই বাধা ছিলেন না।
স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়া উর রহমানের কবরের পাশে বেগম খালেদা জিয়াকে কবর দেয়া হয়। তার কবর জিয়ারত করতে প্রতিনিয়ত সেখানে সাধারণ মানুষের ঢল নামছে। দু’হাত উচু করে আল্লাহর খাচে মোনাজাত করছেন খালেদা জিয়ার জন্য। একজন মানুষের এরচেয়ে আর বেশি কিছু পাওয়ার থাকে না। বেগম খালেদা জিয়াকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবই দিয়েছেন।
আজ বিএনপির নেতাদের কাছে খালেদা জিয়া এখন একটি উদাহরণ হয়ে থাকলেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন,বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ তার প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসারই প্রতিফলন।
খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষ বাড়ির ছাদ থেকেও অংশ নিয়েছে— এত বিপুল ভালোবাসার কারণ কী? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, এই ভালোবাসার কারণ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। যিনি তার নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। যিনি তার সমগ্র জীবন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াই করেছেন, কারাভোগ করেছেন। শেষদিন পর্যন্ত তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু কখনো দেশ ছেড়ে চলে যাননি।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার দেশের প্রতি ভালোবাসা, মাটির প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই এই মানুষগুলোকে আলোড়িত করেছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যখন তার অভিভাবকত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই সময় তার চলে যাওয়ায় মানুষ সবচেয়ে বেশি মর্মাহত হয়েছে। সে কারণেই দেশনেত্রীর নামাজে জানাজায় তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় মানুষ সমবেত হয়েছে এবং চোখের পানি ফেলেছে।
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, মানুষ অন্তত এই আশাটুকু নিয়ে গেছে যে, খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে কর্তব্য রয়েছে, তা তারা পালন করবে। তারা আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করে দেশের পক্ষে যে শক্তি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—সেই শক্তিকে বিজয়ী করবে বলে আমি মনে করি।
বাবা, মা ও ভাই হারানো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কেমন আছেন এবং খালেদা জিয়া যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন রেখে গেছেন, তাতে বিএনপির ওপর দায়িত্ব আরও বেড়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, নিঃসন্দেহে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে অবস্থান তৈরি করে গেছেন, তাতে তার পুত্র ও আমাদের নেতা তারেক রহমানের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মীরও দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন দিয়ে গেছেন, খালেদা জিয়া সেই পতাকাকে উঁচু করে তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পতাকাও তিনি তুলে ধরেছিলেন। একইভাবে তারেক রহমানও সেই পতাকা হাতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করবেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন—এটাই মানুষের প্রত্যাশা।
আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, না। আমি তো মনে করি, ম্যাডামের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে যে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে, মানুষের মধ্যে আবেগ কাজ করছে। এই আবেগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে।

















