ঢাকা ০২:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চলে গেলেন খালেদা জিয়া,৩দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হবে দাফন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৫:০৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৮৩ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে দুনিয়াকে চির বিদায় দিয়ে পরপারে চলে গেলেন বেগম খালেদা জিয়া। গত ৩৭ দিনের সকল চেষ্টা বিফলে চলে যায় ডাক্তারদের। আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকালে ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আপসহীন নেত্রী বিদায় জানালেন দেশবাসীকে। গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। এরপর থেকে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধারত ছিলেন। মঙ্গলবার ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ জানুয়ারি, ও ২ জানুয়ারি ২০২৬ শোক দিবস ঘোষণা করা হয়। বিএনপি’র পক্ষ থেকে সাতদিনের শোক দিবস ঘোষণা করা হয়।

বুধবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাযা শেষে স্বামী প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে বেগম জিয়ার দাপন কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে আপোষহীন নেত্রীেএবং বাংলাদেশের গণতন্তের জননী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশ জুড়ে শোকাবহ। স্তব্ধ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শোক বার্তা পাঠানো হচ্ছে। এছাড়াও  ভারত,পাকিস্তান, চীন থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানরা শোক বার্তা জানাচ্ছেন।

বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার প্রধান প্রফেস ড.ইউনুস এক শোকবার্তায়  বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে জাতি তার এক মহান অভিভাবককে হারাল। তার মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। তার মতো এমন নিখাদ দেশপ্রেমিক নেত্রীর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার অবদান, তার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং তার প্রতি জনগণের আবেগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার চলতি মাসে তাকে রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফেরেন খালেদা জিয়া। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়। এ অবস্থায় ২৩ নভেম্বর তাকে জরুরিভিত্তিতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসকরা জানান তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সঙ্গে আরও কিছু জটিলতা আছে। তার কিডনি ডায়ালাইসিসও করতে হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার আপসহীন নেতৃত্বের ফলে গণতন্ত্রহীন অবস্থা থেকে জাতি বারবার মুক্ত হয়েছে, মুক্তির অনুপ্রেরণা পেয়েছে। দেশ ও জাতির প্রতি তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

আশির দশকের শুরুর দিকে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন গৃহবধু। অন্যান্য আট-দশটি পরিবারের মতোই স্বামীর নিখাদ উপার্জিত আয় দিয়ে টেনে টুনে সংসার চালাতেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর বিএনপি চরম সংকটে পড়ে যায়।প্রয়োজনের তাগিদে ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির হাল ধরেন। এরপর ১৯৮৩ সালে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে বিচারপতি সাহাবউদ্দিন অসুস্ত্যতায় পড়লে বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। সেই রাজনীতির সূচনায় পার করেছেন প্রায় ৪১টি বছর।

দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশের প্রধান মন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এরপর বিরোধী রাজনৈতিক দলে থাকার সময় তৎকালীণ সরকারদের অন্যায়, অত্যচার,অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে বিভিন্ন সময় জেল-জুলুম খাটেন।

১৯৮৩ সালে সাত-দলীয় জোট গঠন করে স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর আট বছরের মধ্যে ৭বার অন্তরীণ হন তিনি। এরপরেও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯০ এর গণ আন্দোলন অতপর ২০০৮ সালের পর আদালদের এক আদেশে স্বামীর বাড়ি হারান বেগম খালেদা জিয়া। হারান ছোট সন্তান আরাফাত রহমান কোকোকে। বড় ছেলে তারেক রহমানকে অসুস্থ্য করে দেশান্ত করা হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর যখন তারেক রহমান দেশে ফিরতে পেরেছেন তখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন তারই মা খালেদা জিয়া। মায়ের মৃত্যুকে শোকে স্তব্ধ তিনি। বেগম খালেদা জিয়া তারেক রহমানের জন্মধরণী মা। কিন্তু দেশ-বাসির কাছে গণতন্ত্রের মা হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। তার মৃত্যুকে তারেক রহমান ও জাতি একজন অভিবাবককে হারালেন। তিনি ছিলেন একাধারে আপোষহীন, ত্যাগী ও একজন দেশপ্রেমী নেত্রী।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পরের দুই বছর দুই মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে একাকী সময় কাটান। সে সময় কারাগারে নিলে তার স্বজনরা সাক্ষাৎ করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘খালেদা জিয়া অসুস্থ।’ কারাগারে থাকাকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে কয়েকবার বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। যদি দেশে সে সময় তার পছন্দ ছিল ইউনাইটেড হাসপাতাল। বারবার আবেদনেও আওয়ামী লীগ সরকার চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দেয়নি। তাকে বিদেশে নিতে আন্দোলন-বিক্ষোভও করেন তার দলের নেতাকর্মীরা।

২০২১ সালের মে মাসে ঢাকায় নিজের বাসায় বন্দি থাকা অবস্থায় করোনা আক্রান্তও হন খালেদা জিয়া। শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। তখনও তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিল।

২০২৪ সালের জুনে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের বৈঠকে তার শরীরে পেসমেকার বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। সেময় তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ম্যাডামের হৃদরোগের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। হার্টে ব্লক ছিল। আগে একটা রিং পরানো হয়েছিল। সবকিছু পর্যালোচনা করে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে পেসমেকার বসানো হয়।’

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে সব দণ্ড থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। এরপর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান তিনি। পরে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যাডামের নানা শারীরিক জটিলতা রয়েছে, যা আমরা বিভিন্ন সময় বলেছি। সর্বোপরি ওনার লিভারের জটিলতা অর্থাৎ লিভার সিরোসিস পরে কম্পেনসেন্টারি লিভার ডিজিজ বলে গ্রেট-টু সেটার জন্য টিপস (চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ পদ্ধতি টিআইপিস-টিপস) করা হয়েছে। টিপসের কিছু টেকনিক্যাল অ্যাসপেক্ট আছে অ্যাডজাস্টমেন্টের বিষয় আছে… আপনি দেখতে হার্টে স্টান্টিং করার পর চেক করে আবার সেটার জন্য রি-স্টান্টিং করে অথবা চেক করে দেখে যে, স্টান্টিংটা ভালোভাবে কাজ করছে কি না… এই জিনিসগুলো তো আমরা করতে পারি নাই।’

প্রায় চার মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর থেকে দেশেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগষ্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহন করেন। তার আদি নিবাস ছিলো ফেনী। তার বাবা ইস্কানদার মজুমদার ব্যবসার সুবাদে জলপাইগুড়িতে বসবাস করতেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর জলপাই গুড়িতে চা ব্যবসা ছেড়ে তিনি দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।  ৫ ভাই-বোনের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়। দিনাজপুর মিশনারী স্কুল থেকে খালেদা জিয়া প্রাইমারী স্কুল এবং ১৯৬০ সালে দিনাজপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পাশ করেন। একই বছর ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট) জিয়াউর রহমানের সাথে বিয়ে হয়। তার কোল জুড়ে আসে দুই সন্তান তারেক রহমান পিনো ও প্রয়াত আরাফাত রহমান পিনো।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চলে গেলেন খালেদা জিয়া,৩দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হবে দাফন

আপডেট সময় : ০৫:০৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে দুনিয়াকে চির বিদায় দিয়ে পরপারে চলে গেলেন বেগম খালেদা জিয়া। গত ৩৭ দিনের সকল চেষ্টা বিফলে চলে যায় ডাক্তারদের। আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকালে ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আপসহীন নেত্রী বিদায় জানালেন দেশবাসীকে। গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। এরপর থেকে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধারত ছিলেন। মঙ্গলবার ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ জানুয়ারি, ও ২ জানুয়ারি ২০২৬ শোক দিবস ঘোষণা করা হয়। বিএনপি’র পক্ষ থেকে সাতদিনের শোক দিবস ঘোষণা করা হয়।

বুধবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাযা শেষে স্বামী প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে বেগম জিয়ার দাপন কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে আপোষহীন নেত্রীেএবং বাংলাদেশের গণতন্তের জননী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশ জুড়ে শোকাবহ। স্তব্ধ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শোক বার্তা পাঠানো হচ্ছে। এছাড়াও  ভারত,পাকিস্তান, চীন থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানরা শোক বার্তা জানাচ্ছেন।

বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার প্রধান প্রফেস ড.ইউনুস এক শোকবার্তায়  বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে জাতি তার এক মহান অভিভাবককে হারাল। তার মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। তার মতো এমন নিখাদ দেশপ্রেমিক নেত্রীর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার অবদান, তার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং তার প্রতি জনগণের আবেগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার চলতি মাসে তাকে রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফেরেন খালেদা জিয়া। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়। এ অবস্থায় ২৩ নভেম্বর তাকে জরুরিভিত্তিতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসকরা জানান তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সঙ্গে আরও কিছু জটিলতা আছে। তার কিডনি ডায়ালাইসিসও করতে হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার আপসহীন নেতৃত্বের ফলে গণতন্ত্রহীন অবস্থা থেকে জাতি বারবার মুক্ত হয়েছে, মুক্তির অনুপ্রেরণা পেয়েছে। দেশ ও জাতির প্রতি তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

আশির দশকের শুরুর দিকে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন গৃহবধু। অন্যান্য আট-দশটি পরিবারের মতোই স্বামীর নিখাদ উপার্জিত আয় দিয়ে টেনে টুনে সংসার চালাতেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর বিএনপি চরম সংকটে পড়ে যায়।প্রয়োজনের তাগিদে ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির হাল ধরেন। এরপর ১৯৮৩ সালে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে বিচারপতি সাহাবউদ্দিন অসুস্ত্যতায় পড়লে বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। সেই রাজনীতির সূচনায় পার করেছেন প্রায় ৪১টি বছর।

দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশের প্রধান মন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এরপর বিরোধী রাজনৈতিক দলে থাকার সময় তৎকালীণ সরকারদের অন্যায়, অত্যচার,অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে বিভিন্ন সময় জেল-জুলুম খাটেন।

১৯৮৩ সালে সাত-দলীয় জোট গঠন করে স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর আট বছরের মধ্যে ৭বার অন্তরীণ হন তিনি। এরপরেও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯০ এর গণ আন্দোলন অতপর ২০০৮ সালের পর আদালদের এক আদেশে স্বামীর বাড়ি হারান বেগম খালেদা জিয়া। হারান ছোট সন্তান আরাফাত রহমান কোকোকে। বড় ছেলে তারেক রহমানকে অসুস্থ্য করে দেশান্ত করা হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর যখন তারেক রহমান দেশে ফিরতে পেরেছেন তখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন তারই মা খালেদা জিয়া। মায়ের মৃত্যুকে শোকে স্তব্ধ তিনি। বেগম খালেদা জিয়া তারেক রহমানের জন্মধরণী মা। কিন্তু দেশ-বাসির কাছে গণতন্ত্রের মা হিসেবে পরিচিতি ছিলেন। তার মৃত্যুকে তারেক রহমান ও জাতি একজন অভিবাবককে হারালেন। তিনি ছিলেন একাধারে আপোষহীন, ত্যাগী ও একজন দেশপ্রেমী নেত্রী।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পরের দুই বছর দুই মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে একাকী সময় কাটান। সে সময় কারাগারে নিলে তার স্বজনরা সাক্ষাৎ করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘খালেদা জিয়া অসুস্থ।’ কারাগারে থাকাকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে কয়েকবার বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। যদি দেশে সে সময় তার পছন্দ ছিল ইউনাইটেড হাসপাতাল। বারবার আবেদনেও আওয়ামী লীগ সরকার চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দেয়নি। তাকে বিদেশে নিতে আন্দোলন-বিক্ষোভও করেন তার দলের নেতাকর্মীরা।

২০২১ সালের মে মাসে ঢাকায় নিজের বাসায় বন্দি থাকা অবস্থায় করোনা আক্রান্তও হন খালেদা জিয়া। শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। তখনও তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিল।

২০২৪ সালের জুনে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের বৈঠকে তার শরীরে পেসমেকার বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। সেময় তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ম্যাডামের হৃদরোগের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। হার্টে ব্লক ছিল। আগে একটা রিং পরানো হয়েছিল। সবকিছু পর্যালোচনা করে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে পেসমেকার বসানো হয়।’

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে সব দণ্ড থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। এরপর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান তিনি। পরে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যাডামের নানা শারীরিক জটিলতা রয়েছে, যা আমরা বিভিন্ন সময় বলেছি। সর্বোপরি ওনার লিভারের জটিলতা অর্থাৎ লিভার সিরোসিস পরে কম্পেনসেন্টারি লিভার ডিজিজ বলে গ্রেট-টু সেটার জন্য টিপস (চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ পদ্ধতি টিআইপিস-টিপস) করা হয়েছে। টিপসের কিছু টেকনিক্যাল অ্যাসপেক্ট আছে অ্যাডজাস্টমেন্টের বিষয় আছে… আপনি দেখতে হার্টে স্টান্টিং করার পর চেক করে আবার সেটার জন্য রি-স্টান্টিং করে অথবা চেক করে দেখে যে, স্টান্টিংটা ভালোভাবে কাজ করছে কি না… এই জিনিসগুলো তো আমরা করতে পারি নাই।’

প্রায় চার মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর থেকে দেশেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগষ্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহন করেন। তার আদি নিবাস ছিলো ফেনী। তার বাবা ইস্কানদার মজুমদার ব্যবসার সুবাদে জলপাইগুড়িতে বসবাস করতেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর জলপাই গুড়িতে চা ব্যবসা ছেড়ে তিনি দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।  ৫ ভাই-বোনের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়। দিনাজপুর মিশনারী স্কুল থেকে খালেদা জিয়া প্রাইমারী স্কুল এবং ১৯৬০ সালে দিনাজপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পাশ করেন। একই বছর ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট) জিয়াউর রহমানের সাথে বিয়ে হয়। তার কোল জুড়ে আসে দুই সন্তান তারেক রহমান পিনো ও প্রয়াত আরাফাত রহমান পিনো।