ঢাকা ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

৫৭ বছরে ৫৮ সন্তানের জনক সাদিকের জীবনের করুণ গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৭:৫৪:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৫৩ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বয়স ৫৭ বছর৷ আর এই বয়সেই ৫৮ সন্তানের জনক৷ প্রাগৈতিহাসিক যুগেও সন্ত্ন জন্মদানের এমন রেকর্ড আছে কিনা সেটা কেবল ইতিহাসই বলতে পারে৷ তবে আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকের চার স্ত্রীর সংসারে এতোগুলো সন্তানের উপস্থিতি নিয়ে বিবিসি’ বাংলার লেখা গল্পটি কোন কাল্পনিক কিংবা রুপকথার গল্প নয়৷

চারপাশ ঘিরে থাকা এই বিশাল সংখ্যক সন্তানদের কোলাহলে তাঁর বাড়িটি যেন সবসময়ই এক উৎসবের মঞ্চ। তবে এই প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাবার তীব্র দারিদ্র্য ও সব সন্তানদের  নাম মনে না রাখতে পারার করুণ এবং বাস্তব এক কাহিনী।

অভাবের সংসার, তার ওপর মাথার ওপর বিশাল এক পরিবারের গুরুদায়িত্ব। যেখানে একজন বা দুজন সন্তানের ভরণপোষণ করতেই সাধারণ মানুষের হিমশিম খেতে হয়৷ তবুও ভালোমন্দ যাই থাকুক না কেন খাবারটা সবাই এক সঙ্গেই খেতেন৷

একদিন খেতে গিয়ে দেখেন একজন কম। কিন্তু যে সন্তানটি   নাকি মেয়ে—তৎক্ষণাৎ তা-ও মনে করতে পারছিলেন না৷ এই রিপোর্টে  মোহাম্মদ সাদিকের এই ব্যতিক্রমী ও একই সঙ্গে হৃদয়বিদারক জীবনচিত্র উঠে এসেছে৷

চার স্ত্রী ও ৭০ সন্তানের দীর্ঘ ইতিহাস

মোহাম্মদ সাদিকের বৈবাহিক জীবনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। তিনি যখন প্রথম বিয়ে করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। এরপর একে একে চারজনকে বিয়ে করেন তিনি। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, তাঁর চার স্ত্রীই বিয়ের সময় অত্যন্ত কম বয়সী ছিলেন, যাদের বয়স ছিল মাত্র ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।

সাদিকের দাবি অনুযায়ী, চার স্ত্রীর গর্ভে তাঁর মোট সন্তান জন্মেছিল ৭০ জনেরও বেশি। কিন্তু উপযুক্ত যত্ন ও চিকিৎসার অভাবে তাদের মধ্যে ১৪ জন সন্তান ইতিমধ্যেই মারা গেছে। বর্তমানে তাঁর জীবিত ৫৮ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শিশুটির বয়স মাত্র কয়েক মাস। সাদিক তাঁর এই বহু সন্তানের পেছনে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ওই অঞ্চলে বাল্যবিবাহ এবং অল্প বয়সে ও ঘন ঘন গর্ভধারণের ফলে মায়েদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির এক বড় চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

উৎসবের আমেজ বনাম ক্ষুধার নির্মম বাস্তবতা

বাহ্যিকভাবে যখন ছোট ছোট সন্তানরা সাদিককে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে, তখন মনে হয় যেন বাড়িতে কোনো বিয়ের উৎসব চলছে। কিন্তু এই কোলাহলের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে ক্ষুধার নির্মম হাহাকার।

পরিবারটির জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত করুণ। মাটির তৈরি যে ঘরটিতে তাঁরা থাকেন, সেখানে নেই কোনো মজবুত দরজা কিংবা জানালা; শীতের বাতাস আটকাতে প্রবেশমুখে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সামান্য পাতলা পর্দা। কনকনে শীতের রাতেও কোনো ভালো বিছানা বা ওম নেওয়ার ব্যবস্থা নেই, বাধ্য হয়েই কখনো কখনো ৬ থেকে ৭ জন সন্তানকে একটিমাত্র পাতলা কম্বলের নিচে রাত কাটাতে হয়। অর্থের অভাবে রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ কেনার সামর্থ্য নেই পরিবারটির, তাই প্লাস্টিক ও কুড়িয়ে আনা কাগজ পুড়িয়ে কোনোমতে আগুন জ্বালানো হয়। বেশিরভাগ সন্তানই পর্যাপ্ত জুতো-পোশাকের অভাবে খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়। পুরো পরিবারে দিনে মাত্র দুবেলা খাবার জোটে, যার ফলে প্রায়শই অনেক সন্তানকে ক্ষুধার্ত পেটেই ঘুমাতে যেতে হয়।

দিন এনে দিন খাওয়া এক বাবার করুণ আকুতি

পড়তে বা লিখতে না জানা মোহাম্মদ সাদিক পেশায় একজন সাধারণ গাড়ি বিক্রেতা (কার ডিলারশিপ কর্মী)। তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস হলো শোরুম থেকে কোনো গাড়ি বিক্রি হলে সেখান থেকে পাওয়া সামান্য কমিশন। প্রতি গাড়ি বিক্রিতে তিনি মাত্র ১,০০০ আফগানি (প্রায় ১৫ মার্কিন ডলার) কমিশন পান। এই অনিশ্চিত ও সামান্য আয় দিয়ে এত বিশাল পরিবারের ভরণপোষণ চালানো সম্পূর্ণ অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁর বেশ কয়েকজন বড় সন্তানকে পরিবার বাঁচাতে কাগজ এবং প্লাস্টিক কুড়ানোর কাজ করতে হয়।

নিজের তীব্র কষ্টের কথা জানিয়ে সাদিক বলেন, “আমার সন্তানরা যখন আমার কাছে রুটি চায়, আমি বুঝতে পারি না তাদের কী দেব! যদি আগে জানতাম এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে যেখানে সন্তানদের মুখে এক টুকরো শুকনো রুটিও তুলে দিতে পারব না, তবে কখনোই এত সন্তান নিতাম না।”

নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও সাদিক চেয়েছিলেন তাঁর সব সন্তান যেন অন্তত শিক্ষার আলো পায়। কিন্তু আর্থিক অনটনে এখন সেই স্বপ্নও ফিকে হতে বসেছে। বর্তমানে তাঁর একমাত্র আকুতি—সন্তানরা যেন দুবেলা পেট পুরে খেতে পায় এবং পড়াশোনার সুযোগ পায়। এই অসহায় অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি দেশটির বর্তমান সরকার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এবং বিত্তবান মানুষদের কাছে জরুরি সাহায্যের জন্য জোরালো আবেদন জানিয়েছেন।

মোহাম্মদ সাদিকের এই জীবনকাহিনী কেবল একটি বড় পরিবারের গল্প নয়, বরং এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলমান চরম অর্থনৈতিক সংকট, বাল্যবিবাহের কুফল এবং মানবিক বিপর্যয়ের এক জীবন্ত ও করুণ দলিল।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

৫৭ বছরে ৫৮ সন্তানের জনক সাদিকের জীবনের করুণ গল্প

আপডেট সময় : ০৭:৫৪:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বয়স ৫৭ বছর৷ আর এই বয়সেই ৫৮ সন্তানের জনক৷ প্রাগৈতিহাসিক যুগেও সন্ত্ন জন্মদানের এমন রেকর্ড আছে কিনা সেটা কেবল ইতিহাসই বলতে পারে৷ তবে আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকের চার স্ত্রীর সংসারে এতোগুলো সন্তানের উপস্থিতি নিয়ে বিবিসি’ বাংলার লেখা গল্পটি কোন কাল্পনিক কিংবা রুপকথার গল্প নয়৷

চারপাশ ঘিরে থাকা এই বিশাল সংখ্যক সন্তানদের কোলাহলে তাঁর বাড়িটি যেন সবসময়ই এক উৎসবের মঞ্চ। তবে এই প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাবার তীব্র দারিদ্র্য ও সব সন্তানদের  নাম মনে না রাখতে পারার করুণ এবং বাস্তব এক কাহিনী।

অভাবের সংসার, তার ওপর মাথার ওপর বিশাল এক পরিবারের গুরুদায়িত্ব। যেখানে একজন বা দুজন সন্তানের ভরণপোষণ করতেই সাধারণ মানুষের হিমশিম খেতে হয়৷ তবুও ভালোমন্দ যাই থাকুক না কেন খাবারটা সবাই এক সঙ্গেই খেতেন৷

একদিন খেতে গিয়ে দেখেন একজন কম। কিন্তু যে সন্তানটি   নাকি মেয়ে—তৎক্ষণাৎ তা-ও মনে করতে পারছিলেন না৷ এই রিপোর্টে  মোহাম্মদ সাদিকের এই ব্যতিক্রমী ও একই সঙ্গে হৃদয়বিদারক জীবনচিত্র উঠে এসেছে৷

চার স্ত্রী ও ৭০ সন্তানের দীর্ঘ ইতিহাস

মোহাম্মদ সাদিকের বৈবাহিক জীবনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। তিনি যখন প্রথম বিয়ে করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। এরপর একে একে চারজনকে বিয়ে করেন তিনি। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, তাঁর চার স্ত্রীই বিয়ের সময় অত্যন্ত কম বয়সী ছিলেন, যাদের বয়স ছিল মাত্র ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।

সাদিকের দাবি অনুযায়ী, চার স্ত্রীর গর্ভে তাঁর মোট সন্তান জন্মেছিল ৭০ জনেরও বেশি। কিন্তু উপযুক্ত যত্ন ও চিকিৎসার অভাবে তাদের মধ্যে ১৪ জন সন্তান ইতিমধ্যেই মারা গেছে। বর্তমানে তাঁর জীবিত ৫৮ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শিশুটির বয়স মাত্র কয়েক মাস। সাদিক তাঁর এই বহু সন্তানের পেছনে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ওই অঞ্চলে বাল্যবিবাহ এবং অল্প বয়সে ও ঘন ঘন গর্ভধারণের ফলে মায়েদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির এক বড় চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

উৎসবের আমেজ বনাম ক্ষুধার নির্মম বাস্তবতা

বাহ্যিকভাবে যখন ছোট ছোট সন্তানরা সাদিককে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে, তখন মনে হয় যেন বাড়িতে কোনো বিয়ের উৎসব চলছে। কিন্তু এই কোলাহলের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে ক্ষুধার নির্মম হাহাকার।

পরিবারটির জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত করুণ। মাটির তৈরি যে ঘরটিতে তাঁরা থাকেন, সেখানে নেই কোনো মজবুত দরজা কিংবা জানালা; শীতের বাতাস আটকাতে প্রবেশমুখে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সামান্য পাতলা পর্দা। কনকনে শীতের রাতেও কোনো ভালো বিছানা বা ওম নেওয়ার ব্যবস্থা নেই, বাধ্য হয়েই কখনো কখনো ৬ থেকে ৭ জন সন্তানকে একটিমাত্র পাতলা কম্বলের নিচে রাত কাটাতে হয়। অর্থের অভাবে রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ কেনার সামর্থ্য নেই পরিবারটির, তাই প্লাস্টিক ও কুড়িয়ে আনা কাগজ পুড়িয়ে কোনোমতে আগুন জ্বালানো হয়। বেশিরভাগ সন্তানই পর্যাপ্ত জুতো-পোশাকের অভাবে খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়। পুরো পরিবারে দিনে মাত্র দুবেলা খাবার জোটে, যার ফলে প্রায়শই অনেক সন্তানকে ক্ষুধার্ত পেটেই ঘুমাতে যেতে হয়।

দিন এনে দিন খাওয়া এক বাবার করুণ আকুতি

পড়তে বা লিখতে না জানা মোহাম্মদ সাদিক পেশায় একজন সাধারণ গাড়ি বিক্রেতা (কার ডিলারশিপ কর্মী)। তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস হলো শোরুম থেকে কোনো গাড়ি বিক্রি হলে সেখান থেকে পাওয়া সামান্য কমিশন। প্রতি গাড়ি বিক্রিতে তিনি মাত্র ১,০০০ আফগানি (প্রায় ১৫ মার্কিন ডলার) কমিশন পান। এই অনিশ্চিত ও সামান্য আয় দিয়ে এত বিশাল পরিবারের ভরণপোষণ চালানো সম্পূর্ণ অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁর বেশ কয়েকজন বড় সন্তানকে পরিবার বাঁচাতে কাগজ এবং প্লাস্টিক কুড়ানোর কাজ করতে হয়।

নিজের তীব্র কষ্টের কথা জানিয়ে সাদিক বলেন, “আমার সন্তানরা যখন আমার কাছে রুটি চায়, আমি বুঝতে পারি না তাদের কী দেব! যদি আগে জানতাম এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে যেখানে সন্তানদের মুখে এক টুকরো শুকনো রুটিও তুলে দিতে পারব না, তবে কখনোই এত সন্তান নিতাম না।”

নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও সাদিক চেয়েছিলেন তাঁর সব সন্তান যেন অন্তত শিক্ষার আলো পায়। কিন্তু আর্থিক অনটনে এখন সেই স্বপ্নও ফিকে হতে বসেছে। বর্তমানে তাঁর একমাত্র আকুতি—সন্তানরা যেন দুবেলা পেট পুরে খেতে পায় এবং পড়াশোনার সুযোগ পায়। এই অসহায় অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি দেশটির বর্তমান সরকার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এবং বিত্তবান মানুষদের কাছে জরুরি সাহায্যের জন্য জোরালো আবেদন জানিয়েছেন।

মোহাম্মদ সাদিকের এই জীবনকাহিনী কেবল একটি বড় পরিবারের গল্প নয়, বরং এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলমান চরম অর্থনৈতিক সংকট, বাল্যবিবাহের কুফল এবং মানবিক বিপর্যয়ের এক জীবন্ত ও করুণ দলিল।