মন্ত্রণালয় কমিয়ে পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ

- আপডেট সময় : ১২:১৪:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- / ৭৩ বার পড়া হয়েছে
মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্তিসংগতভাবে কমিয়েেআনার সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। সরকারের সব মন্ত্রণালয়কে মোট ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। একইসঙ্গে সব মন্ত্রণালয়কে সমপ্রকৃতির পাঁচটি স্বল্পমেয়াদি গুচ্ছে বিভক্ত করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রিসভার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিস্তারিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। এর আগে বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।
সংস্কার সুপারিশে পুরনো চারটি বিভাগের সীমানাকে চার প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা চালু, কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন দু’টি বিভাগ, ‘নয়াদিল্লির মতো’ কেন্দ্র শাসিত ‘রাজধানী মহানগর সরকার’ গঠন করে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাসের জন্য সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে একটির বদলে তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কোটা ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশে আনার মতো প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংস্কার প্রতিবেদনকে মোট ১৭টি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এরমধ্যে আছে জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের আচরণগত সংস্কার, নাগরিক পরিষেবা উন্নয়নে জনপ্রশাসন, জনপ্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পুনর্গঠন (মন্ত্রণালয়/দফতর পুনর্বিন্যাসকরণ), সিভিল সার্ভিসের কাঠামো ও প্রক্রিয়াগত সংস্কার, জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কার, জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংস্কার, জনপ্রশাসনের নৈপুণ্য বিকাশ ও সক্ষমতার উন্নয়ন, কর্মদক্ষ জনপ্রশাসনের জন্য সংস্কার, জনপ্রশাসনে কার্যকারিতার লক্ষ্যে সংস্কার, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস সংস্কারে বিশেষ সুপারিশমালা, বাংলাদেশ শিক্ষা সার্ভিস সংস্কারে বিশেষ সুপারিশমালা, পার্বত্য এলাকার জনপ্রশাসন সংস্কারে বিশেষ সুপারিশ, জনপ্রশাসনে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে সংস্কার প্রস্তাব।
মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে গুচ্ছ করা
বর্তমানে মোট ৪৩টি মন্ত্রণালয় এবং ৬১টি বিভাগ স্বল্পমেয়াদি রয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্তিসংগতভাবে হ্রাস করে কমিশন সরকারের সব মন্ত্রণালয়কে মোট ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে কমিশন সব মন্ত্রণালয়কে সমপ্রকৃতির পাঁচটি স্বল্পমেয়াদি গুচ্ছে বিভক্ত করার সুপারিশ করেছে। মন্ত্রণালয়/বিভাগকে নিম্নলিখিত পাঁচটি গুচ্ছে বিন্যস্ত করা যেতে পারে বলেও প্রস্তাব করা হয়েছে— (ক) বিধিবদ্ধ প্রশাসন, (খ) অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য, (গ) ভৌত অবকাঠামো ও যোগাযোগ, (ঘ) কৃষি ও পরিবেশ, (ঙ) মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংস্কার
বর্তমানে দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই অধিকতর কার্যকর করার জন্য সংস্কার করা প্রয়োজন বলে কমিশন জানিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়, সবচেয়ে প্রাচীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা। এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা গেলে নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। উপজেলা পরিষদ যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চালু করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। একে কার্যকর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। জেলা পরিষদকে কখনোই জনপ্রতিনিধিত্বশীল করা যায়নি। অধিকাংশ জেলা পরিষদ তহবিলের দিক থেকেও দুর্বল অবস্থায় আছে। উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করা হলে জেলা পরিষদের প্রাসঙ্গিকতা কমে যাবে। সুতরাং, জেলা পরিষদকে বাতিল করা সমীচীন হবে।
প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা
দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং সরকারের কার্যপরিধি সুবিস্তৃত হওয়ার ফলে বর্তমান প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার কাঠামো যথেষ্ট প্রতীয়মান হয় না বলে মনে করছে কমিশন। এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয় পর্যায়ে খুঁটিনাটি বহু কাজ সম্পাদন করা হয়। ক্ষমতার প্রত্যর্পণ (ডেলিগেশন) বিবেচনায় দেশে বিশাল জনসংখ্যার পরিষেবা ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করার লক্ষ্যে দেশের পুরনো চারটি বিভাগের সীমানাকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এর ফলে এককেন্দ্রিক সরকারের পক্ষে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ হ্রাস পাবে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা শহরের ওপর চাপ হ্রাস পাবে। এদিকে রাজধানী ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা ও পরিষেবার ব্যাপ্তির কথা বিবেচনায় রেখে নয়াদিল্লির মতো ফেডারেল সরকার নিয়ন্ত্রিত ‘ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট’ বা ‘রাজধানী মহানগর সরকার’ গঠনেরও সুপারিশ করেছেন তারা। অন্যান্য প্রদেশের মতোই এখানেও নির্বাচিত আইন সভা ও স্থানীয় সরকার থাকবে। ঢাকা মহানগরী, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও নারায়ণগঞ্জকে নিয়ে ‘ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট’- এর আয়তন নির্ধারণ করা যেতে পারে।
জেলা পরিষদ বাতিল ও পৌরসভা শক্তিশালীকরণ
কমিশন চায় স্থানীয় সরকারের একটি ধাপ হিসেবে জেলা পরিষদ বহাল থাকবে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কখনোই নাগরিকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হননি। কিছু জেলা পরিষদ বাদে বেশিরভাগেরই নিজস্ব রাজস্বের শক্তিশালী উৎস নেই। ফলে বেশিরভাগ জেলা পরিষদ আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সেহেতু জেলা পরিষদ বাতিল করা যেতে পারে। একইসঙ্গে পৌরসভার গুরুত্ব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার হিসেবে একে অধিকতর শক্তিশালী করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন ওয়ার্ড মেম্বারদের ভোটে। কারণ চেয়ারম্যান একবার নির্বাচিত হলে মেম্বারদের আর গুরুত্ব দেয় না।
ডিসি’র মামলা গ্রহণের ক্ষমতা
জেলা কমিশনারকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সিআর মামলা (নালিশি মামলা) প্রকৃতির অভিযোগগুলো গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। এতে বলা হয়েছে, তিনি অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য উপজেলার কোনও কর্মকর্তাকে বা সমাজের স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে সালিশী বা তদন্ত করার নির্দেশ দিতে পারবেন। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হলে থানাকে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।