নতুন বছরে আসছে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট!

- আপডেট সময় : ০৭:১১:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৪
- / ২৪০ বার পড়া হয়েছে
জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্লকআউটে পড়েছিলো বাংলাদেশ। তাতে দেশের ব্যবসা-বানিজ্য,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বত্রে পড়েছে এর প্রভাব। ডিজিটাল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনেকটা অচল হয়ে পড়েছিলো দেশ। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার নতুন করে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু করতে যাচ্ছে। এটি চালু হলে আগামীতে কখনোই আর নাগরিকদের ডিজিটাল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবে না। দেশের জরুরী সময়েও চালু থাকবে ইন্টারনেট।
সেই লক্ষ্যে এ নিয়ে এনজিএসও স্যাটেলাইট পরিষেবা অপারেটরের জন্য খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসি। এ নিয়েআজই শেষ হচ্ছে জনমত গ্রহন। এই মতামত নিয়ে চলতি মাসের শেষ দিকে একটি বহুপক্ষীয় সভাও করার কথা রয়েছে।
সূত্রমতে, চলতি বছরের মধ্যেই এই প্রক্রিয়াটা শেষ হতে যাচ্ছে। সেই হিসেবে আগামী বছরের শুরুর দিকেই ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু হতে পারে দেশে। যদিও এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এখনো পর্যন্ত কোন মতামত প্রকাশ করেনি ।
এমন সিদ্ধান্তের ফলে দরজা খুলে যেতে পারে স্যােেটাইট কোম্পানীগুলোর বলে মন্তব্য করেছেন, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৗধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে স্টারলিংক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেছেন, স্টারলিংক গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে, কিন্তু বিটিআরসির আইনের কারণে তারা আসতে পারছে না। এখন এই আইনটি পাশ হলেই বাংলাদেশের প্রবেশ করার সুযোগ পাবে স্টারলিঙ্ক এর মতো বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানীগুলো। তাতে জরুরী সময়েও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে এই ব্যবস্থা চালু হলে আবার ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। তখন আর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রনেরও সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাতে দেশের ব্যবসা-বানিজ্য থেকে শুরু করে অনেক তথ্যই ফাঁস হওয়ার মতো ঝুঁকিও রয়েছে।
এক্ষেত্রে আবার দেশীয় ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরাও সুযোগ প্রত্যাশা করেছেন। তারা চাচ্ছে ব্যবস্থাপনাটি যেন ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ের মাধ্যমে আপলিঙ্ক ও ডাউনলিঙ্ক করা হয়।
এ নিয়ে আইএসপিএবি সাধারণ সম্পাদক নাজমুল করিম ভূঁইয়া বলেন, নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, তবে প্রযুক্তিটি দেশ ও জনগণের জন্য উপযোগী কি না তা আগে বিবেচনা করা উচিত। এ বিষয়ে আমরা বৈঠক করে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ প্রস্তুত করেছি। বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসি-কে চিঠি দিয়েও অবহিত করা হচ্ছে।
একইভাবে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব দেশে ডেটা পরিষেবায় বিপ্লব ঘটাবে বিবেচনায় এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, যেহেতু এই লাইসেন্সের ফলে সরাসরি-টু-হোম পরিষেবা, সম্প্রচার পরিষেবা, স্যাটেলাইট আইএমটি-ভিত্তিক পরিষেবা বা টেলিযোগাযোগ পরিষেবা দেয়া যাবে সেহেতু এই উদ্যোগ ডিজিটাল বিভাজন দূর করে, তাতে সেতুবন্ধনে নতুন সুযোগ উন্মোচন করতে পারে।
তবে মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিশেনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, নীতিমালায় চাহিবা মাত্র গ্রাহকের তথ্যে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং কমিশনকে প্রবেশ অধিকার চাওয়া হয়েছে যা সম্পূর্ণভাবেই সংবিধান পরিপন্থী।
এক্ষেত্রে যে কোনো নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন আচরণ নিশ্চিত করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন গ্রাহক সংখ্যায় শীর্ষে থাকা মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশন্স শরফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। একইভাবে জনসাধারনের পরামর্শ নেওয়ার এ প্রক্রিয়াটির ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা তৈরিতে সহায়ক হবে বলে মনে করেন বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান। আর রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট এবং নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা শাহেদ আলম বলেছেন, ডেটা পরিষেবায় বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনার স্বীকৃতি হিসেবে আমরা দেশে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট চালুর উদ্যোগ স্বাগত জানাই। এই অগ্রগতি ব্যাকহোলিং, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক ডেটা ব্যবহারের মতো ক্ষেত্রে নতুন সুযোগের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
টেলিকমনীতি বিশ্লেষক মুস্তাফা মাহমুদ হোসেন বলেছেন, এনজিএসও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট দেশে চালু হলে বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। প্রত্যন্ত, অনুন্নত এলাকায় সংযোগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা উপকার পাবে, ব্যবসা বাড়বে ও মানুষের যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে। এর জন্য আমলাতান্ত্রিক বাধা কমাতে হবে। সাশ্রয়ী দামে সেবা দিতে হবে। বিটিআরসি এখানে কাজ করতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ফাহিম মাশুরুর বলেছেন, এটা হলে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু অনেক এক্সপেন্সিভ হবে।তবে দেশের অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও এনজিও এটা ব্যবহার করবে।
এদিকে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু করতে গত কয়েক বছর ধরেই কাজ করছে ইলন মাস্কের স্টারলিংক। বছর তিনেক ধরে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক। সেসময় তারা দুবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। বিডা বিষয়টি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) জানালে শুরুর দিকে স্টারলিংকের প্রতি বিটিআরসির অনাগ্রহ ছিল। তবে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি ও আইসিটি বিভাগের আগ্রহে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড স্টারলিংকের প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য বিটিআরসির অনুমোদন নেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ওই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশে আসে স্টারলিংকের কিছু প্রযুক্তি।
পরীক্ষায় স্টারলিংক ইন্টারনেটের ডাউনলোড স্পিড ১৫০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডের মধ্যে পাওয়া যায়। এসময় নিজেদের ওয়েবসাইটে নতুন কাভারেজে বাংলাদেশের নাম যুক্ত করে স্টারলিংক। এর পর নজরদারি ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে আটকে ছিল। এরই মধ্যে চলতি বছরের উত্তাল সময়ে সে বিষয়টিও চাপাও পরে যায়। তবে নভেম্বরে ফের আলোচনা শুরু করে বিডা।
এদিকে শনিবার ১৬ নভেম্বর আগারগাঁওয়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটিতে শেষ হওয়া ৫ দিনব্যাপী মেগা আইটি ফেয়ারে প্রদর্শিত হয়েছে স্টারলিংকের রিসিভার, কিকস্ট্যান্ড, রাউটার ও পাওয়ার সাপ্লাই। রায়ন কম্পিউটার্সের দোকানে প্রদর্শিত ডিভাইস থেকে জানাগেছে, স্টারলিংকের অ্যান্টেনা ইলেকট্রনিক ফেজড অ্যারে, যা ১১০ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকানো যায়। এর ওজন প্রায় ২ কেজি ৯০০ গ্রাম, কিকস্ট্যান্ডসহ ৩ কেজি ২০০ গ্রাম। এতে আছে এনভায়রনমেন্টাল রেটিং আইপি৬৭ টাইপ ৪ অ্যান্টেনা, যা হিমাঙ্কের নিচে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং হিমাঙ্কের ওপরে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশ কাজ করে।
বাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, দেশে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা পেতে প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার বাবদ গ্রাহক পর্যায়ে খরচ করতে হবে ৫৯৯ ডলার বা ৬৫ হাজার ৯৫৯ টাকা। প্রতি মাসে ফি দিতে হবে ১২০ ডলার বা ১৩ হাজার ২১৩ টাকা। অন্যদিকে দেশে ৫ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের জন্য ৫০০ ডলার খরচ করতে হয়। মোবাইলে ৩০ গিগাবাইট ইন্টারনেট কিনতে খচর করতে হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।